প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Tuesday, September 24, 2024

যে ফিরে আসে | সাগরিকা রায়

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/১৮ই আশ্বিন, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

সাগরিকা রায়

যে ফিরে আসে

[২য় পর্ব]

"আলতামনির গোল মুখটা মনে আসছে। হাসিতে ভরে গেল নৃপেনের শুকনো মুখ। আলতামনির হাতের গরম ভাতের স্বাদ তখন জিভে আটকে আছে যে! ছেলেটা দোকান বড় করবে, বিয়ে হবে ছেলের। এত সুখের কথা জানাতে ইচ্ছে করে না? বলতে ইচ্ছে করে না সেই গুপ্ত কথাটা?"


পূর্বানুবৃত্তি আগের মতো দিন আর নেই, এখন একই জায়গায় অনেক দোকান। দোকানে রকমারি মাল না রাখতে পারলে খদ্দের অন্য দোকানে চলে যাবে। এইসব দুঃখের কথা বীজধান কিনতে গিয়ে হাটের সুবলের কাছে বলছিল নৃপেন। নৃপেন সুদে টাকা দিতে রাজি হয়। আজ মার্কেটে দেখা হল কার্তিকের সঙ্গে। তারা যাচ্ছে বীরভূমে। বাউলয়ের আখড়ায় কটাদিন কি কাটাতে চায় নৃপেন? তারপর…
 
সব মিটে যায়। গোয়ালটুলির ছায়ানিবিড় বাড়ির মাটির দাওয়ায় আর সুর বাজে না। ছেলে দোকানে যায়। কর্জের টাকা শোধ দিতে হয় বলে ধানি জমিটুকু বেচে দিতে হল। দোকান ফের “লড়বড়ে” বলে মনে করে নৃপেনের বৌ। শোক সামলে নিতে নিতে একদিন ছেলে বলে, “মা, শিলিগুড়ি চলে যাই দুজনে? এসব বিক্রি করে?”
“না-আ-আ!” আঁতকে ওঠে আলতামনি। তা কী করে হয়?”
হয়। কিন্তু হওয়া কঠিন। জানে অঙ্কুশ। কবে যেন দুটো মাস কেটে গেল। এমনই একদিনে লোকটা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে ছিল। আর ফিরে এল না। বাড়ির সামনের শিউলিগাছে ফুল পড়তে শুরু করেছে। বর্ষা শেষ হয়ে শরৎ এসে গিয়েছে। মা দুর্গা আসছেন। মন খালি খালি লাগে। আজকাল শেষ রাতে একটু ঠান্ডা লাগে বলে রাতের বেলায় কাঁথা বের করে ছেলেকে দিয়েছে আলতামনি। রাত ঘন। দরজায় টোকা পড়তে চমকে ভয়ে উঠে বসে ছেলেকে ডেকেছে আলতামনি, “দেখ বাবা। কে ডাকে এত রাতে?”
অঙ্কুশ ভয় পেলেও বন্ধ দরজা খুলে দেয়নি। প্রশ্ন করেছে, “কে?”
“তাড়াতাড়ি করে খোল বাপ। আমি তোর বাবা। চেঁচাইস না। আমি বেঁচে আছি। খোল বাবা।”
ভয়ে শীতল হয় অঙ্কুশ। বাবা এল প্রেত হয়ে? আত্মা শান্তি পাচ্ছে না?
“কেন এলে? চলে যাও। আমি ভাল করে শ্রাদ্ধ করেছি গুরুঠাকুর দিয়ে। তাহলে।”
“আরে খোল। বলতেছি।”
প্রেত এমন জোর দিয়ে কথা বলে কিনা জানে না অঙ্কুশ। দরজা অল্প ফাঁক করতেই ওকে ধাক্কা দিয়ে যে ঘরে ঢুকে পড়ল সে যেন এক নিংড়ে নেওয়া গামছা। শরীরে বল আছে। যেভাবে ধাক্কা দিয়ে ঢুকল! কিন্তু চেহারা হয়েছে যেন আমড়ার ছিবড়ে।
সে চারপাশে তাকিয়ে হুহু করে কেঁদে ফেলল, “বৌ, ফের আসতে পারব, ভাবিনি গো। এসেছি। তোমাদের দেখতেছি। ট্রেন এস্কিদেন হল। আমি চাপা পড়ে গেলাম দুটো মানুষের নীচে। চেঁচামেচি চলছে। তখন ঘুরঘুরে রাত্তির। মানুষ কেমন চেঁচাচ্ছে। কান্তেছে। আমি বেরিয়ে এসে খানিক দাঁড়িয়ে থেকে বুঝলাম বেঁচে আছি। আমার সামনে লোকের ব্যাগ, ট্যাকা ছিটকে আছে। ট্রেন থেকে নামার সময় বড় লোভ হল। এই ট্যাকা কার পেটে ঢুকবে কে জানে। আমার ছেলেটা কটা টাকার জন্য…! আমি টাকা, গয়না যা পেলাম সব গুছিয়ে নিয়ে আমার চাদরে বেঁধে নেমে পড়েছি গাড়ি থেকে। এখানে আসতে ভয় পেলাম। আমার লাশ মনে করে কারে এনে কাজ সেরেছে ছেলে। এখন আমি ফিরে এলে পুলিশ ধরে যদি “কেন বেঁচে আছ বলে?” রাস্তায় পুলিশ দেখলেই পালাই। আজ মনে হল, এবারে যাই চুপিচুপি। কিছু টাকা দে আসি ছেলেরে।” বলে গেঁজে থেকে অনেকগুলো নোট বের করে নৃপেন গোঁসাই, “আমি যে এসেছি, কারওরে বলবা না। ফের আসব। চম্পাসারির ভাতের হোটেলে কাজ করি। আজ দুটো ভাত খাব বৌ। ভোরে উঠে চলে যাব। চিন্তা কর না”।
বৌ কেঁদে কেঁদে ভাত বসায়। গরম ভাতে আলুসেদ্ধ মেখে খায় নৃপেন। অঙ্কুশ দরজা খুলে চারপাশ দেখে। কেউ দেখেনি তো বাপরে আসতে?
ভোর রাতে চলে গেল নৃপেন। দু চারদিন পরে এসে বাকি টাকা দিয়ে যাবে। দোকান বড় করবে ছেলে। পাকা ঘর।
ঠাকুরের আসনের পিছন থেকে একতারাটা বের করে দিল আলতামনি। রক্ত ধুয়ে রেখেছিল। কার রক্ত ছিল, কে জানে। হাসিমুখে একতারা নিয়ে বেরিয়ে গেল নৃপেন গোঁসাই। ফের আসবে।
কিন্তু আর ফিরে এল না সে। ছেলে, বৌ অপেক্ষা করে রাতের দরজার দিকে তাকিয়ে। যখন দশদিন পেরিয়ে গেল, অঙ্কুশ খুঁজতে বের হল। চম্পাসারির ভাতের হোটেল। কোন হোটেল? এখানে কত ভাতের হোটেল! কোন হোটেলে ছিল নৃপেন সরাসরি জিজ্ঞেস করা যাচ্ছে না। সে বেঁচে আছে জানলে নাকি পুলিশ ধরে নেবে । তাহলে? একটা সময় হতাশ হয়ে পরল অঙ্কুশ। লোকটা কি সত্যিই ওর বাপ নৃপেন গোঁসাই ছিল? নাকি তার প্রেত? এসেছিল ছেলেকে সাহায্য করতে? নইলে আর কেন এল না? কোন অন্ধকার দুনিয়া থেকে এসেছিল সে?
আলতামনি কাঁদে, “এইজন্য বলেছিল, কাউরে বল না আমার আসার কথা। মরেও ভোলে নাই আমাদের!”
ভোলেনি বলেই পরিবারের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুখের কথা হোটেলের মালিককে জানিয়েছিল। ওর জীবনের ছোট্ট গুপ্ত কথাটা জানিয়ে দিল এক পূর্ণিমার রাতে গান গাইতে গিয়ে, “আমার বৌ আমার কথা শোনে না।” আলতামনির গোল মুখটা মনে আসছে। হাসিতে ভরে গেল নৃপেনের শুকনো মুখ। আলতামনির হাতের গরম ভাতের স্বাদ তখন জিভে আটকে আছে যে! ছেলেটা দোকান বড় করবে, বিয়ে হবে ছেলের। এত সুখের কথা জানাতে ইচ্ছে করে না? বলতে ইচ্ছে করে না সেই গুপ্ত কথাটা?
কিন্তু নৃপেন জানে “বর্ষা হলে কই মাছে যায় ডাঙা দিয়া।” তবু বুঝল না সবাইকে বিশ্বাস করা ভুল। কইমাছে যে কাঁটা আছে। দরদী কী মাছ ধরিল বড়শি দিয়া। লুকনো গেঁজের খবর হোটেল মালিক জেনে গেলে আইনের চোখে যে মৃত, সে বেআইনি ভাবে মরলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়? কিছু না। কেবল চম্পাসারির একটা পাইস হোটেল আকারে বড় হয়। মালিকের আলাদা বসার জায়গা হয়। ভাতের হোটেলে বিরিয়ানি হয়। ওদিকে আলতামনি শিবের থানে, “মায়ের ইচ্ছে” কালীবাড়িতে পুজো দেয়। প্রেতের নজর থেকে বাঁচতে হবে। বাড়িতে একদিন নারানপুজো কর বাবা।
নৃপেনের ছেলে দরজার ওপরে ঘোড়ার লোহার নাল আটকে দিল। প্রেত নাকি লোহা ডিঙোতে পারে না।
শোক পালন হয়ে গিয়েছে যেদিন বডি আনা হয়েছিল। নতুন করে কি একই মানুষের মৃত্যুর জন্য শোক হয়?
 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)