বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১৬তম
সংখ্যা/শারদ/১৮ই আশ্বিন, ১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
হিমাদ্রিশেখর দত্ত
মায়ামোহন
[২য় পর্ব]
"কী মনে হতে সোমনাথ চোখ তোলে গত সন্ধ্যায় দেখা আকাশের নির্দিষ্ট কোণে। উজ্জ্বল আলোর বিন্দুটি একবার, দুবার টিপটিপ করলো- তার পরের মুহূর্তে আর সেখানে নেই। অনেক চেষ্টা করেও তাকে সারা আকাশের কোথাও খুঁজে পায় না সোমনাথ।"
পূর্বানুবৃত্তি কর্কট
রোগে ৬৪ বৎসর বয়সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন শেষ বারের মতো। স্ত্রী, দুই
ছেলে, বৌমা, নাতনি
সবচেয়ে কাছের ছিল। কিন্তু ইচ্ছে না করলেও বেরিয়ে যাওয়াটা আটকাতে পারেননি। নিয়তির
বিধান। তেত্রিশ বছর পরে, মায়ার টান যেন আবার হঠাৎ ফিরে
আসছে। এতদিনে বাড়িটার যা অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে, দুই ভাই শেষ
পর্যন্ত, ডেভেলাপারের হাতে সেটা তুলে দেবে। তারপর...
অবশেষে, বাবার মৃত্যুতিথিতেই তাঁর
নামাঙ্কিত ভূমির উপর নির্মিত নতুন ফ্ল্যাটের গৃহপ্রবেশ এবং গৃহপূজা রেখেছে ছেলেরা।
দুই পুত্র আর পুত্রবধুরা আজ এখানে উপস্থিত। তাহারা আজ আনন্দিত তথাপি বিষাদগ্রস্তও
বটে। এক সময় যা কেবল একান্তভাবে তাদের ছিল, আজ সেখানে আরো পাঁচঘর উপিস্থিত।
বিস্তারিত একতলার বাটিকার আজ আর কোন রূপরেখা নাই। স্থলপদ্মের গাছে আর টগর বিছানো
বাগান, ঠান্ডা কাচ জলের কুয়োটি, জবাফুলের গাছটি কিছুই নাই। কেবল আবছা প্রতিবিম্বের
মতো সেগুলি তাদের চোখের সামনে যেন দুলিতে থাকে। আমরা এখনও আছি, মাথা দুলিয়ে তাই
যেন বারবার জানান দিতে থাকে। আগামীকাল সকালে পূজা। সোমনাথ ফ্ল্যাটের ছাদে উঠে আসে।
মনে মনে ভাবে, আজকের দিনটা যদি বাবা দেখতে পারতেন। আবার ভাবে, বাবাই যদি থাকতেন,
তাহলে তো এই পাঁচতলা ফ্ল্যাট বাড়িটাই হতো না। তাহলে তো সকলে মিলে যেমন একসাথে ছিল,
তেমনই থাকত। কিন্তু সময় আর নিয়তির হাত থেকে কোন কিছু রেহাই পায় না। সে নিজেও পাবে
না। শুধু সময়ের অপেক্ষা। তবু যেন বার বার মনে হয়, যদি বাবার মুখটা আজ একটু দেখতে
পারত। বোঝার চেষ্টা করত, তাদের এই কৃতকর্মে তিনি কী খুশি হয়েছেন? না কি ব্যথিত? নিজের কাজের জায়গায়, রাতের অন্ধকারে, বিছানায়
শুয়ে, কতদিন, কত কত রাত, মনপ্রাণ সব একাগ্র করে, হাত উপরে তুলে বাবার হাতের আঙুল
ছুঁতে চেয়েছে। কিন্তু বাবা আসেননি। সোমনাথ জানে, বাবা এত কাছাকাছি থাকেন না, যে
সেখানে গিয়ে তার আকুলতা পৌঁছাতে পারে। কিন্তু এর চেয়ে এগিয়ে গিয়ে আরো কিছু করার মতো তার
জ্ঞানগম্যি নেই। সে শুধু জানে আকুলতার রাস্তায় হাঁটতে। আর চোখের জল ফেলতে। এইসব
নিয়ে এমন বিভোর হয়ে ছিল, যে স্ত্রী কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি। হঠাৎ চমকে
ওঠে হাতের স্পর্শ পেয়ে।
-আচ্ছা বাড়িটার নাম ‘মায়ামোহন’ রাখলে বেশি ভাল হত না?
-কেন? সোমনাথ প্রশ্ন করে।
-কী জানি, আমার মনে হয়, বাবু বেঁচে থাকলে, মায়ের নামটাই আগে রাখত।
-তোমার তাই মনে হয়?
-কী জানি। হয়তো। নিজেকে তো কোনদিন তেমনভাবে লাইমলাইটে আনতে চাইতেন না।
-হুঁ, তা বটে। অথচ দেখ, আমি তো বাবুর ধারেকাছেও যেতে পারলাম না।
-কেউ কারোর মতো হয় না। কিছুটা হয় হয়তো, বাকিটা তার নিজের মতো করেই হয়।
-তা হবে। আমাদের মেয়েরা কি আমাদের মতো কিছুটা হয়েছে?
-নিশ্চয়ই, কেন তুমি দেখতে পাও না?
-যেমন? কোনটা?
-তোমার মতো খেয়ালি তো হয়েইছে, সেটা আশা করি মানবে।
-তা হয়তো৷ আচ্ছা, তুমি দূরের ঐ আলোটা দেখতে পাচ্ছ?
-কোনটা বলছ? ঐ বাঁদিকেরটা?
-হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটাই।
-কেন বল তো?
-ওটা কী নতুন কোন তারা? আকাশের ঐ কোণায় কখনও এত উজ্জ্বল তারা আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি তো!
-তুমি সব তারা গুণে রেখেছ বুঝি?
-না, তা কেন! তবে আমি এমনিই মাঝে মাঝে আকাশের দিকে দেখি। কখনও চোখে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না।
-হয়তো কোন সুটিং স্টার ওটা।
-তাহলে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকত না।
-তা বটে, চল নীচে চল। কাল সকাল সকাল আসতে হবে।
পরের দিন কাজকর্ম আর হোমাদি শেষ করে, কয়েকজন চেনা পরিচিত আর ডেভালাপারের লোকজন খাওয়াদাওয়া সেরে যাবার পরে, সকলকে বিদায় জানিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার মুখে, সোমনাথ চমকে যায়। আজ সকালে, তার সামনে বাড়ির নামের কারুকার্য্য করা প্লেটটা দেওয়ালে লাগানো হয়েছে। গাঁদা ফুলের মালাটা এখনও ঝুলছে তার গায়ে। কিন্তু নামটা? নামটা তো... ‘মোহনমায়া’ লেখা ছিল- সে দিব্যি কেটে বলতে পারে৷ ব্যস্ত হয়ে, নীচে থেকেই চেঁচিয়ে সবাইকে নেমে আসতে বলে।
পাড়ার স্ট্রিট লাইটের
আলোয়, ঝলমল করছে নেমপ্লেটখানা - তাতে বড় করে লেখা ‘মায়ামোহন’।
কী মনে হতে সোমনাথ চোখ তোলে গত সন্ধ্যায় দেখা আকাশের নির্দিষ্ট কোণে। উজ্জ্বল আলোর বিন্দুটি একবার, দুবার টিপটিপ করলো- তার পরের মুহূর্তে আর সেখানে নেই। অনেক চেষ্টা করেও তাকে সারা আকাশের কোথাও খুঁজে পায় না সোমনাথ।
সুটিং স্টার? না।
তবে কী...
-আচ্ছা বাড়িটার নাম ‘মায়ামোহন’ রাখলে বেশি ভাল হত না?
-কেন? সোমনাথ প্রশ্ন করে।
-কী জানি, আমার মনে হয়, বাবু বেঁচে থাকলে, মায়ের নামটাই আগে রাখত।
-তোমার তাই মনে হয়?
-কী জানি। হয়তো। নিজেকে তো কোনদিন তেমনভাবে লাইমলাইটে আনতে চাইতেন না।
-হুঁ, তা বটে। অথচ দেখ, আমি তো বাবুর ধারেকাছেও যেতে পারলাম না।
-কেউ কারোর মতো হয় না। কিছুটা হয় হয়তো, বাকিটা তার নিজের মতো করেই হয়।
-তা হবে। আমাদের মেয়েরা কি আমাদের মতো কিছুটা হয়েছে?
-নিশ্চয়ই, কেন তুমি দেখতে পাও না?
-যেমন? কোনটা?
-তোমার মতো খেয়ালি তো হয়েইছে, সেটা আশা করি মানবে।
-তা হয়তো৷ আচ্ছা, তুমি দূরের ঐ আলোটা দেখতে পাচ্ছ?
-কোনটা বলছ? ঐ বাঁদিকেরটা?
-হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটাই।
-কেন বল তো?
-ওটা কী নতুন কোন তারা? আকাশের ঐ কোণায় কখনও এত উজ্জ্বল তারা আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি তো!
-তুমি সব তারা গুণে রেখেছ বুঝি?
-না, তা কেন! তবে আমি এমনিই মাঝে মাঝে আকাশের দিকে দেখি। কখনও চোখে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না।
-হয়তো কোন সুটিং স্টার ওটা।
-তাহলে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকত না।
-তা বটে, চল নীচে চল। কাল সকাল সকাল আসতে হবে।
পরের দিন কাজকর্ম আর হোমাদি শেষ করে, কয়েকজন চেনা পরিচিত আর ডেভালাপারের লোকজন খাওয়াদাওয়া সেরে যাবার পরে, সকলকে বিদায় জানিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার মুখে, সোমনাথ চমকে যায়। আজ সকালে, তার সামনে বাড়ির নামের কারুকার্য্য করা প্লেটটা দেওয়ালে লাগানো হয়েছে। গাঁদা ফুলের মালাটা এখনও ঝুলছে তার গায়ে। কিন্তু নামটা? নামটা তো... ‘মোহনমায়া’ লেখা ছিল- সে দিব্যি কেটে বলতে পারে৷ ব্যস্ত হয়ে, নীচে থেকেই চেঁচিয়ে সবাইকে নেমে আসতে বলে।
কী মনে হতে সোমনাথ চোখ তোলে গত সন্ধ্যায় দেখা আকাশের নির্দিষ্ট কোণে। উজ্জ্বল আলোর বিন্দুটি একবার, দুবার টিপটিপ করলো- তার পরের মুহূর্তে আর সেখানে নেই। অনেক চেষ্টা করেও তাকে সারা আকাশের কোথাও খুঁজে পায় না সোমনাথ।
সুটিং স্টার? না।
তবে কী...
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment