বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ধারাবাহিক
গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ধারাবাহিক গল্প
শ্রীময় ঘোষ
চোখের জল
[১ম
পর্ব]
"দু বছরের মধ্যেই শুভেন্দু হিরণ্ময়ীকে ভালোবাসতে শুরু করল। দুজনে এখন গা ঘেঁষে বসে। তফাতে বোন কিরণবালা। কিরণবালা যখন ব্যাপারটা বুঝল তখন শুভেন্দু আর হিরণ্ময়ীর প্রেম চরমে। তারা দুজন প্রায় দিনই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা যায়। পার্কে বেড়ায়।"
বড়ো
মেয়ের ভালো নাম হিরণ্ময়ী আর ছোটো মেয়ের কিরণবালা। দাদু হীরেন্দ্রনাথ দত্ত তখনকার
দিনে নাম করা লেখক ছিলেন। তিনিই দুই নাতনির নামকরণ করেছিলেন। নাম দুটো বেশ বড়ো আর
পুরোনোপন্থী বলে ওদের ডাক নাম দেওয়া হল হীরা আর কিরণ। দুটো নামই কিন্তু ছেলেদের
ক্ষেত্রে মানানসই। কিন্তু মেয়েদের জন্য এই নামগুলো সবার কাছে মনে হতো কেমন কেমন।
পাড়া প্রতিবেশী আর আত্মীয়রা বলত,
“তোদের
বাড়িতে তো কোন ছেলে নেই তাই তোদের বাবা-মা এই নামে তোদের ডেকে মনের দুঃখ লাঘব করছে, ছেলে না হওয়ার দুঃখ পুষিয়ে
নিচ্ছে”। সে যাই হোক হীরা আর কিরণের সে দিকে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। তারা হীরা আর কিরণ
হিসেবেই বড়ো হয়। এই নাম দুটো তাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাদের ভালোই লাগে।
হীরা
আর কিরণের মধ্যে এক বছরের তফাত। দুজনের মধ্যে ভাব-ভালোবাসাও খুব। দুজনে একসাথে
খেলে, একসাথে খায়, একসাথে ঘুমোয়। পড়াশুনাও
একসাথে করে। বাবা-মা অনেক ভাবনা চিন্তা করে দুজনকে একই ক্লাসে ভর্তি করে দিলেন।
ক্লাস টু-তে। স্কুলে অবশ্য দুজনের ভালো নামই দেওয়া হয়েছিল। দুজনে একসাথে স্কুল যায়। একসাথে বাড়ি ফেরে।
স্কুলে টিফিন একসাথে বসে খায়। অনেকের ধারণা এরা যমজ বোন। কিন্তু তা তো নয়। দেখতে
দুজনকে আলাদা। অথচ এরা দুজন একে অপরকে ছেড়ে থাকতে পারে না। তাই সবার ধারণা এরা
যমজ।
ধীরে
ধীরে দেখা যাচ্ছে দুজনের পছন্দও একই রকম। দুজনে একই খাবার পছন্দ করে। একই রকমের
জামা-কাপড় পড়ে। একই ধরনের গল্প দুজনেরই পছন্দ। দেখতে দেখতে দুজনে বড়ো হয়ে উঠল।
দুজনেই স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় ফার্স্ট ডিভিশন পেল। তফাত শুধু, বড়ো যে, সে পেল এক নম্বর বেশি। প্লাস
টু-তে আবার দুজনে পেল ফার্স্ট ডিভিশন। এবার সমান সমান নম্বর। এমন অদ্ভুত মিল খুব
কম দেখা যায়। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন কথা চলল। তারপর সবাই ব্যাপারটা ভুলে গেল।
এবার
কলেজে ভর্তির পালা। শহরের নামী কলেজে ভর্তি করে দেওয়া হলো ওদের দুজনকে। দুজনেই
আর্টস নিয়ে পড়ছে। দুজনেরই কম্বিনেশন এক। একসাথে কলেজ যায় আর একসাথেই ফেরে। এহেন
নিরবিচ্ছিন্ন শান্তিতে জড়ানো দুই উদ্ভিন্নযৌবনা কুমারী দুই বোনের জীবনে এসে হাজির
হল শুভেন্দু শেঠ নামে এক ছাত্র। বড়ো বড়ো চোখ। গায়ের রং ফরসা। মাথায় ঝাঁকড়া কোঁকড়া
চুল। দেখে মনে হয় ভালো ঘরের ছেলে। কথাবার্তায় মার্জিত। চিন্তা ভাবনায় আধুনিক।
একই
ক্লাস। একই সারিতে বসে ওরা তিনজন। শুভেন্দুরও সাবজেক্ট একই। তাই সব ক্লাসেই দেখা
হয়। কথা হয়। গল্পগুজব হয়। নোট চালাচালি হয়। নানা বিষয় আলোচনা হয়। কলেজ ক্যানটিনে
বসে আড্ডাও দেয় তিনজনে। কখনো কখনো আরও অনেকে থাকে সঙ্গে।
দু
বছরের মধ্যেই শুভেন্দু হিরণ্ময়ীকে ভালোবাসতে শুরু করল। দুজনে এখন গা ঘেঁষে বসে। তফাতে
বোন কিরণবালা। কিরণবালা যখন ব্যাপারটা বুঝল তখন শুভেন্দু আর হিরণ্ময়ীর প্রেম চরমে।
তারা দুজন প্রায় দিনই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা যায়। পার্কে বেড়ায়। নির্জনে বসে
গল্প করে। হিরণ্ময়ী শুভেন্দুর সাথে কোথায় যায়, কী করে সে কিরণবালাকে কিছুই বলে না।
যেহেতু
কিরণবালাও শুভেন্দুকে মনে মনে পছন্দ করত আর ভালোবাসতো তাই তার মধ্যে ঈর্ষা এবং
হিংসে কাজ করতে শুরু করল। দু বোনের যে পছন্দ এক হবে সে আর এমন কী! একদিন
কিরণবালা বাড়িতে কথাটা বলে ফেলল। বাড়িতে
সেদিন বেশ অশান্তি। হিরণ্ময়ী স্বীকার করল সে শুভেন্দুকে ভালোবাসে। আর সে তাকেই বিয়ে
করবে। এই শুনে কিরণবালা নিজেকে কেমন যেন গুটিয়ে নিল।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment