বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই
আশ্বিন, ১৪৩১
শারদ | ধারাবাহিক গল্প
ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য
পাকা ধানের ঘ্রাণ
[১ম
পর্ব]
"চরণ মাঝির ভাগনি সুখী। মহিমবাবুর বাড়ি এই বছর প্রথম কাজে এসেছে। সুখীর বাপ জোর করে বিয়ে দিতে চায়। রাজি নয় সুখী। বিয়ে সে করবে না কোনো মতেই, তাই বাপের চোখে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এসেছে মামার কাছে।"
"গানটান চলবে না হে, হাত চালাও। আগে কাজ, তারপর সারারাত গান গাইবে।" জমির আলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে নিধু সর্দার।
সুখীর কাণ্ড দেখে রেগে ওঠে ভীষণ।
সুখী হেসে বলে, "গান গাইছি বলে কি হাত থেমে আছে নাকি নিধুবাবু?" বলে গুনগুন করে সুর তোলে আবার।
সুখীর সুর বর্ষার ছন্দে গা মেলায়।
নিধু রেগে বলে, "আবার! বলেছি গান হবে না, তো হবে না। ব্যস।"
সুখী বলে,
"দেখি নিধু সর্দার কী করতে পারো তুমি! এই
আমি গান..." বলে গান ধরে।
সুখী হেসে বলে, "গান গাইছি বলে কি হাত থেমে আছে নাকি নিধুবাবু?" বলে গুনগুন করে সুর তোলে আবার।
নিধু রেগে বলে, "আবার! বলেছি গান হবে না, তো হবে না। ব্যস।"
এই বছর আষাঢ় মাসের শেষের দিকের ঘটনা।
মহিমবাবুর তালতলার মাঠে ধান রোয়ার কাজ চলছে। ধুম কালো মেঘ নেমে এসেছে জমির উপর। শনশনে হাওয়া, সঙ্গে তেমনি বৃষ্টি। মহিমবাবু ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল জমির আলে। জনা আঠারো লোক বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করছে জমিতে। হঠাৎ করেই দামাল হাওয়ায় মহিমবাবুর ছাতা গেলো উল্টে! ভারী ভারী জলের ফোঁটা, বৃষ্টি যেন গায়ে বিঁধছে। বাবু বলে, "শীত শীত লাগছে রে নিধু আমি চললাম। কাজ শেষ করে বাড়ি যাবি। ভাল করে দেখে নিবি সব।" মহিমবাবু বাড়ি চলে যায়।
এমন দিনে জনমুনিষও বাহানা খোঁজে। নিধু সর্দার থাকতে কাজে ফাঁকি চলে না হে। কাজ ছাড়া
দ্বিতীয় কিছু বোঝে না নিধু। বাবু পয়সা দিচ্ছে, কাজের হিসেব
বুঝিয়ে দেবে নিধু। মাথার গামছা কোমরে বেঁধে জমির আলে দাঁড়িয়ে বলে, "তাড়াতাড়ি হাত চালাও হে, এখনো বিঘে ছয়েক জমির কাজ বাকি। বর্ষা তোমার আমার কথায় বছর-সাল রয়ে যাবে না। হুঁ, গান হচ্ছে। যত্তসব।"
হঠাৎ করেই সুখী বলে ওঠে "এমন দিনে কি আর কাজ হয় নিধু। কালো মেঘ। মন ভাসানো হাওয়া, আকাশ
ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে, তাকিয়ে দেখো পৃথিবীর রূপ। আনন্দ বোঝো?
দেখো চারদিকে শুধুই আনন্দ, মনে গান আসছে আর
তুমি বলছ কাজ করতে, কী করে হয়?" সুখীর
কথা শুনে হেসে ওঠে সবাই।
চরণ মাঝি বলে,
"কাজের সময় ওসব থাক সুখী।"
নিধু চিৎকার করে ওঠে,
"খবরদার বলছি সুখী, কাজে মন দে। ওই সব
বাজে বকিস নে। চরণ-দা, ধান কাটার সময়
ওকে আর আনবে না, বলেদিলাম।"
"আসব কী আসব না সে আমার খুশি। তোমার কথায় নাকি!"
বলে সুখী। তারপর কাদাজমিতে ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে তালি দিয়ে গলা ছেড়ে গান ধরে
সুখী।
"মেঘের গায়ে শ্যামের বরণ
দেখো রাধারাণীর নাচের ধরন
কানুর প্রেমে পাগল হয়ে..."
পাশের জমিতে দাঁড়িয়ে ছিল গ্রামের হরি সামন্ত। সুখীর গান শুনে বলে, "আহা মেয়ের গলা তো খাসা। চমৎকার গান। মেয়েটি কে নিধু? আগে তো দেখিনি!"
চরণ মাঝি বলে,
"আমার ভাগনি হরিবাবু, এই বছর প্রথম নিয়ে এলাম সঙ্গে।"
"খুব ভাল গানের গলা। আহা!"
নিধু বলে, "বাবু আমাদের কাজের জন্যে পয়সা দেবে হরিকাকা গানের জন্যে নয়। গান গাইতে হলে পালাগানের দলে যাও। যত সব জুটেছে এখানে!"
সুখী বলে,
"যাবো যাবো একদিন কপিল দাসের পালাগানের দলে গাইতে যাবো।"
"তাই যা।" বলে নিধু।
"তুই বড্ড বেরসিক নিধু, শুকনো কাঠ এক্কেবারে।" বলে হরি সামন্ত। রাগে গজগজ করে নিধু।
কাজ সেরে মহিমবাবুর বাড়ির পথ ধরে সবাই। জমির মাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে নিধু। মাঠ ছাড়বার আগে দেখে নিচ্ছে কাজে ফাঁকফোকর রয়ে গেলো কিনা। সুখী এগিয়ে এসে বলে, "একটা কথা বলি, কোনোদিন গান গেয়েছ নিধুবাবু? শুনেছ গান মন দিয়ে? জানো গান কখন আসে? সেই মন তোমার নাই নিধুবাবু।"
সুখীকে এক ঝলক দেখে নিয়ে জমিতে নজর ফেলে নিধু। সুখী বলে, "চাইলেই লোকে গান গাইতে পারে না গো। আনন্দ দুঃখ যন্ত্রণা মনকে নাড়া দিলে তবেই মনের কথা সুর
নিয়ে বাইরে আসে। নয়তো তোমার মতো পাথুরে কথা বলে সবাই।
পালাগানের আসরে গেলে বুঝতে এ কথার মানে।"
কথা শেষ করেই হাঁটা দেয় সুখী। নিধু চেয়ে থাকে সুখীর দিকে। রাগত স্বরে বলে, "ধিঙ্গি মেয়ে
একটা।"
চরণ মাঝি বলে,
"সুখীর কথায় রাগ করো না নিধু। ভাগনিটি
আমার ওইরকম আমাদের আদরে...।"
চরণ মাঝির ভাগনি সুখী। মহিমবাবুর বাড়ি এই বছর প্রথম কাজে এসেছে। সুখীর বাপ জোর করে বিয়ে
দিতে চায়। রাজি নয় সুখী। বিয়ে সে করবে না কোনো মতেই, তাই
বাপের চোখে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এসেছে মামার কাছে।
মহিমবাবুর তালতলার মাঠে ধান রোয়ার কাজ চলছে। ধুম কালো মেঘ নেমে এসেছে জমির উপর। শনশনে হাওয়া, সঙ্গে তেমনি বৃষ্টি। মহিমবাবু ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল জমির আলে। জনা আঠারো লোক বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করছে জমিতে। হঠাৎ করেই দামাল হাওয়ায় মহিমবাবুর ছাতা গেলো উল্টে! ভারী ভারী জলের ফোঁটা, বৃষ্টি যেন গায়ে বিঁধছে। বাবু বলে, "শীত শীত লাগছে রে নিধু আমি চললাম। কাজ শেষ করে বাড়ি যাবি। ভাল করে দেখে নিবি সব।" মহিমবাবু বাড়ি চলে যায়।
"মেঘের গায়ে শ্যামের বরণ
দেখো রাধারাণীর নাচের ধরন
কানুর প্রেমে পাগল হয়ে..."
পাশের জমিতে দাঁড়িয়ে ছিল গ্রামের হরি সামন্ত। সুখীর গান শুনে বলে, "আহা মেয়ের গলা তো খাসা। চমৎকার গান। মেয়েটি কে নিধু? আগে তো দেখিনি!"
নিধু বলে, "বাবু আমাদের কাজের জন্যে পয়সা দেবে হরিকাকা গানের জন্যে নয়। গান গাইতে হলে পালাগানের দলে যাও। যত সব জুটেছে এখানে!"
"তুই বড্ড বেরসিক নিধু, শুকনো কাঠ এক্কেবারে।" বলে হরি সামন্ত। রাগে গজগজ করে নিধু।
কাজ সেরে মহিমবাবুর বাড়ির পথ ধরে সবাই। জমির মাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে নিধু। মাঠ ছাড়বার আগে দেখে নিচ্ছে কাজে ফাঁকফোকর রয়ে গেলো কিনা। সুখী এগিয়ে এসে বলে, "একটা কথা বলি, কোনোদিন গান গেয়েছ নিধুবাবু? শুনেছ গান মন দিয়ে? জানো গান কখন আসে? সেই মন তোমার নাই নিধুবাবু।"
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment