বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১৭তম সংখ্যা/২৫শে আশ্বিন,
১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
আবদুস সাত্তার বিশ্বাস
চাঁদ
[৩য় পর্ব]
"আমি এতদিন তোমার মতন একটা ছেলের জন্যই থেমে ছিলাম। খোদাতায়ালা তোমাকে আমাদের মিলিয়ে দিয়েছেন। তোমার সততার পুরস্কার হিসেবে আমার আফরোজাকে তোমার হাতে তুলে দিতে চাই। তুমি আমার এ পুরস্কার গ্রহণ করবে না? আইনুদ্দিন সেদিন হাতে একটা চাঁদ পেয়ে গিয়েছিল। আফরোজা ছিল সেই চাঁদ।"
পূর্বানুবৃত্তি আইনুদ্দিন মিজানুল লাট্যার দুঃখের
কথা শুনে ইউসুফ মোড়লের বাড়ি তোকে আর কাজ করতে হবে না। আমি তোকে কাজ
দিব। পাঁচ বছর পর আইনুদ্দিন বলল লাটের
ব্যবসায় তোর আর শেখার কিছু নেই। তুই এবার নিজে ব্যবসা শুরু কর! সারাজীবন আমার কাছে
থাকলে তোর চলবে না। তোকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তারপর…
ছয়
মিজানুল লাট্যা আইনুদ্দিনকে নিয়ে একদিন আলম সেখের কাছে গিয়েছিল।
থানার সামনাসামনি হলুদ রঙের তিনতলা বাড়িটা আলম সেখের। নীচে গদি ঘরে আলম সেখ
বসেছিল। ক্যালকুলেটর টিপে হিসাবনিকাশ করছিল। মিজানুল লাট্যা আইনুদ্দিনকে নিয়ে আলম
সেখের খুব সামনে বসেছিল— আলম ভাই, এই ছেলেটাকে আপনার কাছে
নিয়ে এলাম। ছেলেটা কিছুদিন হল ব্যবসায় লেগেছে। ছেলেটাকে আপনি দেখবেন! ধার বাকি যদি
চায় দিবেন। কোনো অসুবিধা করবেন না। ছেলেটা ছেলে হিসেবে খুব ভাল এবং সৎ। আপনার
একটাও টাকা মেরে খাবে না। আমার কাছে পাঁচ বছর ছিল। আমি ভালভাবে চিনি বলে বলছি।
- বাড়ি কোথায়? আলম সেখ জিজ্ঞেস করেছিলেন।
- আমাদের গড়াবাসা গ্রামে।
আলম সেখ এবার আইনুদ্দিনকে নিজে জিজ্ঞেস করেছিলেন— তোমার নাম কী?
- আইনুদ্দিন সেখ। আইনুদ্দিন তার পুরো নাম বলেছিল। কেউ নাম জিজ্ঞেস
করলে পুরো নামই বলতে হয় এটা তার জানা ছিল।
- বাপের নাম?
- নিসার আলি সেখ।
- ব্যবসায় কতদিন লেগেছ?
- মাস খানেক হল।
- আগে কার ঘরে ব্যবসা করতে?
- মানিকবাবু ও বিহারিবাবুর ঘরে। মানিকবাবুর ঘরে লাট তুলতাম। আর
বিহারিবাবুর ঘরে সুতো দিতাম।
- খ্যাতাল ক'টা আছে?
- একটা।
- একটা খ্যাতালে পুষাবে? ওতে ক-পয়সা হবে?
তোমাকে খ্যাতাল আরও বাড়াতে হবে। কমপক্ষে দশটা। না হলে লাটের ব্যবসায়
টিকে থাকতে পারবে না। কী বললাম, বুঝতে পেরেছ?
- পেরেছি। কিন্তু খ্যাতাল বাড়াতে গেলে তো অনেক টাকার দরকার। আমার
কাছে যে অত টাকা নেই। খ্যাতাল তাহলে বাড়াব কী করে?
- কত টাকা নিয়ে তুমি ব্যবসায় লেগেছ?
- আমার নিজস্ব কোনো টাকা নেই। মিজানুল ভাই বিশ হাজার টাকা দিয়েছে;
ওটাই পুঁজি!
- ঠিক আছে; তুমি খ্যাতাল বাড়াও!
আলম সেখের কথায় আইনুদ্দিন খ্যাতাল বাড়াতে শুরু করেছিল। বাড়াতে
বাড়াতে বেশ কিছু খ্যাতাল সে বাড়িয়ে ফেলেছিল। তার মধ্যে বেশিরভাগই ছিল সাপ্তাহিক আর
পাক্ষিক খ্যাতাল। দু-তিনটে মাসিক খ্যাতাল ছিল। যেগুলো দূরে।
- আইনুদ্দিন সেখ। আইনুদ্দিন তার পুরো নাম বলেছিল। কেউ নাম জিজ্ঞেস
করলে পুরো নামই বলতে হয় এটা তার জানা ছিল।
- বাপের নাম?
- নিসার আলি সেখ।
- ব্যবসায় কতদিন লেগেছ?
- মাস খানেক হল।
- আগে কার ঘরে ব্যবসা করতে?
- মানিকবাবু ও বিহারিবাবুর ঘরে। মানিকবাবুর ঘরে লাট তুলতাম। আর
বিহারিবাবুর ঘরে সুতো দিতাম।
- খ্যাতাল ক'টা আছে?
- একটা।
- একটা খ্যাতালে পুষাবে? ওতে ক-পয়সা হবে?
তোমাকে খ্যাতাল আরও বাড়াতে হবে। কমপক্ষে দশটা। না হলে লাটের ব্যবসায়
টিকে থাকতে পারবে না। কী বললাম, বুঝতে পেরেছ?
- পেরেছি। কিন্তু খ্যাতাল বাড়াতে গেলে তো অনেক টাকার দরকার। আমার
কাছে যে অত টাকা নেই। খ্যাতাল তাহলে বাড়াব কী করে?
- কত টাকা নিয়ে তুমি ব্যবসায় লেগেছ?
- আমার নিজস্ব কোনো টাকা নেই। মিজানুল ভাই বিশ হাজার টাকা দিয়েছে;
ওটাই পুঁজি!
- ঠিক আছে; তুমি খ্যাতাল বাড়াও!
আলম সেখের কথায় আইনুদ্দিন খ্যাতাল বাড়াতে শুরু করেছিল। বাড়াতে
বাড়াতে বেশ কিছু খ্যাতাল সে বাড়িয়ে ফেলেছিল। তার মধ্যে বেশিরভাগই ছিল সাপ্তাহিক আর
পাক্ষিক খ্যাতাল। দু-তিনটে মাসিক খ্যাতাল ছিল। যেগুলো দূরে।
সাত
আইনুদ্দিন আলম সেখের কথায় যেহেতু খ্যাতাল
বাড়িয়েছিল আলম সেখ নিজে থেকে তাকে সুতো তোলার জন্য টাকা দিতেন এবং ভুটি ভুটি লাট
দিতেন। আর আইনুদ্দিন খ্যাতাল থেকে সেই লাটের সুতো তুলে সেই সুতো দিয়ে আলম সেখের
টাকা শোধ করে দিত। খাতায় খুব একটা জের থাকত না।
এইভাবে বছর তিনেক চলা পর আলম সেখ একদিন তাকে মনমরা দেখে জিজ্ঞেস
করেছিলেন— কী ব্যাপার আইনুদ্দিন, তোমাকে আজ মন মরা লাগছে কেন?
কী হয়েছে তোমার, আমাকে বলো।
আইনুদ্দিন বলেছিল— তেমন কিছু হয়নি। মিজানুল ভাইয়ের টাকাটা অনেকদিন
হয়ে গেল। শোধ দিতে পারিনি বলে মনটা একটু খারাপ।
- টাকার জন্য মিজানুল কিছু বলেছে?
- না, কিছু বলেনি। তা-ও নিজেকে খুব খারাপ
লাগে। পাওনা টাকা না!
- কত টাকা যেন!
- বিশ হাজার টাকা।
- তুমি একটু বসো! আমি একবার ওপর থেকে আসছি। বলে ওপরে গিয়ে ওপর থেকে
তিনি একটা থলে হাতে নেমে এসেছিলেন— এখানে পুরো বিশ হাজার টাকা আছে। মিজানুলের
টাকাটা তুমি শোধ করে দিও!
আট
বাড়ি এসে আইনুদ্দিন থলেটা খুলে টাকাগুলো গুনে দেখেছিল। কিন্তু বিশ
হাজারের জায়গায় টাকাগুলো এক লাখ ছিল। তারমানে আশি হাজার টাকাই বেশি।
আইনুদ্দিন অমনি টাকাগুলো থলেতে ভরে নিয়ে আলম সেখের কাছে ছুটেছিল—
থলেতে আপনার কত টাকা ছিল?
- কেন, বিশ হাজার।
- কিন্তু বাড়ি গিয়ে আমি গুনে দেখলাম তো এক লাখ টাকা হল।
- তাহলে থলে ভুল হয়ে গেছে। বিশ হাজারের থলে ভেবে তোমাকে এক লাখের
থলে দিয়ে ফেলেছি।
- আমারও তাই মনে হয়েছে। যাইহোক, আশি হাজার
টাকা আপনি এখান থেকে বের করে নিন! এত টাকা আমার এখন লাগবে না।
আইনুদ্দিন থলেটা আলম সেখের দিকে এগিয়ে দিলে তিনি বলেছিলেন— বের করে
আর নিচ্ছি না, পুরোটাই তোমার কাছে রেখে দাও!
- রেখে দিব!
- হ্যাঁ, রেখে দাও।
- কিন্তু কেন?
আলম সেখ তখন বলেছিলেন— আমি তোমার লোভহীনতা আর সততা দেখে মুগ্ধ
হয়েছি। যে কারণে টাকাগুলো আমি আর নিচ্ছি না। তোমাকে দিয়ে দিলাম। এছাড়া আমার জীবনের
সেরা জিনিসটি দিয়ে তোমাকে আমি পুরস্কৃত করতে চাই। তুমি হয়তো শুনে থাকবে, আমার কোনো পুত্র সন্তান নেই। একটা মাত্র কন্যা সন্তান। আমার যা কিছু আছে
বা ভবিষ্যতে আরও যা কিছু হবে সব ওর। ও আমার হৃদয়। এ বছর ও মাধ্যমিক পাশ করে
উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে। নাম আফরোজা। ইতিমধ্যে ওর অনেক জায়গা থেকে বিয়ে এসেছে।
আমি দিইনি। সৎ কোনো ছেলে পেলে তবেই বিয়ে দিব বলে থেমে আছি। সে ছেলে গরিব হলেও কোনো
অসুবিধা নেই। আমি তাকে বড়লোক করে নেব। এছাড়া বেশি শিক্ষিত না হলেও চলবে। আমি ঠিক
চালিয়ে নেব। তুমি হচ্ছ আমার পছন্দের সেই ছেলে। আমি এতদিন তোমার মতন একটা ছেলের
জন্যই থেমে ছিলাম। খোদাতায়ালা তোমাকে আমাদের মিলিয়ে দিয়েছেন। তোমার সততার পুরস্কার
হিসেবে আমার আফরোজাকে তোমার হাতে তুলে দিতে চাই। তুমি আমার এ পুরস্কার গ্রহণ করবে
না?
আইনুদ্দিন সেদিন হাতে একটা চাঁদ পেয়ে গিয়েছিল। আফরোজা ছিল সেই চাঁদ।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment