বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই
আশ্বিন, ১৪৩১
শারদ | ধারাবাহিক গল্প
আবদুস সাত্তার বিশ্বাস
চাঁদ
[১ম পর্ব]
"অই শালাধের অত্যাচারে আমার কুতুবমিয়ার বাগানের আম, কাঁঠাল কুনুদিন খাত্যে পাই ন্যা। শালারা সব পাড়্যা খাইয়্যা ল্যায়। তাছাড়া শালাধের ছাগল, গোরুর অত্যাচারে আমার পরান মাঝির ভুঁইখ্যানে কুনুদিন ভাল আবাদ হয় না; চরে যায়।"
আইনুদ্দিন ও আফরোজা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী ছিল। তিরিশ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। আফরোজার বাপ লাটের বড় মহাজন ছিলেন। এলাকার যত লাট্যা সবাই তাঁর কাছে লাট কিনত। সেই লাট কাটুনিদের দিয়ে তারা কাটাত। যে মেয়ে লাট থেকে সুতো বের করতে পারে তাকে কাটুনি বলে। আর লাট থেকে সুতো বের করাকে বা সুতো বের করার পদ্ধতিকে লাট কাটা বলে। গাঁয়ের অভাবগ্রস্ত গরিব মেয়েরাই কেবল লাট কাটে। তা-ও আবার সব মেয়ে নয়। কোনও কোনও মেয়ে। কারণ, লাটের ছ্যারানির পচা দুর্গন্ধ সবাই নিতে পারে না। লাট ভিজানো পচা পানি হল লাটের ছ্যারানি।
টাক্যাতে লাট নিয়ে
কাটার সময় ওই পানি সারা গায়ে ছিটিয়ে পড়ে। ভাল করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ভাল তেল না
মাখা পর্যন্ত ওই দুর্গন্ধ যায় না। তাই লাট যারা কাটে গা ধোওয়ার আগে কাটে। গা
ধোওয়ার পরে আর কেউ লাট কাটে না। যারা কাটুনিদের দিয়ে লাট কাটায় তারা হল লাট্যা।
শুধু লাটের নয়, সুতোরও তিনি বড় মহাজন ছিলেন। এলাকার সমস্ত
লাট্যার বেশিরভাগ সুতোই তিনি কিনতেন। কিনে ভাগলপুরে চালান দিতেন। সুতো বলতে এখানে
রেশম সুতোর কথা বলা হচ্ছে; আর লাট বলতে রেশম গুঁটির কথা বলা
হচ্ছে। বছরে লক্ষ লক্ষ টাকা তিনি ওই ব্যবসা থেকে আয় করতেন। ফলে এমন বাপের মেয়ে
আফরোজার স্বামী হওয়ার কোনো যোগ্যতাই তার ছিল না। তবু আফরোজার সঙ্গে তার বিয়ে
হয়েছিল। তাদের দাম্পত্য জীবনে কোনো অশান্তি ছিল না, কোনো মনোমালিন্য
ছিল না, কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। সুখের জীবন ছিল। একে অপরকে
তারা ভীষণই ভালবাসত। সেই আফরোজা গতবছর মারা গেলে এ বছর আইনুদ্দিন তার
মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছে।
ছেলেবেলায় আইনুদ্দিন একটা হতভাগা বালক
ছিল। গাঁয়ের স্কুলে কয়েক ক্লাস পড়ার পর তার আর পড়া হয়নি। বাপ নিসার আলি সেখ তাকে ভাতের অভাবে
মানুষ করতে না পেরে ইউসুফ মোড়লের বাড়ি প্যাট ভাতা খাটতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। প্যাট
ভাতা খাটা বলতে, প্যাটে খাবে আর কাজ করবে। বিনিময়ে কোনো পয়সা
পাবে না। আইনুদ্দিন প্যাটে খেত আর ইউসুফ মোড়লের বাড়ি কাজ করত। ইউসুফ মোড়ল যখন যে
কাজে হুকুম করত। বিনিময়ে কোনো পয়সা পেত না।
ইউসুফ মোড়লের তখন অবস্থা ভাল ছিল, জমিদার গোছের মানুষ, অনেক জমি ছিল, বাড়িতে আটটা-দশটা গোলা ছিল, গোলা ভর্তি ধান ছিল। ফলে ভাতের কোনোদিন তার কষ্ট হয়নি। কিন্তু কালের স্রোতে সব হারিয়ে ফেলে শেষ বয়সে সে না খেতে পেয়ে মরল।
আইনুদ্দিন ইউসুফ মোড়লের বাড়ি বছর চারেক ছিল। বছর চারেক থাকার পর ইউসুফ মোড়ল তাকে একদিন একটা খালি বস্তা আর কিছু টাকা দিয়ে বলেছিল— এই টাকা কডা আর এই খালি বস্তাডা লিইয়্যা যাইয়্যা দশ কেজি য়ুরিয়্যা সাহার কিনে আন। হেঁতালের ভুঁই খানে য বুনা আছে; দিতে হবে। অল্প দিনে তাহিলে বড় হইয়্যা যাবে। গোরু, মোষ ও ছাগলকে কাট্যা খাওয়ান্যা হবে। সাহার কিনতে যাইয়্যা হারিয়্যা যাস ন্যা যানে! তাড়াতাড়ি চলে আসবি। আস্যা গোরু-মোষের নাদে পানি দিতে হবে। দেরি কল্লে কিন্তুক পিঠে গাদোন পড়বে। আগেই বুলে দিনু!
পাড়ায় তখন দু-খানা সারের দোকান ছিল। ইমরুল ফরাজির একখানা। আর কাদির সেখের একখানা। ইমরুল ফরাজির দোকানখানা ছিল কাছে। আর কাদির সেখের দোকানখানা ছিল দূরে। যে কারণে আইনুদ্দিন শুধিয়েছিল— কার দোকানে যাব? ইমরুল ফরাজির না কাদির সেখের?
ইউসুফ মোড়লের বাড়ি কাজ করলেও ইউসুফ মোড়লের চাইতে তার ভাষাজ্ঞান টনটনে ছিল। পরিষ্কার বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারত। ভাষার মধ্যে কোনো জড়তা ছিল না।
ইউসুফ মোড়ল বলেছিল— যার দুকান থেক্যা পারবি তার দুকান থেক্যা লিইয়্যা আই গা! শুদু এ্যাকচিন তাড়াতাড়ি আসবি তাহিলেই হবে।
আইনুদ্দিন সার কিনে নিয়ে বাড়ি এলে ইউসুফ মোড়ল তাকে শুধিয়েছিল— কার দুকানে গেলছিলি? এ্যাতো তাড়াতাড়ি চলে আলি!
আইনুদ্দিন বলেছিল— ইমরুল ফরাজির দোকানে গিয়েছিলাম।
- অর দুকানে গেলছিলি ক্যানে?
- না গেলে আপনার কথা মতো তাড়াতাড়ি বাড়ি আসতে পারতাম না। কাদির সেখের দোকান ইমরুল ফরাজির দোকানের চাইতে দূরে না!
ইউসুফ মোড়ল তখন বলেছিল— তাড়াতাড়ি সাহার ঘুর্যে দিইয়্যা আয়! অই শালাধের অত্যাচারে আমার কুতুবমিয়ার বাগানের আম, কাঁঠাল কুনুদিন খাত্যে পাই ন্যা। শালারা সব পাড়্যা খাইয়্যা ল্যায়। তাছাড়া শালাধের ছাগল, গোরুর অত্যাচারে আমার পরান মাঝির ভুঁইখ্যানে কুনুদিন ভাল আবাদ হয় না; চরে যায়। দেখ্যা ফেল্যা কিছু বুলতে গেলে অই শালাধেরই কত মেজাদ! হেঁস্যা, লাঠি লিইয়্যা তেড়ে চলে আসে। সেই থেক্যা অই শালা ইমরুল ফরাজির দুকানে আমি কুনুদিন কুনু জিনিস কিনতে যাই ন্যা। আমার বাড়ির কাহুকে কিনতে যাত্যেও দিই ন্যা। হিঁদুধের ভালবাসি তো অই শালাধের ভালবাসি ন্যা। সাধে কি আর জোটু চাচা বুলতোক... থাক, আর বুলছি ন্যা। যাই হোক, সাহার ঘুর্যে দিইয়্যা টাকা লিইয়্যা চলে আয়! আমি কাদির সেখের দুকান থেক্যা কিনে লিব।
আইনুদ্দিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল— আপনাকে তো আমি যাওয়ার সময় 'কার দোকানে যাব' জিজ্ঞেস করেই গেলাম। আপনি বললেন... তারপরও আপনি—
- হ্যাঁ, তারপরও আমি ঘুর্যে দিইয়্যা আসতে বুলছি। ঘুর্যে দিইয়্যা আয়!
- আমি যাব না; আপনি যান!
- কী বুললি! আমি যাব! ইউসুফ মোড়ল অমনি পান্ঠি দিয়ে তাকে মারতে শুরু করেছিল। মারতে মারতে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল— আমার বাড়ি থেক্যা তুই বার হইয়্যা যা! হারামজাদা! তোর মুতন বাহিঞ্চোত ছেল্যা আমার দরকার নাই। ভাত দিলে কত ছেল্যা আস্যা পালা লেগ্যা যাবে।
আইনুদ্দিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল— আমাকে বের করে দিবেন না, হুজুর! আমাকে বের করে দিবেন না! আমার ভুল হয়ে গেছে। এ রকম ভুল আমি আর কোনোদিন করব না।
ইউসুফ মোড়ল তার কোনো কান্না শোনেনি। বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে তবেই থেমেছিল।
দুই
ইউসুফ মোড়লের তখন অবস্থা ভাল ছিল, জমিদার গোছের মানুষ, অনেক জমি ছিল, বাড়িতে আটটা-দশটা গোলা ছিল, গোলা ভর্তি ধান ছিল। ফলে ভাতের কোনোদিন তার কষ্ট হয়নি। কিন্তু কালের স্রোতে সব হারিয়ে ফেলে শেষ বয়সে সে না খেতে পেয়ে মরল।
আইনুদ্দিন ইউসুফ মোড়লের বাড়ি বছর চারেক ছিল। বছর চারেক থাকার পর ইউসুফ মোড়ল তাকে একদিন একটা খালি বস্তা আর কিছু টাকা দিয়ে বলেছিল— এই টাকা কডা আর এই খালি বস্তাডা লিইয়্যা যাইয়্যা দশ কেজি য়ুরিয়্যা সাহার কিনে আন। হেঁতালের ভুঁই খানে য বুনা আছে; দিতে হবে। অল্প দিনে তাহিলে বড় হইয়্যা যাবে। গোরু, মোষ ও ছাগলকে কাট্যা খাওয়ান্যা হবে। সাহার কিনতে যাইয়্যা হারিয়্যা যাস ন্যা যানে! তাড়াতাড়ি চলে আসবি। আস্যা গোরু-মোষের নাদে পানি দিতে হবে। দেরি কল্লে কিন্তুক পিঠে গাদোন পড়বে। আগেই বুলে দিনু!
পাড়ায় তখন দু-খানা সারের দোকান ছিল। ইমরুল ফরাজির একখানা। আর কাদির সেখের একখানা। ইমরুল ফরাজির দোকানখানা ছিল কাছে। আর কাদির সেখের দোকানখানা ছিল দূরে। যে কারণে আইনুদ্দিন শুধিয়েছিল— কার দোকানে যাব? ইমরুল ফরাজির না কাদির সেখের?
ইউসুফ মোড়লের বাড়ি কাজ করলেও ইউসুফ মোড়লের চাইতে তার ভাষাজ্ঞান টনটনে ছিল। পরিষ্কার বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারত। ভাষার মধ্যে কোনো জড়তা ছিল না।
ইউসুফ মোড়ল বলেছিল— যার দুকান থেক্যা পারবি তার দুকান থেক্যা লিইয়্যা আই গা! শুদু এ্যাকচিন তাড়াতাড়ি আসবি তাহিলেই হবে।
আইনুদ্দিন সার কিনে নিয়ে বাড়ি এলে ইউসুফ মোড়ল তাকে শুধিয়েছিল— কার দুকানে গেলছিলি? এ্যাতো তাড়াতাড়ি চলে আলি!
আইনুদ্দিন বলেছিল— ইমরুল ফরাজির দোকানে গিয়েছিলাম।
- অর দুকানে গেলছিলি ক্যানে?
- না গেলে আপনার কথা মতো তাড়াতাড়ি বাড়ি আসতে পারতাম না। কাদির সেখের দোকান ইমরুল ফরাজির দোকানের চাইতে দূরে না!
ইউসুফ মোড়ল তখন বলেছিল— তাড়াতাড়ি সাহার ঘুর্যে দিইয়্যা আয়! অই শালাধের অত্যাচারে আমার কুতুবমিয়ার বাগানের আম, কাঁঠাল কুনুদিন খাত্যে পাই ন্যা। শালারা সব পাড়্যা খাইয়্যা ল্যায়। তাছাড়া শালাধের ছাগল, গোরুর অত্যাচারে আমার পরান মাঝির ভুঁইখ্যানে কুনুদিন ভাল আবাদ হয় না; চরে যায়। দেখ্যা ফেল্যা কিছু বুলতে গেলে অই শালাধেরই কত মেজাদ! হেঁস্যা, লাঠি লিইয়্যা তেড়ে চলে আসে। সেই থেক্যা অই শালা ইমরুল ফরাজির দুকানে আমি কুনুদিন কুনু জিনিস কিনতে যাই ন্যা। আমার বাড়ির কাহুকে কিনতে যাত্যেও দিই ন্যা। হিঁদুধের ভালবাসি তো অই শালাধের ভালবাসি ন্যা। সাধে কি আর জোটু চাচা বুলতোক... থাক, আর বুলছি ন্যা। যাই হোক, সাহার ঘুর্যে দিইয়্যা টাকা লিইয়্যা চলে আয়! আমি কাদির সেখের দুকান থেক্যা কিনে লিব।
আইনুদ্দিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল— আপনাকে তো আমি যাওয়ার সময় 'কার দোকানে যাব' জিজ্ঞেস করেই গেলাম। আপনি বললেন... তারপরও আপনি—
- হ্যাঁ, তারপরও আমি ঘুর্যে দিইয়্যা আসতে বুলছি। ঘুর্যে দিইয়্যা আয়!
- আমি যাব না; আপনি যান!
- কী বুললি! আমি যাব! ইউসুফ মোড়ল অমনি পান্ঠি দিয়ে তাকে মারতে শুরু করেছিল। মারতে মারতে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল— আমার বাড়ি থেক্যা তুই বার হইয়্যা যা! হারামজাদা! তোর মুতন বাহিঞ্চোত ছেল্যা আমার দরকার নাই। ভাত দিলে কত ছেল্যা আস্যা পালা লেগ্যা যাবে।
আইনুদ্দিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল— আমাকে বের করে দিবেন না, হুজুর! আমাকে বের করে দিবেন না! আমার ভুল হয়ে গেছে। এ রকম ভুল আমি আর কোনোদিন করব না।
ইউসুফ মোড়ল তার কোনো কান্না শোনেনি। বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে তবেই থেমেছিল।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment