বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
রাজেশ ঘোষ
আনন্দধারা বহিছে ভুবনে…
দুগ্গা মা'র কাছে মনে মনে বলল— মা সামনের বছর যেন রুকুদিদির পুজোর সবকটা দিন পরার জন্য নতুন জামা হয়, তুমি প্লিজ সেটা কোরো, প্লিজ প্লিজ প্লিজ!
আজ
মহাষ্টমী। এ বছর অলির দুর্গা পুজোতে আনন্দ একটু বেশি। একে তো প্রতি বছরের মতো ১০টা নতুন জামা হয়েছে— মা-বাবা, ঠান, ঠা-মণি,
মামা, দাদাই, সিনুদা তো দিয়েছে সাথে তো
মামবাড়ি থেকেও এসেছে। জামাগুলো সে পুজোর দিনগুলোতে সকালে একটা আর সন্ধেবেলা একটা
করে পরবে ঠিক করেই রেখেছে। আর এবার আরো একটা নতুন জামা হয়েছে – মোট ১১টা। অলির দুষ্টু
পিপি আর ঋক পিসাই এবার রাজস্থান থেকে তার জন্য একটা সাদা জমিনের উপর লাল-হলুদ
কাজের ঘাগড়া এনেছে। অলি সেটা পরে অষ্টমীর অঞ্জলি দেবে বলে ঠিকই করে রেখেছে। এদিকে
তার মা মিলিও প্রতি বছরের মতো আগে থেকেই একটা লাল-সাদা সুন্দর জামা কিনে রেখেছে
তার একমাত্র মেয়ের জন্য, সেটা পরেই অলি অঞ্জলি
দেবে তেমনটি ভেবে রাখা। বিষয়টি নিয়ে অলি পরেছে বেশ চিন্তায় – কোনটা পরে যে সে মা
দুগ্গার সামনে দাঁড়িয়ে মন্ত্র বলবে!
হর পাপং
হর ক্লেশং হর শোকং হরাসুখম্।
হর
রোগং হর ক্ষোভং হর মারীং হরপ্রিয়ে।
এদিকে
পুজো মণ্ডপের মাইকে অঞ্জলি নির্ঘন্ট বলে চলেছে পকাইকাকা— ’ঠিক ৯.৩০ ঘটিকায়
মহাষ্টমীর অঞ্জলি শুরু হবে,
আপনারা
সকলে চলে আসুন।’ অলি তার বাবা রায়ানের সাথে বেশ অনেকক্ষন আগেই পুজো মণ্ডপে চলে
গেছে, অষ্টমীর পুজো গুছিয়ে
নিয়ে,
আর পরেছে দুষ্টু পিপির দেওয়া ঘাগড়াটাই। মা'র দেওয়া জামাটা পরে সে অঞ্জলি শেষ হলে ঠান আর দিদুনের সাথে
টোটোয় করে ঠাকুর দেখতে যাবে। পুজো মণ্ডপে এসেই অলির দেখা তার বিকালের খেলার সঙ্গী রুকুদিদির সাথে। এক বছরের বড় হলেও প্রায় একই
মাথায় তারা দু'জন। রুকুরা খুব গরিব।
অলি জানে প্রতি বছর দুগ্গা পুজোর সময় তার রুকুদিদির মাত্র দুটো জামা হয়। একটা পরে সে অঞ্জলি
দেয় আর একটা সে নবমীর রাতে পরে। কিন্তু অলির মনে হলো এবার যেন রুকুদিদি অষ্টমীতে
নতুন জামা পরেনি আর মণ্ডপ থেকে একটু দূরেই থমথমে দুঃখ দুঃখ মুখ করে দাঁড়িয়ে।
অলি তার
বাবাকে বলে দৌড়ে রুকুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-কী রে
রুকুদিদি তুই দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন রে? আর নতুন জামাও পরিসনি!
অলির
কথা শুনে রুকু মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, তার চোখে জল। অলি আবার বলল,
-বল-না কী হয়েছে?
রুকু
তখন বলল,
-তার বাবার কারখানাটা
পুজোর আগেই বন্ধ হয়ে যাওয়াতে এবার তাদের পুজোতে কোনো জামা-কাপড় হয়নি।
একথা
শুনেই অলি তার রুকুদিদিকে বলল,
-তুই
একটু দাঁড়া, কোথাও যাবি না
কিন্তু।
অলি
তক্ষুনি তার বাবাকে বলে দিল ছুট তার বাড়ির দিকে। আর বাড়ি ঢুকেই তার মা'র দেওয়া নতুন জামাটা নিয়ে
মিলির কাছে গিয়ে বলল,
-মাম্মা আমি একটা জিনিস চাইব, তুমি প্লিজ সেটা করতে পারমিশন
দেবে?
এবং অলি
তখন বলল তার রুকুদিদির পুরো ঘটনাটা আর বলল সে তার মা দেওয়া নতুন জামাটা রুকুকে দিতে
চায় এখনি যেটা পরে রুকু অঞ্জলি দেবে। একথা শুনে মিলি তাঁর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কপালে
একটা চুমু খেয়ে বলল,
-হ্যাঁ
মা, তুমি যেটা চাইছ সেটাই করো।
অলি
তখন ছুট্টে তার নতুন জামা নিয়ে তার রুকুদিদিকে দিয়ে বলল,
-যা রুকুদিদি শিগগিরি পরে আয়, এটা তোর বুনু তোকে দিয়েছে
এবারের পুজোয়, এটা পরে এলে আমরা
দুজনে মিলে একসাথে অঞ্জলি দেব মা দুগ্গার সামনে দাঁড়িয়ে।
একটু
পর অলি আর রুকু নতুন জামা পরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ঠাকুরমশাইয়ের বলা মহাষ্টমীর অঞ্জলি
বলল। ঠাকুরমশাই অঞ্জলি
শেষে সবাইকে প্রার্থনা করতে বললে, অলি চোখ বন্ধ করে তার দুগ্গা মা'র কাছে মনে মনে বলল— মা সামনের বছর যেন রুকুদিদির পুজোর
সবকটা দিন পরার জন্য নতুন জামা হয়, তুমি প্লিজ সেটা কোরো,
প্লিজ
প্লিজ প্লিজ! আর প্রণাম করে যেই চোখ খুলে মা দুগ্গার দিকে তাকিয়েছে দেখল মা দুগ্গা
যেন মিটমিট করে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে…
অঞ্জলি
শেষে ওদিকে তখন মাইকে রবিঠাকুরের গান বাজছে—
আনন্দধারা
বহিছে ভুবনে…
~~000~~

খুব সুন্দর লেখা। ভাষার সাবলীলতা আর ভাবের গভীরতা—দুটোই মুগ্ধ করল। পড়ে সত্যিই ভালো লাগল।
ReplyDelete