বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
মণিজিঞ্জির সান্যাল
অন্য রূপকথা
[১ম পর্ব]
ছেলে বাইকে উঠে একটা ফ্লাইং কিস দেয় মাকে। শ্রীতমাও পরপর অনেকগুলো হালকা চুমু এঁকে দেয় ছেলের দিকে, আর মনে মনে বলে 'বাবাই অর্ধেক তোর আর বাকি অর্ধেক...।'
১
বুড়িয়ে
যাওয়া সম্পর্ককে খুব সুন্দর জোড়া লাগিয়ে ছিল সুপ্রিয়া-কাকিমা। ঝরে পড়া ত্বক, থলথলে শরীরকে কেমন আবার
টানটান রূপ দিয়েছিল নিজের চেষ্টায় আর নিজের সততায়। শ্রীতমাকে বারবার বলেছিল 'নিজেকে এমনভাবে সস্তা করে
ফেলো না পরিবারের কাছে। তাহলে কিন্তু এর মূল্য দিতে হবে পদে পদে। নিজের জন্য একটু
সময় বার করে নাও।' সুপ্রিয়া-কাকিমার কথা শুনে
জোরে হেসে উঠে বলেছিল 'সত্যিই সুপ্রিয়া-কাকিমা, তোমাকে যত দেখি তত অবাক হই।
কাকিমা বলে ডাকতে এখন আমার ভীষণ লজ্জা করে। আর কিছুদিন বাদে তুমিই আমায় কাকিমা বলে
ডাকবে।' শ্রীতমার কথা শুনে
চোখ বড় বড় করে কাকিমা বলেছিল 'বেশি হেসো না।'
সেদিন
কাকিমা চলে যাবার পর তার রেশ অনেকক্ষণ সুন্দর ভাবে রয়ে গিয়েছিল শ্রীতমার সারা
হৃদয় জুড়ে। কাকিমার আন্তরিক কথাগুলো যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছিল তাঁর হৃদয়ের
ভাঁজে ভাঁজে।
গুনগুন
করে গান গাইতে গাইতে ছেলের স্কুলের খাবার তৈরি করছিল শ্রীতমা। ওই সময়টা তার
ব্যস্ততার শেষ নেই। স্বামী অর্করও তখন অফিস যাবার তাড়া। অর্ক স্নান সেরে বাথরুম
থেকে বেরিয়ে চিৎকার শুরু করে দিল 'তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি বাবাই,
তুমি
এখনো খাওয়া শেষ করোনি? নটা দশে তোমার বাস।' বাবাই এখন ক্লাস ফোর। এই
বয়সেই বাবার মতোই টানটান চেহারা। সে বেশ রাজকীয় স্টাইলে বসে খায়, এমনকি স্কুল টাইমেও।
শ্রীতমা
ছেলেকে বলল 'আজ টিফিনে তোমাকে
পনির পরোটা দিলাম, খেয়ো কিন্তু সোনা।
রোজ রোজ এইভাবে টিফিন নষ্ট করা কিন্তু একদম ঠিক নয়। আমি সেই সকাল থেকে উঠে কত
পরিশ্রম করি, তোমার জন্য নানান রকম
টিফিন তৈরি করি, আর তুমি এভাবে খাবার
নষ্ট করো?" বাবাইয়ের এখন কথা
বলার সময় নেই। তবুও বলে 'মাম্মাম আমাকে পরোটা
পিস পিস করে দিও আর সাইডে একটু টমেটো সসও দেবে কিন্তু।' বাবাইয়ের কথায়
জোরে হেসে ওঠে শ্রীতমা। সকালের ওই ব্যস্ততার সময়ও ছেলে আর মায়ের মিষ্টি সম্পর্ক
নষ্ট হয় না। ছেলেকে কখনো মারে না, ভীষণ ধৈর্য ওর। এত তাড়াহুড়োতেও নিত্য-নতুন খাবার বানাতে
কোন দ্বিধা নেই শ্রীতমার। তার মধ্যেও গুনগুন করে গান গায়। অর্ক ততক্ষণে চিৎকার করে
পাড়া মাত করে 'কী হলো খেতে দেবে?' শ্রীতমা নরম সুরে বলে 'এই শোনো মুগের ডাল আর
গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি করেছি,
তোমায়
আজ টিফিনে দেব?'
অর্ক
বলে 'যা দেবার দাও-না, অত জিজ্ঞেস করার কী আছে? এখন খাবারটা তো দাও।'
শ্রীতমা
এবারে রাগত স্বরে বলে 'টেবিলে এগুলো কী?'
সব
খাবার সাজিয়ে দিয়েছে সুন্দরভাবে, কাচের গ্লাসে জল। কাচের প্লেটে ধোঁয়া ওঠা ঝরঝরে গরম ভাত, ঘি, কাঁচা লঙ্কা। দুটো বাটিতে পর পর সাজানো রুই মাছের ঝোল, মুসুর ডাল আর কড়াইয়ে বেগুন
ভাজা হচ্ছে। অর্ক আজকাল কিছুই খেয়াল করে না। কাজপাগল অর্কের অফিস টাইমে তো আরো
ব্যস্ততা। ছেলের সবকিছু আরো একবার দেখে নিয়ে রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে শ্রীতমা
বলল "আজ একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারবে?"
-পাগল! এখন অফিসে কাজের যা
চাপ। নটা সাড়ে-নটার
আগে কিছুতেই সম্ভব নয়। বেগুন ভাজাটা নামিয়ে অর্কের লাঞ্চ বক্স রেডি করতে করতে শ্রীতমা ভাবে একটা
দিনও ওর জন্য বরাদ্দ নয়। সবার কাজগুলো কী সুন্দর সাজানো-গোছানো, কোনো এলোমেলো নয়। সব সাজিয়ে
গুছিয়ে কী সুন্দর তুলে ধরেছে সবার জন্যে। বাবাই এসে মাকে জড়িয়ে ধরে একটা হামি
খেলো। শ্রীতমা বাবাইয়ের কপালে একটা চুমু দিয়ে ভাবে অর্ক প্রতিদিন অফিস যাবার আগে
এই চুমুটা দিত। ছেলের চুমুর স্পর্শ নিতে নিতে ভাবল একদিন এই চুমুটাও হারিয়ে যাবে
জীবন থেকে। তখন চুমু দেবার বা নেবার মতো আর কেউ থাকবে না। বাবাই হঠাৎ বলে ওঠে 'ছাড়ো মাম্মাম, বাপি বাইক স্টার্ট দিয়েছে।' ছেলে বাইকে উঠে একটা ফ্লাইং
কিস দেয় মাকে। শ্রীতমাও পরপর অনেকগুলো হালকা চুমু এঁকে দেয় ছেলের দিকে, আর মনে মনে বলে 'বাবাই অর্ধেক তোর আর বাকি
অর্ধেক...।'
২
শ্রীতমা
মাঝে মাঝেই ছাদে এসে দাঁড়ায়। বাড়ির এই ছাদটা ওর বড় আপন। কখনো বর্ষার বৃষ্টিতে
নিজের মতো স্নাত হয়, কখনো বর্ষার জলের
ধারা আর মেঘের দেওয়ালে ও যেন গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। জলবিন্দুগুলো ওর চিবুক স্পর্শ
করে গাঢ় ভাবে। কখনো চোখ বন্ধ করে পৌঁছে যায় তিস্তার জলের কাছে। সেই তিস্তা বহু
বছর আগে এক শীতের সকালে সবাই মিলে গিয়েছিল সেই কালিঝোরায়। শীত মানেই নিদেনপক্ষে
এক পিকনিক। তিস্তা আর রঙ্গিত মিলেমিশে একাকার। হঠাৎ করেই শ্রীতমা হয়েছিল দলছুট।
কখন যে একা হয়ে গিয়েছিল। জলের খুব কাছাকাছি এসে পা রেখেছিল। নীল জলের রেখা যেন
জীবনের ছবি। জল দেখলেই শ্রীতমা খুব খুশি হয়। নৈঃশব্দ্যকে যেন ভাঙছিল ছন্দময় জল।
বড় বড় সাদা পাথর শুয়ে আছে পাশাপাশি, যেন সময় গুনছে ওরা। ওর খুব ইচ্ছে করছিল খোলা আকাশের নিচে শুয়ে থাকতে।
পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জঙ্গল,
কেমন
যেন কষ্ট হচ্ছিল শ্রীতমার। কারো জন্যে যেন অপেক্ষা করছে ওরা দীর্ঘদিন ধরে। করোনেশন
ব্রিজ অদ্ভুতভাবে শুয়ে আছে। তিস্তা একইরকমভাবে বয়ে যাচ্ছে। শ্রীতমার মনে হয়
তিস্তার কোন বয়স নেই। কেমন নিজের ছন্দে বয়ে যাচ্ছে, আর ওর প্রেমিক পাহাড় কীভাবে সযত্নে ওকে বাহুবন্ধনে আগলে
রেখেছে দিনের পর দিন।
কখন
সূর্য নেমেছিল, হঠাৎ সঙ্গীদের কথা
মনে পড়ায় শ্রীতমা যখন ছুটতে ছুটতে নির্দিষ্ট জায়গায় এলো তখন কেউ জানতেও পারল না
একটা নিঃসঙ্গ মেয়ে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল এতক্ষণ। শ্রীতমা নির্বাক দৃষ্টিতে
খেয়াল করল, প্রত্যেকে প্রত্যেকের
মতো হাসিঠাট্টায় কীভাবে নিমগ্ন হয়ে আছে। জঙ্গলকে কীভাবে অপরিচ্ছন্ন করে দিয়েছে
ওদের ছোঁড়া কমলালেবুর খোসা,
খাবারের
টুকরোগুলো দিয়ে। একে একে ওগুলো জড়ো
করে শ্রীতমা ভেবেছে অরণ্য পরিষ্কার করার কেউ নেই। শ্রীতমার মনে হয় যার কেউ নেই, তার ঠিক কেউ একজন আছে।
বহুদিনের
চেনা সেই গন্ধটার ছন্দপতন ঘটল বাবাইয়ের আলত স্পর্শে। মাকে অবাক চোখে দেখল বাবাই।
শ্রীতমা চমকে উঠল বৃষ্টিভেজা ছাদে কখন স্কুল থেকে ফিরে নিঃশব্দে সেও ছাদে এসে
দাঁড়িয়েছে। শ্রীতমা ওকে জাপটে ধরে বলল "বাবাই বৃষ্টিতে ভিজবি? আয় আজ দুজনে বৃষ্টিতে
ভিজব।" বাবাই আনন্দে ছাদে ভিজতে লাগল মায়ের সাথে, আজ যেন বৃষ্টির সাথে মায়ের খেলা। বর্ষার অকৃপণ জলে সব
ভাবনা যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল। মনের উপর ভারী মেঘ, এক নদী হিমেল বাতাস আর একটা ছায়ার কথা মনে পড়ে গেল। সেই
ছায়ার স্পর্শ তাকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে থাকে, ঠিক সেই সময় একটা গানের সুর আর কথা শ্রীতমার অন্তরের মধ্যে
দোলা দিতে লাগল। সেই কথা, সেই ছন্দ, সেই সুর তাকে উথালপাতাল করে
তুলল "অনেক দূরে মরা গাছের ডালে / ব্যথা ভারে কাঁদছে ঘুঘু পাখি..."
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment