বাতায়ন/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/সৈয়দ হাসমত জালাল সংখ্যা/২১শে বৈশাখ,
১৪৩১
ছোটগল্প
পারমিতা চ্যাটার্জি
বিরহ মধুর
কয়েকদিন ধরে সৌরভ আর
জয়িতার মধ্যে গভীর মনোমালিন্য চলছিল। বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা ঠিক বুঝতে পারছিল না কী
কারণে ওদের মধ্যে বেসুরো হাবভাব। সৌরভ একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উচ্চপদস্থ অফিসার
আর জয়িতাও সরকারি হাই স্কুলের টিচার। এমনিতে যে মেয়েটা সবসময় বাড়িটাকে হাসিখুশিতে
ভরিয়ে রাখে তার এমন হঠাৎ কী হল যে একদম চুপচাপ। নিশ্চয়ই সৌরভের সাথে কিছু হয়েছে।
দেওর ননদরা ওকে খুব ভালবাসে,
একজন নিজের ননদ, দুজন দেওর ও ননদ। সবাই মিলে খুব হইচই
করে থাকে। তাই কদিন ধরে এই ছন্দপতন সবারই চোখে পড়ছে।
যেহেতু জয়িতা সকালে রান্নাঘরের কাজে বেশি আসতে পারে না, তাই সকালে উঠে সবার জন্য চা করাটা জয়িতার একটা কাজ, চা খেতে-খেতেই সবজি আর চিকেন কেটে পেঁয়াজ টমাটো তেজপাতা, গরমমশলা, গোলমরিচ দিয়ে স্টু-টা বসিয়ে দেয়। তার দুই শ্বশুর সকালে কোর্টে বেরিয়ে যান স্টু আর দুটো টোস্ট খেয়ে, তার দুই শ্বশুর নামজাদা উকিল তবে দুজনেই খুব সৎ। তাদের খাবারটা দিতে দিতে তার দুই শাশুড়ি এসে তাকে রান্নাঘর থেকে ছুটি দিয়ে দেয় কারণ সেও যা হোক খেয়ে সৌরভের সাথে বেরিয়ে পরে সৌরভ তাকে সামনের অটো স্ট্যান্ডে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় যেদিন জয়িতার খাতা দেখা হয় না সেদিন সৌরভ একাই বেরিয়ে যায় জয়িতা ওর কাজ শেষ করে বেরিয়ে যায়।
আজ জয়িতা শাড়ি পরে তৈরি হয়ে এসে খাতা দেখতে বসল, সৌরভ দেখে বলল, কী তুমি যাবে না? খাতা দেখতে বসলে যে?
খাতা দেখা বাকি আছে তাই, তুমি বেরিয়ে যাও, এমনিতেও আমার ওই অটোস্ট্যান্ড অবধি গিয়ে বিরাট কিছু সুবিধা যে হয় তা নয়, আমি চলে যাব, তুমি এগিয়ে যাও। সৌরভ বেরিয়ে পড়ল খুব বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে। সে বুঝতে পারছে জয়িতার অভিমানের কারণটা কিন্তু তারও তো কিছু করার নেই। তার ছোটবেলার বান্ধবী কেয়ার সাথ হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়েছিল। কেয়া শুধু তার বান্ধবী ছিল না তারচেয়ে কিছু বেশি ছিল হয়তো। সৌরভের মনে ওটা কিশোর থেকে যৌবনের যাবার পথে প্রায় সবার জীবনে প্রেম আসে, তারও এসেছিল। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার সাথে সাথে কেয়ার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। বলা বাহুল্য বিয়েটা মোটেই সুখকর হয়নি। কেয়াকে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হতে হয় স্বামী শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে। সেই কেয়াই এখন তাকে ধরে বসেছে যা হোক একটা চাকরি দাও, আমি মরে যাব তা না হলে, একসময় তো ভালবেসেছিলে আমাকে?
সৌরভ এ কথার উত্তরে
বলে, তা সাততাড়াতাড়ি পড়াশোনা শেষ না করে বিয়ে করতে কে বলেছিল, একটা হায়ার
সেকেন্ডারি পাশ মেয়ের চাকরি হওয়া কি এতই সহজ? অন্তত স্টেনোগ্রাফি আর টাইপটা শিখে
আমার সাথে দেখা করিস? চাকরির এত তাড়া কীসের?
বাবা-দাদারা কিছু বলছে নাকি?
না বাবা-মা বলছেন ‘আর
একটু চেষ্টা করে যদি মানিয়ে নিতাম, বিয়ে দিয়েও শান্তি নেই, ঘরটাও ঠিক মতন করতে
পারলি না।’
- কী করব মা বল? ওরা ক্রমাগত আমাকে এখানে পাঠাতে চাইছে, বলছে যা যা ওদের পাওনা তা না নিয়ে আসা পর্যন্ত বাড়িতে ঢুকতে পারবে না, কোন মেয়ে কী এমনিই সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায়? বলতে বলতে কেয়া আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে, সৌরভ আর থাকতে না পেরে ওর হাতদুটো জড়িয়ে ধরে। তারপরে বলে টাইপে ভর্তি হয়েছিস?
- কী করে হব? বাবার পেনশন আর বড়দা স্কুল টিচার তাও প্রাইভেট স্কুলের এইটুকুতে সংসার চলছে, ছোড়দা কলেজে পড়ছে এখনও অবশ্য টিউশানিও করে, মেজদাও বিএ পাশ করে টিউশন করছে তার সাথে চাকরির চেষ্টা তো আছেই।
- তবে তুই কোথা থেকে পাবি বল তো? চল আগে তোকে নিয়ে গিয়ে টাইপে ভর্তি করিয়ে দিই।
- কিন্তু আমি কী করে?
- ভর্তি যখন করাচ্ছি তার ভারটাও আমিও নেব, নে চল।
সেদিন অটো করে স্কুল থেকে ফেরার পথে কেয়াকে গাড়িতে সৌরভের সাথে দেখে ফেলে জয়িতা। তারপর থেকে জয়িতার মুখ ভার, একটা ঠান্ডা লড়াই চলছে দুজনের মধ্যে।
তারপর থেকে সে অটোতে যায় সৌরভ তার গাড়িটা ডানদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে কেয়াকে তুলে নেয়। কেয়া তার প্রথম ভালবাসা, মেয়েটা এমন খারাপ অবস্থায় পড়েছে তাকে তো মাঝপথে ফেলে দিয়ে আসতে পারে না।
জয়িতার বদলটা সে অনুমান করতে পারে, অনেক বোঝানোর চেষ্টাও করে কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। মনে মনে ভাবে কী দরকার ছিল তার অত পরের কথা ভেবে নিজের ঘরটা অগোছালো করে তোলা।
বাড়িতে সবাই বুঝতে পারে দুজনের এই ঠান্ডা লড়াইটা। অনেক ভাবে চেষ্টা করে সবাই ওদের মধ্যে আগেকার সম্পর্কটা ফিরে আসুক। কেয়া তার প্রথম ভালবাসা হলেও জয়িতাই এখন তার সব, এটা কেন জয়িতা বুঝতে পারছে না।
অবশ্য সৌরভ নিজেকে দিয়েও বিচার করে জয়িতার জায়গায় বসে, তখন ভাবে না, এটা ঠিক হচ্ছে না। সৌরভ কেয়াকে বলে দেয় এবার থেকে নিজে টাইপের স্কুলে যাবি আমি আর গাড়িতে পৌঁছে দিতে পারব না।
- কেন সৌরভদা বাড়িতে অশান্তি হচ্ছে?
- হ্যাঁ আমি চাই না, কোনভাবেই এই অশান্তি বাড়ুক, তুমি আমার অতীত আর জয়িতা আমার বর্তমান এটা তোমাকে বুঝতে হবে। তুমি লেখাপড়া না করে সাততাড়াতাড়ি বিয়ে করে নিয়েছিলে এখন সেই বিয়েটা তোমার ভেঙে গেছে সে দায় তো আমার নয়। যখনতখন আমাকে ফোন করে বিরক্ত করো কেন? এমনকি রাতেও যখন স্বামী-স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত সময় তখনও তুমি ফোন করবে কেন? আমার তো মনে হয় তুমি ইচ্ছে করে আমার বিবাহিত জীবনটা ডিস্টার্ব করছ। আমি প্রত্যেক মাসে তোমার টাইপ আর স্টেনোগ্রাফির টাকা পৌঁছে দেব, আমার সাথে আর দেখা করার চেষ্টা কোরো না, তোমার শেখা কমপ্লিট হলে সার্টিফিকেট নিয়ে আমাকে জানিয়ো আমি আমার সাধ্য মতন চেষ্টা করব যদি একটা কাজ জোগাড় করে দিতে পারি, ব্যস এই অবধি আমার দায়িত্ব।
আজ জয়িতার জন্মদিন। এই জন্মদিন আর বিয়ের তারিখ নিজেদের মতন করে কাটায় এ নিয়ে সৌরভ বলে বছরের এই দুটো দিন আমাদেরকে একটু একলা থাকতে দিয়ো, বাকি সবদিন তো তোমাদের সাথেই থাকি। সত্যি ওরা পুজো বা নববর্ষ দোল সব উত্সবের দিন সবার সাথে উদ্যাপন করে।
সৌরভ একটা সুন্দর শাড়ি, ফ্লুরিস থেকে জয়িতার নাম লেখা একটা ভাল কেক আর অর্কিড ফুল দিয়ে সাজানো একটা বোকে কিনে জয়িতার স্কুলের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করছিল, জয়িতা বেরিয়েই দেখত পেল সৌরভকে, একটা হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল জয়িতার মুখে। সৌরভ এগিয়ে গিয়ে জয়িতার হাত ধরে নিয়ে এল গাড়ির কাছে, বন্ধুরা সব হেসে বলল, যা তোর জন্মদিনে তোর বর তোর জন্য অপেক্ষা করছে, আজকের দিনে আর মানঅভিমান রাখিস না মনে, জয়িতাও হেসে এগিয়ে এসে বলল, কী ব্যাপার একেবারে স্কুলের সামনে!
- অবাক হয়েছ?
- হ্যাঁ তা একটু হয়েছি।
- বলছি যে গাড়িতে উঠে বসবে না সবার সামনে?
জয়িতা তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসে পড়ল, আবেগে অভিমানে তার চোখ দুটো জলে ভরে গেছে। সৌরভ ওর সুন্দর নরম হাতদুটো জড়িয়ে নিয়ে বলল, যদি কিছু ভুল হয়ে থাকে, তারজন্য ক্ষমা চাইছি। আমি কোন কিছুরই বিনিময়ে আমাদের মধ্যে দূরত্ব আসতে দেব না। মোটামুটি সৌরভের সঙ্গে কেয়ার কী সম্পর্ক ছিল, আজ কী অবস্থা, কেন তাকে সাহায্য করার জন্য সে এগিয়ে এসেছিল, এবং আজ কী বলে এসেছে সব কথা খুঁটিয়ে বলল তাকে। তারপরও বলল, আমার মনে হল কেয়া যেন ইচ্ছে করে সময় অসময় ফোন করে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছেদ আনতে চাইছে। তাই ওকে বলেছি আমার যতটুকু করণীয় ছিল তা করেছি, আর আমার পক্ষে কিছু সম্ভব নয়। জয়িতা মুখ নিচু করে নিল, ওর চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। সৌরভ একদম ফাঁকা জায়গা দেখে গাড়িটা দাঁড় করাল তারপর জয়িতার সুন্দর মুখটা দু'হাতের তালুতে তুলে ধরে ওর চোখের জল মুছিয়ে দিল। নিজের দিকে আকর্ষণ করে বলল, আমি বুঝতে পারলাম, কেয়া যত বিপদেই পড়ুক এভাবে এগিয়ে আসা ঠিক হয়নি কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার তোমার প্রতি ভালবাসার একবিন্দু কম হয়নি, কিন্তু ওকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য এফোর্ট দিয়েছি, কিন্তু তারজন্য ওকে গাড়ি করে নিয়ে যাবার তো দরকার নেই নিজের স্ত্রীকে বাদ দিয়ে? বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুলে গালে চোখের পাতায় অনেক চুম্বন দিয়ে বলল, আমায় মাপ করেছ তো?
- হ্যাঁ আর না করে কী উপায়?
- তবে কিছু উপায় নেই বলছ?
জয়িতা মাথা নেড়ে জানাল নেই, তখন সৌরভ নিজের গালটা এগিয়ে দিয়ে বলল, তবে আমার পাওনাটা দিয়ে দাও।
- ধ্যাৎ লোকজন ভর্তি রাস্তায়।
- কোথায় লোকজন আমি তো ফাঁকা জায়গা দেখে গাড়ি দাঁড় করিয়েছি।
বাধ্য হয়ে জয়িতা সৌরভের বাড়ানো গালে অনেক আদরের ছোঁয়া দিল, আবেশে সৌরভের চোখ বুজে এল, দুজনে দুজনকে ধরে বেশ কিছুক্ষণ থাকার পর সৌরভ আসতে আসতে বলল, তোমার জন্য একটা শাড়ি এনেছি দেখবে না?
- হ্যাঁ নিশ্চয়ই দেখব।
- চলো তাহলে আমরা পার্ক-স্ট্রিট যাই ওখানে হোটেলে বসে তুমি কেকও কাটবে আর শাড়িটাও দেখাব তখন, ঠিক আছে?
- হ্যাঁ ঠিক আছে।
- তাহলে চলো এবার বাকিটা রাতের জন্য তোলা থাক।
- ধ্যাৎ খুব অসভ্য।
- কী আর করা যাবে, এমন দীর্ঘ বিরহ হলে অসভ্যতা তো একটু হবেই।
দুজনেই হেসে ফেলল। সৌরভের গাড়ি স্পিডে পার্কস্ট্রিটের রাস্তা ধরল।
যেহেতু জয়িতা সকালে রান্নাঘরের কাজে বেশি আসতে পারে না, তাই সকালে উঠে সবার জন্য চা করাটা জয়িতার একটা কাজ, চা খেতে-খেতেই সবজি আর চিকেন কেটে পেঁয়াজ টমাটো তেজপাতা, গরমমশলা, গোলমরিচ দিয়ে স্টু-টা বসিয়ে দেয়। তার দুই শ্বশুর সকালে কোর্টে বেরিয়ে যান স্টু আর দুটো টোস্ট খেয়ে, তার দুই শ্বশুর নামজাদা উকিল তবে দুজনেই খুব সৎ। তাদের খাবারটা দিতে দিতে তার দুই শাশুড়ি এসে তাকে রান্নাঘর থেকে ছুটি দিয়ে দেয় কারণ সেও যা হোক খেয়ে সৌরভের সাথে বেরিয়ে পরে সৌরভ তাকে সামনের অটো স্ট্যান্ডে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় যেদিন জয়িতার খাতা দেখা হয় না সেদিন সৌরভ একাই বেরিয়ে যায় জয়িতা ওর কাজ শেষ করে বেরিয়ে যায়।
আজ জয়িতা শাড়ি পরে তৈরি হয়ে এসে খাতা দেখতে বসল, সৌরভ দেখে বলল, কী তুমি যাবে না? খাতা দেখতে বসলে যে?
খাতা দেখা বাকি আছে তাই, তুমি বেরিয়ে যাও, এমনিতেও আমার ওই অটোস্ট্যান্ড অবধি গিয়ে বিরাট কিছু সুবিধা যে হয় তা নয়, আমি চলে যাব, তুমি এগিয়ে যাও। সৌরভ বেরিয়ে পড়ল খুব বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে। সে বুঝতে পারছে জয়িতার অভিমানের কারণটা কিন্তু তারও তো কিছু করার নেই। তার ছোটবেলার বান্ধবী কেয়ার সাথ হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়েছিল। কেয়া শুধু তার বান্ধবী ছিল না তারচেয়ে কিছু বেশি ছিল হয়তো। সৌরভের মনে ওটা কিশোর থেকে যৌবনের যাবার পথে প্রায় সবার জীবনে প্রেম আসে, তারও এসেছিল। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার সাথে সাথে কেয়ার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। বলা বাহুল্য বিয়েটা মোটেই সুখকর হয়নি। কেয়াকে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হতে হয় স্বামী শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে। সেই কেয়াই এখন তাকে ধরে বসেছে যা হোক একটা চাকরি দাও, আমি মরে যাব তা না হলে, একসময় তো ভালবেসেছিলে আমাকে?
- কী করব মা বল? ওরা ক্রমাগত আমাকে এখানে পাঠাতে চাইছে, বলছে যা যা ওদের পাওনা তা না নিয়ে আসা পর্যন্ত বাড়িতে ঢুকতে পারবে না, কোন মেয়ে কী এমনিই সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায়? বলতে বলতে কেয়া আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে, সৌরভ আর থাকতে না পেরে ওর হাতদুটো জড়িয়ে ধরে। তারপরে বলে টাইপে ভর্তি হয়েছিস?
- কী করে হব? বাবার পেনশন আর বড়দা স্কুল টিচার তাও প্রাইভেট স্কুলের এইটুকুতে সংসার চলছে, ছোড়দা কলেজে পড়ছে এখনও অবশ্য টিউশানিও করে, মেজদাও বিএ পাশ করে টিউশন করছে তার সাথে চাকরির চেষ্টা তো আছেই।
- তবে তুই কোথা থেকে পাবি বল তো? চল আগে তোকে নিয়ে গিয়ে টাইপে ভর্তি করিয়ে দিই।
- কিন্তু আমি কী করে?
- ভর্তি যখন করাচ্ছি তার ভারটাও আমিও নেব, নে চল।
সেদিন অটো করে স্কুল থেকে ফেরার পথে কেয়াকে গাড়িতে সৌরভের সাথে দেখে ফেলে জয়িতা। তারপর থেকে জয়িতার মুখ ভার, একটা ঠান্ডা লড়াই চলছে দুজনের মধ্যে।
তারপর থেকে সে অটোতে যায় সৌরভ তার গাড়িটা ডানদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে কেয়াকে তুলে নেয়। কেয়া তার প্রথম ভালবাসা, মেয়েটা এমন খারাপ অবস্থায় পড়েছে তাকে তো মাঝপথে ফেলে দিয়ে আসতে পারে না।
জয়িতার বদলটা সে অনুমান করতে পারে, অনেক বোঝানোর চেষ্টাও করে কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। মনে মনে ভাবে কী দরকার ছিল তার অত পরের কথা ভেবে নিজের ঘরটা অগোছালো করে তোলা।
বাড়িতে সবাই বুঝতে পারে দুজনের এই ঠান্ডা লড়াইটা। অনেক ভাবে চেষ্টা করে সবাই ওদের মধ্যে আগেকার সম্পর্কটা ফিরে আসুক। কেয়া তার প্রথম ভালবাসা হলেও জয়িতাই এখন তার সব, এটা কেন জয়িতা বুঝতে পারছে না।
অবশ্য সৌরভ নিজেকে দিয়েও বিচার করে জয়িতার জায়গায় বসে, তখন ভাবে না, এটা ঠিক হচ্ছে না। সৌরভ কেয়াকে বলে দেয় এবার থেকে নিজে টাইপের স্কুলে যাবি আমি আর গাড়িতে পৌঁছে দিতে পারব না।
- কেন সৌরভদা বাড়িতে অশান্তি হচ্ছে?
- হ্যাঁ আমি চাই না, কোনভাবেই এই অশান্তি বাড়ুক, তুমি আমার অতীত আর জয়িতা আমার বর্তমান এটা তোমাকে বুঝতে হবে। তুমি লেখাপড়া না করে সাততাড়াতাড়ি বিয়ে করে নিয়েছিলে এখন সেই বিয়েটা তোমার ভেঙে গেছে সে দায় তো আমার নয়। যখনতখন আমাকে ফোন করে বিরক্ত করো কেন? এমনকি রাতেও যখন স্বামী-স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত সময় তখনও তুমি ফোন করবে কেন? আমার তো মনে হয় তুমি ইচ্ছে করে আমার বিবাহিত জীবনটা ডিস্টার্ব করছ। আমি প্রত্যেক মাসে তোমার টাইপ আর স্টেনোগ্রাফির টাকা পৌঁছে দেব, আমার সাথে আর দেখা করার চেষ্টা কোরো না, তোমার শেখা কমপ্লিট হলে সার্টিফিকেট নিয়ে আমাকে জানিয়ো আমি আমার সাধ্য মতন চেষ্টা করব যদি একটা কাজ জোগাড় করে দিতে পারি, ব্যস এই অবধি আমার দায়িত্ব।
আজ জয়িতার জন্মদিন। এই জন্মদিন আর বিয়ের তারিখ নিজেদের মতন করে কাটায় এ নিয়ে সৌরভ বলে বছরের এই দুটো দিন আমাদেরকে একটু একলা থাকতে দিয়ো, বাকি সবদিন তো তোমাদের সাথেই থাকি। সত্যি ওরা পুজো বা নববর্ষ দোল সব উত্সবের দিন সবার সাথে উদ্যাপন করে।
সৌরভ একটা সুন্দর শাড়ি, ফ্লুরিস থেকে জয়িতার নাম লেখা একটা ভাল কেক আর অর্কিড ফুল দিয়ে সাজানো একটা বোকে কিনে জয়িতার স্কুলের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করছিল, জয়িতা বেরিয়েই দেখত পেল সৌরভকে, একটা হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল জয়িতার মুখে। সৌরভ এগিয়ে গিয়ে জয়িতার হাত ধরে নিয়ে এল গাড়ির কাছে, বন্ধুরা সব হেসে বলল, যা তোর জন্মদিনে তোর বর তোর জন্য অপেক্ষা করছে, আজকের দিনে আর মানঅভিমান রাখিস না মনে, জয়িতাও হেসে এগিয়ে এসে বলল, কী ব্যাপার একেবারে স্কুলের সামনে!
- অবাক হয়েছ?
- হ্যাঁ তা একটু হয়েছি।
- বলছি যে গাড়িতে উঠে বসবে না সবার সামনে?
জয়িতা তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসে পড়ল, আবেগে অভিমানে তার চোখ দুটো জলে ভরে গেছে। সৌরভ ওর সুন্দর নরম হাতদুটো জড়িয়ে নিয়ে বলল, যদি কিছু ভুল হয়ে থাকে, তারজন্য ক্ষমা চাইছি। আমি কোন কিছুরই বিনিময়ে আমাদের মধ্যে দূরত্ব আসতে দেব না। মোটামুটি সৌরভের সঙ্গে কেয়ার কী সম্পর্ক ছিল, আজ কী অবস্থা, কেন তাকে সাহায্য করার জন্য সে এগিয়ে এসেছিল, এবং আজ কী বলে এসেছে সব কথা খুঁটিয়ে বলল তাকে। তারপরও বলল, আমার মনে হল কেয়া যেন ইচ্ছে করে সময় অসময় ফোন করে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছেদ আনতে চাইছে। তাই ওকে বলেছি আমার যতটুকু করণীয় ছিল তা করেছি, আর আমার পক্ষে কিছু সম্ভব নয়। জয়িতা মুখ নিচু করে নিল, ওর চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। সৌরভ একদম ফাঁকা জায়গা দেখে গাড়িটা দাঁড় করাল তারপর জয়িতার সুন্দর মুখটা দু'হাতের তালুতে তুলে ধরে ওর চোখের জল মুছিয়ে দিল। নিজের দিকে আকর্ষণ করে বলল, আমি বুঝতে পারলাম, কেয়া যত বিপদেই পড়ুক এভাবে এগিয়ে আসা ঠিক হয়নি কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার তোমার প্রতি ভালবাসার একবিন্দু কম হয়নি, কিন্তু ওকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য এফোর্ট দিয়েছি, কিন্তু তারজন্য ওকে গাড়ি করে নিয়ে যাবার তো দরকার নেই নিজের স্ত্রীকে বাদ দিয়ে? বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুলে গালে চোখের পাতায় অনেক চুম্বন দিয়ে বলল, আমায় মাপ করেছ তো?
- হ্যাঁ আর না করে কী উপায়?
- তবে কিছু উপায় নেই বলছ?
জয়িতা মাথা নেড়ে জানাল নেই, তখন সৌরভ নিজের গালটা এগিয়ে দিয়ে বলল, তবে আমার পাওনাটা দিয়ে দাও।
- ধ্যাৎ লোকজন ভর্তি রাস্তায়।
- কোথায় লোকজন আমি তো ফাঁকা জায়গা দেখে গাড়ি দাঁড় করিয়েছি।
বাধ্য হয়ে জয়িতা সৌরভের বাড়ানো গালে অনেক আদরের ছোঁয়া দিল, আবেশে সৌরভের চোখ বুজে এল, দুজনে দুজনকে ধরে বেশ কিছুক্ষণ থাকার পর সৌরভ আসতে আসতে বলল, তোমার জন্য একটা শাড়ি এনেছি দেখবে না?
- হ্যাঁ নিশ্চয়ই দেখব।
- চলো তাহলে আমরা পার্ক-স্ট্রিট যাই ওখানে হোটেলে বসে তুমি কেকও কাটবে আর শাড়িটাও দেখাব তখন, ঠিক আছে?
- হ্যাঁ ঠিক আছে।
- তাহলে চলো এবার বাকিটা রাতের জন্য তোলা থাক।
- ধ্যাৎ খুব অসভ্য।
- কী আর করা যাবে, এমন দীর্ঘ বিরহ হলে অসভ্যতা তো একটু হবেই।
দুজনেই হেসে ফেলল। সৌরভের গাড়ি স্পিডে পার্কস্ট্রিটের রাস্তা ধরল।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment