বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক সংখ্যা/বরষা/কবিতা/২য় বর্ষ/১৪তম/১৪ই ভাদ্র,
১৪৩১
কবিতাগুচ্ছ |
বরষা | পরান মাঝি হাঁক দিয়েছে
কবি পরিচিতিসহ
কবিতাগুচ্ছ
রাম
বসু
পরান মাঝি হাঁক দিয়েছে
অনেকক্ষণ বৃষ্টি থেমে গেছে
বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ
ফুটো চাল দিয়ে আর জল গড়িয়ে পড়বে না
খোকাকে শুইয়ে দাও।
বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ
ফুটো চাল দিয়ে আর জল গড়িয়ে পড়বে না
খোকাকে শুইয়ে দাও।
খোকাকে শুইয়ে দাও
তোমার বুকের ওম থেকে নামিয়ে
ঐ শুকনো যায়গাটায়, শুইয়ে দাও,
গায়ের ঐ কাঁথাটা টেনে দাও
অনেকক্ষণ বৃষ্টি থেমে গেছে।
তোমার বুকের ওম থেকে নামিয়ে
ঐ শুকনো যায়গাটায়, শুইয়ে দাও,
গায়ের ঐ কাঁথাটা টেনে দাও
অনেকক্ষণ বৃষ্টি থেমে গেছে।
মেঘের পাশ দিয়ে কেমন সরু চাঁদ উঠেছে
তোমার ভুরুর মতো সরু চাঁদ
তোমার চুলের মতো কালো আকাশে,
বর্ষার ঘোলা জল মাঠ ভাসিয়ে নদীতে মিশে গেছে
কুমোর পাড়ার বাঁশের সাঁকোটা ভেঙে গেছে বোধ হয়
বোধ হয় ভেসে গেছে জলের তোড়ে
অভাবের টানে যেমন আমাদের আনন্দ ভেসে যায়।
তোমার ভুরুর মতো সরু চাঁদ
তোমার চুলের মতো কালো আকাশে,
বর্ষার ঘোলা জল মাঠ ভাসিয়ে নদীতে মিশে গেছে
কুমোর পাড়ার বাঁশের সাঁকোটা ভেঙে গেছে বোধ হয়
বোধ হয় ভেসে গেছে জলের তোড়ে
অভাবের টানে যেমন আমাদের আনন্দ ভেসে যায়।
নলবনের ধার দিয়ে
পানবরোজের পাশ দিয়ে
গঞ্জের স্টীমারের আলো—
আলো পড়েছে ঘোলা জলে
রামধনুর মতো
রামধনুর মতো এই রাত্রিরবেলা।
ধানক্ষেত ভাসিয়ে জল গড়ায় নদীতে
স্টীমারের তলায়
আমাদের অভাবের মতো
ঠিক আমাদের কপালের মতো।
আমাদের পেটে তো ভাত নেই
পড়নের কাপড় নেই
খোকার মুখে দুধও তো নেই এক ফোঁটাও
তবু কেন এই গঞ্জ হাসিতে উছলে ওঠে?
তবু কেন এই স্টীমার শস্যতে ভরে ওঠে?
আমাদের অভাবের নদীর উপর দিয়ে
কেন ওরা সব পাঁজরকে গুঁড়িয়ে যায়?
পানবরোজের পাশ দিয়ে
গঞ্জের স্টীমারের আলো—
আলো পড়েছে ঘোলা জলে
রামধনুর মতো
রামধনুর মতো এই রাত্রিরবেলা।
ধানক্ষেত ভাসিয়ে জল গড়ায় নদীতে
স্টীমারের তলায়
আমাদের অভাবের মতো
ঠিক আমাদের কপালের মতো।
আমাদের পেটে তো ভাত নেই
পড়নের কাপড় নেই
খোকার মুখে দুধও তো নেই এক ফোঁটাও
তবু কেন এই গঞ্জ হাসিতে উছলে ওঠে?
তবু কেন এই স্টীমার শস্যতে ভরে ওঠে?
আমাদের অভাবের নদীর উপর দিয়ে
কেন ওরা সব পাঁজরকে গুঁড়িয়ে যায়?
শোনো,
বাইরে এসো,
বাঁকের মুখে পরাণ মাঝি হাঁক দিয়েছে
শোনো, বাইরে এসো,
ধান বোঝাই নৌকা রাতারাতি পেরিয়ে যায় বুঝি
খোকাকে শুইয়ে দাও।
বিন্দার বৌ শাঁখে ফুঁ দিয়েছে।
এবার আমরা ধান তুলে দিয়ে মুখ বুজিয়ে মরবো না
এবার আমরা প্রাণ তুলে দিয়ে অন্ধকারে কাঁদবো না
এবার আমরা তুলসীতলায় মনকে বেঁধে রাখবো না।
বাইরে এসো,
বাঁকের মুখে পরাণ মাঝি হাঁক দিয়েছে
শোনো, বাইরে এসো,
ধান বোঝাই নৌকা রাতারাতি পেরিয়ে যায় বুঝি
খোকাকে শুইয়ে দাও।
বিন্দার বৌ শাঁখে ফুঁ দিয়েছে।
এবার আমরা ধান তুলে দিয়ে মুখ বুজিয়ে মরবো না
এবার আমরা প্রাণ তুলে দিয়ে অন্ধকারে কাঁদবো না
এবার আমরা তুলসীতলায় মনকে বেঁধে রাখবো না।
বাঁকের মুখে কে যাও, কে?
লণ্ঠনটা বাড়িয়ে দাও
লণ্ঠনটা বাড়িয়ে দাও!
আমাদের হাঁকে রূপনারায়ণের স্রোত ফিরে যাক
আমাদের সড়কিতে কেউটে আঁধার ফর্সা হয়ে যাক
আমাদের হৃৎপিণ্ডের তাল দামামার মতো
ঝড়ের চেয়ে তীব্র আমাদের গতি।
শাসনের মুগুর মেরে আর কত কাল চুপ করিয়ে রাখবে?
এসো,
বাইরে এসো—
আমরা হেরে যাবো না
আমরা মরে যাবো না
আমরা ভেসে যাবো না
নিঃস্বতার সমুদ্রে একটা দ্বীপের মতো আমাদের বিদ্রোহ
আমাদের বিদ্রোহ মৃত্যুর বিভীষিকার বিরুদ্ধে—
লণ্ঠনটা বাড়িয়ে দাও
লণ্ঠনটা বাড়িয়ে দাও!
আমাদের হাঁকে রূপনারায়ণের স্রোত ফিরে যাক
আমাদের সড়কিতে কেউটে আঁধার ফর্সা হয়ে যাক
আমাদের হৃৎপিণ্ডের তাল দামামার মতো
ঝড়ের চেয়ে তীব্র আমাদের গতি।
শাসনের মুগুর মেরে আর কত কাল চুপ করিয়ে রাখবে?
এসো,
বাইরে এসো—
আমরা হেরে যাবো না
আমরা মরে যাবো না
আমরা ভেসে যাবো না
নিঃস্বতার সমুদ্রে একটা দ্বীপের মতো আমাদের বিদ্রোহ
আমাদের বিদ্রোহ মৃত্যুর বিভীষিকার বিরুদ্ধে—
এসো, বাইরে এসো
আমার হাত ধরো
পরাণ মাঝি হাঁক দিয়েছে।
আমার হাত ধরো
পরাণ মাঝি হাঁক দিয়েছে।
সংক্ষিপ্ত কবি পরিচিতি
কবি রাম বসু
জন্ম ১১ই সেপ্টেম্বর,
১৯২৫, তারাগুনিয়া গ্রাম, বাদুড়িয়া, বসিরহাট।
অমৃতলোকে যাত্রা ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭।
পিতা ললিত কুমার বসু ও
মাতা ইন্দুবালা বসু। ঠাকুরদা অঘোরনাথ বসু একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক। শৈশবেই মাকে
হারিয়ে তিনি এবং পিতা থাকতেন ওড়িশার সুন্দরগড়ের জরাইকেলা গ্রামে।
শিক্ষা শুরু বাড়ির
সামনের পাঠশালায়। বাদুড়িয়া লন্ডন মিশনারি সোসাইটি হাইস্কুল
থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাশ। কলকাতা বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে
স্নাতক।
কলেজ থেকেই রাজনীতির
সঙ্গে যুক্ত।
কর্মস্থল পশ্চিমবঙ্গ
মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, ডেপুটি সেক্রেটারি।
স্ত্রী স্কুল শিক্ষিকা
এবং একমাত্র কন্যা সুকন্যা বারুইপুর কলেজে অধ্যাপিকা।
শৈশবে ক্লাস ফাইভ-সিক্স
থেকেই কবিতা লেখা শুরু। বাদুড়িয়া এলএমএস-এর প্রধান শিক্ষক সুবীর কুমার মিত্র ও পণ্ডিত মশাই
গোবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় তাঁর কাব্য
জগতে প্রবেশ।
প্রথম রচনা প্রকাশিত
অরণী পত্রিকা ১৯৪৩ সাল –কবিতা। অগ্রণী, ডাক, ইস্পাত, নতুন সাহিত্য, পরিচয়, সপ্তাহ
ইত্যাদি পত্রিকা। ১২-১৩টি উপন্যাস প্রকাশিত কনিষ্ক ছদ্মনামে, যেমন ঘসেটি বেগম, মোগল
হাটের সন্ধ্যা, ফিরিঙ্গি হাওয়া ইত্যাদি।
কাব্যগ্রন্থ তোমাকে (১৯৫০), যখন যন্ত্রণা (১৯৫৮), দৃশ্যের দর্শন (১৯৫৬), অন্তরালে প্রতিমা (১৯৬৬), মলিন আয়না (১৯৬৯), কানামাছি (১৯৭৪), সময়ের কাছে সমুদ্রের কাছে (১৯৭৯), মন্ত্র খুঁজি (১৯৮১), দে’জ শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৯), আমি সাক্ষ্য দিই (১৯৯০), ঝিনুকে পড়ন্ত আলো (২০০০), জোনাকির আদিত্য বৃত্তান্ত (২০০১), সমুদ্র যে কাল (২০০৩), রাম বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০৫), যাই যাচ্ছি (২০০৭) ইত্যাদি।
‘তোমাকে’ কাব্যগ্রন্থের
‘চৌমাথার কথা’ কবিতায় পাই –
হারিয়ে গিয়েছে তারাগুণে
গ্রাম, নির্জন ইছামতী
কি হবে কান্না – থাক না।
কাব্যনাট্য ‘নাটক ও
কিছু কবিতা’ (১৯৮৫), ‘একগুচ্ছ কাব্য নাটক’ (১৯৮৮)।
১৯৮৯ সালে তাঁর
‘একগুচ্ছ কাব্য নাটক’-এর জন্য তিনি রবীন্দ্র পুরষ্কারে ভূষিত হন। এছাড়া উল্টোরথ
পুরষ্কার, রামমোহন স্মৃতি পুরষ্কার (২০০১) পেয়েছেন।
কবি রাম বসু
অমৃতলোকে যাত্রা ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭।
কাব্যগ্রন্থ তোমাকে (১৯৫০), যখন যন্ত্রণা (১৯৫৮), দৃশ্যের দর্শন (১৯৫৬), অন্তরালে প্রতিমা (১৯৬৬), মলিন আয়না (১৯৬৯), কানামাছি (১৯৭৪), সময়ের কাছে সমুদ্রের কাছে (১৯৭৯), মন্ত্র খুঁজি (১৯৮১), দে’জ শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৯), আমি সাক্ষ্য দিই (১৯৯০), ঝিনুকে পড়ন্ত আলো (২০০০), জোনাকির আদিত্য বৃত্তান্ত (২০০১), সমুদ্র যে কাল (২০০৩), রাম বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০৫), যাই যাচ্ছি (২০০৭) ইত্যাদি।
কি হবে কান্না – থাক না।

No comments:
Post a Comment