প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা | সম্পাদকীয় | রাজতন্ত্র

বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই কার্ত্তিক , ১৪৩৩ দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা সম্পাদকীয়   রাজতন্ত্র ...

Saturday, October 24, 2026

বিবেক ও বিজ্ঞাপন [১ম পর্ব] | অদিতি চ্যাটার্জি

বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই কার্ত্তিক, ১৪৩৩
দেবকুমার মুখোপাধ্যায় | ধারাবাহিক গল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
বিবেক ও বিজ্ঞাপন
[১ম পর্ব]

চার-পাঁচ বছর ধরে তমালিকা লক্ষ করেছেন, জয়ের বাবা পড়াশোনা করছেন খুব, কাগজ, ল্যাপটপে কীসব লেখালেখি করেন। জানতে চাওয়ার ইচ্ছে হয়নি কী লেখেন। কোথাও বের হলে ঠিক চোখে পড়ত

 
গুটি গুটি পায়ে সন্ধ্যা আরও একটু ঘন হয়ে রাতের দিকে এগোচ্ছে। পুজোর আগে সুভাষ অ্যাভিনিউয়ের প্রতিটা দোকান তাই বেজায় ব্যস্ত। আলো-ঝলমলে রাস্তাটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ‘পাবলিক লাইব্রেরি’র দিকে তাকায় জয়। ন’টা বেজে গেছে, বন্ধ হল বলে। তবে আজ নয়, প্রতিদিনই অফিস থেকে বাড়িতে ফেরার পথে একবার করে তাকায় চূর্ণী নদীর ধারে প্রাচীন শহরটার প্রথম লাইব্রেরির দিকে। ছোটবেলায় রবিবার সন্ধ্যাগুলোয় বাবার সঙ্গে আসতে ভারি ভাল লাগত। এখনও বাবা আসেন প্রতি রবিবার, লাইব্রেরি-কাকুর সঙ্গে হেসে হেসে আড্ডা দেন, কার্ডটাও ব্যবহার করেন। বাবা আবার হাসিমুখে আড্ডা! বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে বেশ কয়েকবার, কিন্তু লাইব্রেরিতে আর যেতে ইচ্ছে করেনি। ইচ্ছে হলে বই কেনে, বিভিন্ন ওয়েব পত্রিকা পড়ে, ব্যস আর কী! ওই সাদা টিমটিমে আলো জ্বলা লাইব্রেরিতে কে যাবে বাবা!
 
রবিবার বিছানাটা জয়কে ছাড়তে চায় না। আসলে বেচারা শনিবার অবধি গভীর রাত ছাড়া দেখা পায় না তো জয়ের, তাই এগুলো সব ও মাকে বলে। রানাঘাট থেকে সেক্টর ফাইভ অবধি যাতায়াত বেশ কষ্টের, কিন্তু একা বা বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকার কথা চিন্তাতেই আনতে পারে না। জলখাবারের গন্ধটা পেয়ে পেট হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছে। বাধ্য হয়ে জয় ছোটে বাথরুমের দিকে। সাড়ে ন’টা বাজে, ব্রাশ করে ফেলতে হবে।
 
সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামার সময় মায়ের গলা কানে গেল, বাবাকে কিছু বলছে। এ বাড়িতে মায়ের গলা, এমনকি জয়ের গলা শোনা গেলেও বাবারটা শোনা যায় না। ছোট থেকেই দেখে আসছে। আসলে বাবা হল কুশলী সাঁতারু, সংসারের সব ঢেউগুলো কাটিয়ে চলে যায়, মা বেচারি হাবুডুবু খায়। আটাশ বছর বয়সে এসে এটা বুঝেছে।
 
খাবার টেবিলে গরমাগরম ধোঁয়া ওঠা চাউমিন। আহ্! এক চামচ মুখে তুলে নিয়ে দেখে বাবা ছাতু, মুড়ি, কলা, দই দিয়ে মেখে খাচ্ছে।
—চাউমিনটা খেলে না?
—না, তুই খা। সকালে অত তেল খাই না আমি।
উঠে গেল বাবা। ছেলের সঙ্গে কথা শেষ। বাবাটা যেন কেমন! জয় ঠিক বুঝতে পারে না, তাই ভাবটাও হল না। খাওয়া শেষ করতে করতে মনে হল, বাবা বলে তো ডাকলাম না আমি।
 
জয়ের বাবা অনেকক্ষণ হল তাঁর পড়ার ঘরে চলে গেছেন। তমালিকা জলখাবার শেষ করে চা নিয়ে বসেছেন। শরতের রোদ, কিছুদিন ধরে বৃষ্টি হয়ে গাছপালাগুলোর সবুজ রঙে পড়ে চকচক করছে। তমালিকার কাব্য আসে না, গানটা অবশ্য আসে। চা খেতে খেতে বাগানটা দেখে মন ভরে ওঠে।
 
জয়ের বাবাকে কোনোদিনও খুব একটা পছন্দ করতে পারেননি তমালিকা। পৈতৃক বাড়ির নিজের অংশ বিক্রি করে মধ্যপল্লীর দোতলা বাগানঘেরা বাড়িটা কিনে রেনোভেট করে নিয়েছেন। নিজের বাসস্থানটা দেখে আশ মেটে না। মনে মনে ধন্যবাদ দেন পনেরো বছর ধরে, মুখে অবশ্য কিছু বলেন না, বেশি পাত্তা দেওয়া হয়ে যাবে বলে।
 
চা শেষ। রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ান। তাড়াতাড়ি রান্না-খাওয়া মিটিয়ে সাড়ে চারটের মধ্যে ভাগবত পাঠের আসরে যেতে হবে। গোঁসাই আজ মায়াপুরে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করবেন। ইলিশ মাছগুলো দেখে ভারি আনন্দ হয়, জয়ের প্রিয় মাছ, তমালিকারও। জয়ের জন্য সর্ষে-দই দিয়ে করবেন, ভাল খায় ছেলেটা, আর নিজেদের জন্য কালোজিরে-কাঁচা লঙ্কার ঝোল। মিক্সিতে সর্ষে, কাঁচা লঙ্কা বাটার সময় দেখেন জয়ের বাবাকে, জলের বোতলটা নিতে এসেছেন। তাড়াতাড়ি চোখটা সরিয়ে নেন তমালিকা। মানুষটার ওপর অনেক রাগ, অভিমান জমে আছে।
 
রেলে ভাল চাকরি করতেন, পাস পেতেন, কিন্তু তমালিকাকে পুরী, বেনারস ছাড়া কোথাও নিয়ে যাননি। নিজে কিন্তু সারা ভারত ঘুরছেন। চাকরির চার বছর বাকি থাকতে স্বেচ্ছাবসর নিলেন। কেন, কে জানে? তারপর শুরু হল পড়াশোনা আর ভ্রমণ। এই তো, সোমবারগুলোয় মাঝেমধ্যে কাছাকাছি ঘুরতে চলে যান, আগামীকালও যাবেন অম্বিকাকালনায়। এক জায়গায় দশবার করে গিয়ে কী এত মজা পান, কে জানে! অদ্ভুত এক উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন মানুষ।
 
চার-পাঁচ বছর ধরে তমালিকা লক্ষ করেছেন, জয়ের বাবা পড়াশোনা করছেন খুব, কাগজ, ল্যাপটপে কীসব লেখালেখি করেন। জানতে চাওয়ার ইচ্ছে হয়নি কী লেখেন। কোথাও বের হলে ঠিক চোখে পড়ত, সদর শহরে কত কবি, লেখক থাকেন, সাহিত্যসভা হয়, এখানেও হয়। কোথাও তো যেতে দেখি না। ফেসবুকেও তো কত গল্প লেখে লোকে, তমালিকা একটু-আধটু পড়ে, ভাল লাগে। সেখানেও তো নাম নেই। নিশ্চয়ই কলকে পান না। ওই রকম গম্ভীর, স্বার্থপর, উদাসীন লোকের হাত দিয়ে ভাল লেখা বের হবে কী করে?
 
মাছের ঝোলের পর উচ্ছে-আলুর তরকারিটাও নামিয়ে নেন। ভাত হয়ে গেলেই কাজ শেষ।
—যা পারে করুক, আমার স্বাধীনতায় হাত দিলে লেখালিখি, পড়াশোনা করা ঘুচিয়ে দেব।
হাওয়ার সঙ্গেই একচোট ঝগড়া করে নিলেন তমালিকা। চালটা ধুয়ে গরম জলে দিয়েছেন সবে, হঠাৎ শোনেন জয়ের চিৎকার,
—বাবা...
কী হল! তমালিকার বুকটা ভয়ে কেঁপে ওঠে।
—কী হল রে? অ্যাই জয়...
গ্যাস বন্ধ করে তমালিকা দৌড়ান।
 
শরতের নীলাকাশ দেখলে মনে হয়, নীল রঙের ওপর সাদা ফুল-ফুল চাঁদোয়া টাঙিয়ে রেখেছে। অনেকক্ষণ কাজ করছিল জয়। দোতলার খোলা দালানটায় এসে দাঁড়ায়। আমগাছ, কাঁঠাল গাছ, বেলফুল, কারিপাতা গাছ, গোলাপ ফুলগাছ দিয়ে ঘেরা বাড়িটায় বেশ পাখির ডাক শোনা যায়। রেনোভেট করার সময় লাল মেঝেগুলো বাবা নষ্ট করতে দেননি, তাই বাড়িটা এত সুন্দর।
 
নীচের রান্নাঘর থেকে ইলিশের গন্ধ গোটা বাড়িটা দখল করে নিয়েছে, জয়ের প্রিয় মাছ। বাবা কিছুই ভোলে না? পায়ে পায়ে নিজের ঘরে আসে। দুটো জানলা দিয়ে গলিত সোনা বিছানা, টেবিল, লাল মেঝেকে দখল করেছে। মেঝের রোদটায় পা রাখে জয়, ফর্সা পায়ের পাতা হলুদ।
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)