বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
দ্বিচারিতা
দেবীর গলায় এত মালা, ফুল, ধূপের সুবাস কিচ্ছু ভাল লাগছে না। পারলে এই মালাগুলো টান মেরে ছিঁড়ে ফেলেন। এই যে শান্ত সৌম্য চেহারার পুরোহিত, দেবী মূর্তির সামনে কেঁদে ভাসাচ্ছে, সে নিয়মিত তার স্ত্রীকে অপমান, প্রহার করে চলে। ছি!
এক
অষ্টমীর
সকাল, শহরতলির এক দুর্গা মণ্ডপে
কুমারী পূজার আয়োজন একদম শেষ পর্বে। আজ কুমারী হয়েছে ছ'বছরের তোতা। উত্তরমুখী রাজসিংহাসনে বাবার কোলে করে এসে চুপটি
করে বসেছে ও, একজন জেঠু ওর বাঁ
হাতে পদ্মফুল দিয়ে বলল,
-তুমি আজ আমাদের মা
দুর্গা জানো তো, তোমাকে আজ আমরা একদম
দুর্গা পুজোর মতো করে পুজো করব। তোমার নাম কী বলতো?
-তোতা।
-না মা, আজ তুমি কালিকা।
তোতার
বন্ধুরাও বাড়ির লোকেদের সঙ্গে মণ্ডপে এসেছে পুজো দেখবে বলে, ওরা দ্যাখে তোতাকে লাল
বেনারসি, গয়না, মালা, ফুলের মুকুট, সিঁদুরের টিপ, আলতায় কেমন সুন্দর
সাজানো হয়েছে। চিনতেই পারছে না পাশের বাড়ির মেয়েটাকে।
তোতার
আর বসে থাকতে ভাল লাগছে না,
কখন এই
পুজো শেষ হবে রে বাবা, হাসি হাসি মুখ করে
গদি আঁটা সিংহাসনে অনেকক্ষণ ধরে বসে যায়? ঢাক-কাঁসর বাজছে, দুর্গা ঠাকুরকে যেমন
করে পুজো করা হচ্ছে, সেই রকম করে ওর সামনে
ফুলের থালা, ধূপ, প্রদীপ, জলের গেলাস, প্রসাদের থালা রাখা হয়েছে।
খিদে পাচ্ছে, বাবা, মা কাউকে ভিড়ের মধ্যে দেখতে
পাচ্ছে না তোতা, একটু একটু কান্না
আসছে। আরে একি! পুরোহিত
জেঠু ওর ছোট্ট দুটো পা ধরে কাঁদে কেন? মনোজ দাদু মাথাটা ঝুঁকিয়ে বলে,
-মা গো একটু আশীর্বাদ
দাও।
তোতা
হতবাক হয়ে পদ্মফুল হাতে বসেই থাকে, বাবার অপেক্ষায়।
দুই
অষ্টমীর
সন্ধ্যায় কলকাতার এক বিখ্যাত মণ্ডপের ভিড় উদ্যোগতাদের ঠোঁটে হাসি এনে দিয়েছে, সুইমিং পুল ধরে লাইনটা একটু
একটু করে এগোচ্ছে। আলো ঝলমলে কলকাতার, ততধিক আলো ঝলমলে নাগরিকগণ অষ্টমীর সন্ধ্যায় লাইনে দাঁড়িয়ে আলোচনা করছে আজ
উত্তর-মধ্য কলকাতার যতগুলো সম্ভব ঠাকুর দেখে নেবে।
তিন
গ্রামের
ছোট মণ্ডপে অষ্টমীর সন্ধ্যারতি দেখবে বলে অনেকেই জড়ো হয়েছেন। পুরোহিতমশাই ঢাক, কাঁসরের শব্দে, ডাকের সাজে সজ্জিত তপ্ত
কাঞ্চন বর্ণের প্রতিমার দুটো পটলচেরা চোখের মায়ায় ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন। মৃন্ময়ীর
মধ্যে চিন্ময়ী দর্শন করছেন।
পুরোহিত-সহ উপস্থিত ভক্তগণ
জানেই না, আজ সকালে কুমারী
পুজোর সময় থেকেই মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ীর উত্তরণ ঘটে গেছে। কিন্তু দেবীর গলায় এত
মালা, ফুল, ধূপের সুবাস কিচ্ছু
ভাল লাগছে না। পারলে এই মালাগুলো টান মেরে ছিঁড়ে ফেলেন। এই যে শান্ত সৌম্য চেহারার
পুরোহিত, দেবী মূর্তির সামনে
কেঁদে ভাসাচ্ছে, সে নিয়মিত তার
স্ত্রীকে অপমান, প্রহার করে চলে। ছি!
দেবী
চোখটা পুরোহিতের থেকে সরিয়ে,
দূরে
কিছু দেখার চেষ্টা করেন... গঙ্গার ধারে এক পুরাতন ঐতিহ্যবাহী-ঐতিহাসিক শহর, শিক্ষিত এক পরিবারের, বয়স্ক ভদ্র মহিলা তার ছেলের বৌকে
কন্যা জন্ম দেওয়ার জন্য খোঁটা দিচ্ছেন।
দেবী
মনটাকে শান্ত করে আবারও পুজোর মধ্যে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন কিন্তু ভাসতে থাকে কত
সন্ধ্যা, কালিকা, উমা, রুদ্রাণী,
অম্বিকাদের
কচি মুখ, যেগুলো অবশ্য ওদের
বলে চেনার উপায় নেই, ওরা ওদের নিকটজনদের
বিকৃত কামনায় বলি হয়েছে।
দেবীর
চোখে জল, তিনি ভাবছেন কাদের
কাছে এলেন এবং কেনই-বা এলেন?
হঠাৎ
দেবীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর প্রিয় সাধক সন্তানের মুখ, যে 'হাগা-মোতা' নারী শরীরের মধ্যে পরমার্থ
দর্শন করেছিলেন, নিজের স্ত্রীর মধ্যে
দেখেন জগ্গজননীকে, দেবীর চোখে ভেসে উঠতে
থাকে তাঁর আরো প্রিয় সাধক গৃহী সন্তানদের মুখ যারা নারীর মধ্যে সৃষ্টির বীজ দেখেন, এমনকি সেইসব সন্তানদেরও
প্রাণভরে দেখছেন যারা দেবী-মা বলে মানেন না কিন্তু
এরা নারীদের ব্যবহার-সামগ্রী রূপেও দেখে না, মানুষ রূপে দেখে এবং এখনো দেখছে।
হতাশার
মেঘটা কাটল, ঠোঁটে খেলে গেল হাসি, এখন মা একটু হলেও তৃপ্ত। পুজো
শেষ, পুরোহিত এবং ভক্তজনরা
নিষ্ঠা সহকারে দেবীকে প্রণাম জানাচ্ছেন।
তোমাদের
সুবুদ্ধি জাগ্রত হোক— মা দুর্গা সন্তানদের আশীর্বাদ করলেন।
~~000~~
No comments:
Post a Comment