প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Tuesday, September 24, 2024

শারদ | মায়ামোহন | হিমাদ্রিশেখর দত্ত

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১

শারদ | ধারাবাহিক গল্প

হিমাদ্রিশেখর দত্ত

মায়ামোহন

[১ম পর্ব]


"তাহার আত্মা প্রবল আকর্ষণ অনুভব করিতেছিল। নিমেষে, তাহার দিব্যতা তাহাকে গ্রহের পৃষ্ঠভূমিতে স্থাপন করিল। সেইখানে কিয়দক্ষণ নিশ্চল থাকিয়া তিনি বাতাসে তাহার পূর্ব আবাস স্থলের নির্দেশ পাইলেন যেন। আত্মার নিজস্ব কোন বোধশক্তি নাই, কারণ সে ইন্দ্রিয়াতীত।"


 সেই '৮৭ সালে, কর্কট রোগের হাত ধরে মাত্র ৬৪ বৎসর বয়সে যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন শেষ বারের মতো, তখন কার মুখটা সবচেয়ে বেশি করে মনের মধ্যে ঘুরে ফিরে আসছিল, আজ মনে নেই। স্ত্রী-র সাথে সঙ্গ সবচেয়ে পুরোনো, দুই ছেলেকেও খুব ভালবাসতেন, বড় বৌমাও খুব আদরের ছিল। কিন্তু ঐ মুহূর্তে নাতনিই সবচেয়ে কাছের ছিল। কিন্তু ইচ্ছে না করলেও বেরিয়ে যাওয়াটা আটকাতে পারেননি। 
আর কাউকে সঙ্গেও নিয়ে যেতে পারেননি। নিয়তির বিধান। কিন্তু এসবের পরেও, ইচ্ছে বাসনা লোভ এইসব দানবেরা ছায়াশরীর ধরে, বার বার টেনে নামাতে চেয়েছে তাকে ওপরে ঠে যাবার পথ থেকে। বেঁচে থাকতে তিনি দৃঢ় মনোবল এবং চরিত্রের দৃষ্টান্ত ছিলেন - কারোর চোখের জল বা নির্বাক সরবতা তাকে কখনও নিজের ভাবনা বা সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারেনি। মায়া ব্যাপারটা তার মধ্যে নারকোলের জলের মতোই সুপ্ত থাকত, তাকে ছুঁতে পারত নাতনির আধো আধো কথা, বড় বৌমার গর্ভবতী অবস্থার কষ্ট বা স্ত্রী-র অসুস্থতা। তিনি সত্যিই নির্ভীক কর্মী মানুষ ছিলেন। তাই জাগতিক টানের দড়ি টানাটানির খেলায়, তিনি একলা হলেও জিতে যেতে পেরেছিলেন। অনেক উঁচু, সাত নম্বর স্তর থেকে, জানতে পারতেন সবই। কিন্তু কখনও ইচ্ছেটা তেমন করে জায়গা পায়নি মনের গোপন ঘরে, যে একবার নেমে এসে কাছ থেকে দেখে যাবেন। এই জায়গায়, যত সময়ের চাকা এগিয়ে চলে, ফেলে আসা জীবনের একদা চলমান ভীষণ জরুরি সম্পর্ক বা সেই সুবাদে পাওয়া দায়িত্ববোধের পাল্লা একদম তুলোর মতো, সাদা মেঘের মতো হালকা হয়ে উড়ে যায়, হারিয়ে যায়।
 
আজ তেত্রিশ বছর পরে, সেই মায়ার টান যেন আবার হঠা ফিরে আসছে - টের পাচ্ছেন উনি। নতুন জন্মলাভ হয়ে যেত, কিন্তু এখনও উচিত জঠর প্রাপ্ত হয়নি। তার কর্মফল অনুযায়ী তাকে যেথাসেথা পাঠানো যায় না। খুবই সামান্য পার্থিব ভোগ আর তার বাকি আছে - মানে মুক্তির দরজা ছুঁতে৷ যদি না নতুন জন্মে কিছু বড়সড় ভুল করে বসেন। বিধাতাপুরুষের ভরসা আছে, তাই উত্তম গুণের মাতৃ জঠরের সন্ধান আর সময়কাল, দুয়েরই গোণাগুণতি চলছে। সেই সময়ে, যেন কোন অতলান্ত পাতাল হতে ফেলে আসা জন্মের মায়ার টান আজ তাকে বারবার ধ্যানের মধ্যে বিচলিত করছে। স্ত্রী-র খবর জানেন, সে তার সাথে একই স্তরে যদিও নেই, তবু কাছাকাছিই আছে। তার দোষের হিসেবনিকেশ ছোট ছোট, কিন্তু সংখ্যায় বেশি। তাই এই স্তরে উঠে আসতে একটু বেশি সময় লাগছে। তাকেও আবার ফিরে যেতে হবে, কিন্তু তার এখনও সময় আছে। একবার ভাবলেন, নীচে নামবেন, পত্নী সমভিব্যাহারে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন। কিন্তু তিনি তার স্ত্রী-র চরিত্র জানেন, বোঝেন। এই টানের কথা শুলে সেও জিদ করবে সঙ্গে চলার। কিন্তু সেটা তার পক্ষে ভাল হবে না। সপ্তম লেভেলে পৌঁছে যাবার পরে আত্মা স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছা ও কার্য্যকে রূপ দিতে পারে, তাতে তার শুচিতা, পবিত্রতা এবং নিরাকারতার কোন ভেদ ঘটে না, কিন্তু তার নীচের স্তরে এই স্বাধীনতা থাকলেও, নতুন করে আবার নিরাকারতার সাধনায় ব্রক্ষ্মকাল বসতে হবে। তাতে দেরি হয়ে যাবে, ফেরার জন্য। অতীত জীবনের স্বামী হিসেবে, ভবিষ্যতের সাথী হিসেবে এবং সকলের শুভ হেতু, তিনি তা হতে দিতে পারেন না। স্ত্রী-কে এই মুক্ত অবস্থাতেও তিনি দায়িত্বের মধ্যে বিবেচিত রেখেছেন। আর সেটাই হয়তো তার আবার ফিরে যাবার কারণ। স্থির করেন, যদি এই মায়ার টান সময়ের সাথে আরো বাড়ে, তাহলে একবার নীচে যাবেন। স্থির হয়ে আবার ধ্যানে মনসংযোগ করেন।
 
গত ত্রিশ বছরে বাড়িটার যা অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে, দুই ভাই একমত হয় শেষ পর্যন্ত, ডেভেলাপারের হাতে সেটা তুলে দেবার। সইসাবুদ আর কোর্টকাছারি করতে গিয়ে বিস্তর ধন আর সময় ব্যয় হয়। অবশেষে, প্রায় দু-বছরের আন্তরিক প্রচেষ্টায়, বাবার হাতে গড়া ভেঙে পড়া একতলা বাড়ি ভেঙে, নতুন করে চারতলা আধুনিক চকচকে ফ্ল্যাট সেই জমির ওপরে মাথা তুলে দাঁড়ায়। কার্তিকের সন্ধ্যাদীপ এখন আরো একটু উপরে উঠল পূর্বপুরুষদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে। দুই ছেলে আর তাদের পত্নীদ্বয় এখন অবসরপ্রাপ্ত বা এক-আধ বছরের অপেক্ষায়। সেই নাতনি প্রবাসে নিজবাসে স্থিত। পৃথিবীর হিসেবে তেত্রিশ বছর, মহাকালের চাকার এক পলের থেকেও কম প্রতিসরণ। আমরা ভাবি বেঁচে থাকার সময়, যা করেছি, তা আমার, আমাদের সারা জীবনের ফসল! আসলে অগুণিত ধুলিকণা আর তার ক্ষুদ্র সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। ৬০ বা ৬৫ বছরের কর্মফল যা একটি সমগ্র জীবনকাহিনি, আসলে তা কয়েক মুহূর্তেরই এক আংশিক ফল। যা কোনভাবেই চিরকালীন নয়। যা অব্যয় নয়। তবু আমরা চেষ্টার ত্রুটি করি না, লাভ ক্ষতির পেন্সিল আর রাবার সবসময় হাতে নিয়েই থাকি। মায়ার খেলা। ডাকিনীরা ফেলিছে নিশ্বাস।
 
এখন সাহ্নকাল। তপনদেব মেদিনীর এক পৃষ্ঠ হইতে বিদায় লইয়াছেন। অপর পার্শ্ব ক্রমশ আলোর সীমারেখার ছোঁয়া পাইতেছে। এমন সন্ধিক্ষণে, হরমোহন যখন নামিয়া পৌঁছিলেন- তাহার আত্মা প্রবল আকর্ষণ অনুভব করিতেছিল। নিমেষে, তাহার দিব্যতা তাহাকে গ্রহের পৃষ্ঠভূমিতে স্থাপন করিল। সেইখানে কিয়দক্ষণ নিশ্চল থাকিয়া তিনি বাতাসে তাহার পূর্ব আবাস স্থলের নির্দেশ পাইলেন যেন। আত্মার নিজস্ব কোন বোধশক্তি নাই, কারণ সে ইন্দ্রিয়াতীত।
 
তথাপি, উচিত স্থানের নিকটবর্ত্তী হইয়া তিনি জানিতে ইচ্ছা করিলেন তাহার পূর্ব নিবাসখানি। আধুনিক বিজ্ঞানের পরিমাপে তাহার দূরত্ব কয়েক হাজার কোটি মাইল, কিন্তু ইহা অপেক্ষা আর নিম্নগামী হওয়া সম্ভব নয়। ইহাই অন্তিম সীমারেখা। সেই অক্ষে ভাসিতে ভাসিতে, এক পরিচিত আত্মার দেখা পাইলেন। তাহাকে এইস্থানে নিমজ্জিত ঘূর্ণ্যমান অবস্থায় পাইয়া, ইহা হরমোহনের চিন্তন তরঙ্গে প্রবল আঘাত হানিল। সেই দ্বিতীয়জনও মায়ার টানে আজ কিছুদিন যাবত, বর্তমান অক্ষে স্থিতু হইয়াছেন। এক সময়ের প্রতিবেশী, একে অন্যকে সহজেই চিনিতে পারিলেন। ক্ষণেক সময় উপারান্ত, দুজনেই দুজনের ছাড়িয়া যাওয়া বংশজ এবং তাহাদের কর্মাদি সকল অবহিত হইলেন
 
ক্রমশ...
 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)