বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/১৮ই আশ্বিন,
১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
আবদুস সাত্তার বিশ্বাস
চাঁদ
[২য় পর্ব]
"বালিরঘাট একটা মোড় জায়গা এবং জায়গাটা বেশ জংশন। পাঁচ জায়গার লোক এসে এখানে জড়ো হয়। তাছাড়া এখানে বহরমপুর থেকে জলঙ্গি লাইনের সব বাস দাঁড়ায়।"
পূর্বানুবৃত্তি গাঁয়ের অভাবগ্রস্ত কোন কোন গরিব মেয়েরাই কেবল লাট কেটে রেশম সুতো বের করে। আইনুদ্দিনকে বাপ নিসার আলি সেখ অভাবে ইউসুফ মোড়লের বাড়ি প্যাট ভাতা খাটতে পাঠিয়ে
দিয়েছিল। চারবছর ছিল সে। একদিন তার কাজ মনোমতো না হওয়ায় তাকে
বের করে দিলেন। তারপর…
তিন
মিজানুল লাট্যা ওই সময় ইউসুফ মোড়লের বাড়ির পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে
যাচ্ছিল। সাইকেলের পিছনে লাটের ভুটি বাঁধা ছিল। যেতে যেতে বাড়ির বাইরে আইনুদ্দিনকে
দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করেছিল— কী হল রে আইনু, কাঁদছিস
কেন? কেউ মারল?আইনুদ্দিন বলেছিল— হ্যাঁ।
মিজানুল লাট্যা জিজ্ঞেস করেছিল— কে মারল?
- মালিক।
- কী জন্য মারল?
আইনুদ্দিন পুরো ঘটনাটা মিজানুল লাট্যাকে শুনিয়েছিল।
মিজানুল লাট্যা ঘটনার আপাদমস্তক সব শুনে বলেছিল— কাঁদিস না, চুপ; ইউসুফ মোড়লের বাড়ি তোকে আর কাজ করতে হবে না। আমি তোকে কাজ দিব। ইউসুফ মোড়ল তোকে খালি প্যাট ভাতা খাটাত। কিন্তু আমি তোকে প্যাট ভাতা খাটাব না। তোর কাজের ন্যায্য মজুরি দিব এবং আমি তোকে লাটের ব্যবসা শিখিয়ে দিব। তুই খালি আমার সাথে থেকে লাট ওজন করে দিবি। কী, পারবি না?
- পারব।
- তাহলে আর চিন্তা কী! আয় সাইকেলে চাপ! মিজানুল লাট্যা তাকে সাইকেলে চেপে নিয়ে বেনিদাসপুরে লাট দিতে চলে গিয়েছিল। হ্যারিকেন বিবি নামে একটা বয়স্কা মেয়ের বৈঠকে বসেছিল। বসার পর এক এক করে সব কাটুনি আসতে শুরু করলে মিজানুল লাট্যা আইনুদ্দিনকে লাট ওজন করে দিতে বলেছিল। আইনুদ্দিন লাট ওজন করে দিয়েছিল। লাট ওজন করা হয়ে গেলে মিজানুল লাট্যা তাকে বলেছিল— আমি ভেবেছিলাম, তুই ভাল লাট ওজন করতে পারবি না। প্রথম অসুবিধা হবে। কিন্তু খুব সুন্দর পেরেছিস। তাড়াতাড়ি তুই লাটের ব্যবসা শিখে নিতে পারবি এবং আমার বিশ্বাস, লাটের ব্যবসায় তুই ভাল উন্নতি করতে পারবি।
মিজানুল লাট্যা সেদিন আইনুদ্দিনকে তিরিশ টাকা মজুরি দিয়েছিল। আর হোটেলে পেট ভরে মাংস-ভাত খাইয়ে দিয়েছিল। আইনুদ্দিন তার জীবনের প্রথম উপার্জনের টাকাটা বাপের জন্য মাংস-ভাত কিনে খরচ করেছিল। বাপ মাংস-ভাত খেয়ে তার জন্য দোয়া করেছিল— খুদা...
মিজানুল লাট্যা জিজ্ঞেস করেছিল— কে মারল?
- মালিক।
- কী জন্য মারল?
আইনুদ্দিন পুরো ঘটনাটা মিজানুল লাট্যাকে শুনিয়েছিল।
মিজানুল লাট্যা ঘটনার আপাদমস্তক সব শুনে বলেছিল— কাঁদিস না, চুপ; ইউসুফ মোড়লের বাড়ি তোকে আর কাজ করতে হবে না। আমি তোকে কাজ দিব। ইউসুফ মোড়ল তোকে খালি প্যাট ভাতা খাটাত। কিন্তু আমি তোকে প্যাট ভাতা খাটাব না। তোর কাজের ন্যায্য মজুরি দিব এবং আমি তোকে লাটের ব্যবসা শিখিয়ে দিব। তুই খালি আমার সাথে থেকে লাট ওজন করে দিবি। কী, পারবি না?
- পারব।
- তাহলে আর চিন্তা কী! আয় সাইকেলে চাপ! মিজানুল লাট্যা তাকে সাইকেলে চেপে নিয়ে বেনিদাসপুরে লাট দিতে চলে গিয়েছিল। হ্যারিকেন বিবি নামে একটা বয়স্কা মেয়ের বৈঠকে বসেছিল। বসার পর এক এক করে সব কাটুনি আসতে শুরু করলে মিজানুল লাট্যা আইনুদ্দিনকে লাট ওজন করে দিতে বলেছিল। আইনুদ্দিন লাট ওজন করে দিয়েছিল। লাট ওজন করা হয়ে গেলে মিজানুল লাট্যা তাকে বলেছিল— আমি ভেবেছিলাম, তুই ভাল লাট ওজন করতে পারবি না। প্রথম অসুবিধা হবে। কিন্তু খুব সুন্দর পেরেছিস। তাড়াতাড়ি তুই লাটের ব্যবসা শিখে নিতে পারবি এবং আমার বিশ্বাস, লাটের ব্যবসায় তুই ভাল উন্নতি করতে পারবি।
মিজানুল লাট্যা সেদিন আইনুদ্দিনকে তিরিশ টাকা মজুরি দিয়েছিল। আর হোটেলে পেট ভরে মাংস-ভাত খাইয়ে দিয়েছিল। আইনুদ্দিন তার জীবনের প্রথম উপার্জনের টাকাটা বাপের জন্য মাংস-ভাত কিনে খরচ করেছিল। বাপ মাংস-ভাত খেয়ে তার জন্য দোয়া করেছিল— খুদা...
চার
আইনুদ্দিন মিজানুল লাট্যার কাছে পাঁচ বছর ছিল। পাঁচ বছরে সে অনেক
কিছু শিখেছিল। লাট ওজন করা থেকে শুরু করে লাট ও সুতো চেনা। কোন লাট ভাল, কোন লাট মন্দ। কোন সুতো রদ্দি, কোন সুতো এক নম্বর
হাতে নিয়েই বলে দিতে পারত। খাতা-কলম ও ক্যালকুলেটরে লাট-সুতোর হিসাব কীভাবে করতে
হয় সেটাও শিখেছিল। ফলে মিজানুল লাট্যা তাকে একদিন বলেছিল— আইনু! লাটের ব্যবসায় তোর
আর শেখার কিছু নেই। যা শিখেছিস অনেক শিখেছিস। তুই এবার নিজে ব্যবসা শুরু কর!
সারাজীবন আমার কাছে থাকলে তোর চলবে না। তোকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।আইনুদ্দিন বলেছিল— ব্যবসা শুরু করব তো কী নিয়ে শুরু করব? টাকা কই?
- আমি তোকে কিছু টাকা আর বেনিদাসপুরের খ্যাতালডা ছেড়ে দিব; তুই ব্যবসা শুরু কর!
আইনুদ্দিন ব্যবসা শুরু করেছিল।
পাঁচ
কিছুদিন বাদে মিজানুল লাট্যার সঙ্গে আইনুদ্দিনের বালিরঘাটে দেখা
হয়েছিল। বেনিদাসপুরে খ্যাতাল করে বালিরঘাটে এসে আইনুদ্দিন একটা দোকানে চা খেয়ে
বসেছিল। বালিরঘাট একটা মোড় জায়গা এবং জায়গাটা বেশ জংশন। পাঁচ জায়গার লোক এসে এখানে
জড়ো হয়। তাছাড়া এখানে বহরমপুর থেকে জলঙ্গি লাইনের সব বাস দাঁড়ায়। ওই সময় মিজানুল
লাট্যাও দোকানে চা খেতে ঢুকেছিল। ঢুকেই আইনুদ্দিনকে দোকানের এক কোণে দেখে জিজ্ঞেস
করেছিল— কে, আইনু!- হ্যাঁ ভাই, বসেন!
মিজানুল লাট্যা পাশে বসলে পরে আইনুদ্দিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল— কী খাবেন?
মিজানুল লাট্যা কী খাবে না বলে ঘুরে আইনুদ্দিনকেই জিজ্ঞেস করেছিল— তুই কী খাবি?
- আমি খেলাম।
- কী খেলি?
- একটা টোস্ট বিস্কুট, একটা চা।
- আর কিছু খাবি না?
- না।
- খা খা! বলে মিজানুল লাট্যা দু'জনের জন্য দুটো ডিম আর দুটো চা অর্ডার করেছিল। করে আইনুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করেছিল— খ্যাতাল করে এলি?
- হ্যাঁ। আপনি?
- আমিও খ্যাতাল করেই আসছি। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল— খ্যাতাল করতে তোর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?
- না, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।
- অসুবিধা হলে বলবি, লজ্জা করবি না। আমি সঙ্গে থেকে কিছুদিন দেখিয়ে দিব। আর হ্যাঁ, মন দিয়ে খ্যাতাল করবি! আমি তোর উন্নতি দেখতে চাই। আমার মতন তোরও ঘরবাড়ি হোক এবং কিছু জায়গাজমি হোক মন থেকে চাই। তাহলে তোরও ভাল লাগবে আমারও ভাল লাগবে। গ্রামের আর পাঁচটা মানুষ দেখে নাম করবে। যাইহোক, লাট কোথায় তুলিস? আর সুতো কোথায় বেচিস?
- লাট তুলি মানিকবাবুর কাছে। আর সুতো বেচি চকের ভেতরে।
- কী নাম?
- বিহারিবাবু।
মিজানুল লাট্যা তখন আইনুদ্দিনকে বলেছিল— তুই নতুন ব্যবসায় লেগেছিস, ওরা তোকে ভুগিয়ে খাবে। প্রথম দিকে ওদের সঙ্গে আমারও ব্যবসা ছিল। প্রথম দিকে আমাকেও ওরা খুব ভুগিয়ে খেয়েছে। বুঝতে পেরে ওদের বাদ দিয়ে আলম সেখকে ধরেছি। তুই আলম সেখের কাছে লাট তুলবি এবং সুতো দিবি। ইসলামপুরে আলম সেখের মতন বড় মহাজন আর কেউ নেই। সবাই আলম সেখের কয়েক ধাপ নীচে। শুধু মহাজন হিসেবেই বড় নয়, মানুষ হিসেবেও বড়। মনটা আকাশের মতো উদার। এক পয়সা তোকে ভুগিয়ে খাবে না। বরং পারলে তোর উপকার করবে। বছরে হাজার হাজার টাকা যাকাত দেয় এবং লোককে প্রচুর দানখয়রাত করে। দানের হাত এত বড়! অথচ দেখ, লোকটা একসময় তোর মতনই গরিব ছিল। পেট ভরে খেতে পায়নি, ভাল পোশাক পরতে পায়নি, ঘুমানোর জায়গা পায়নি, লেখাপড়াও খুব বেশি দূর না; ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়া। আল্লাহর অশেষ দয়ায় সে-ই আজ কোটিপতি! বিরাট মহাজন! কোন মানুষ কীভাবে উঠে যায়! কত মানুষকে যে সে ব্যবসায় দাঁড় করিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। যেমন, আমি। আলম সেখ না থাকলে আমি তো ব্যবসায় কোনো উন্নতিই করতে পারতাম না। আলম সেখের নেক নজরে পড়ে গেলে তোর আর কোনো চিন্তা নেই। ভুটি ভুটি লাট তোকে দিয়ে দেবে; পয়সার কথা বলবে না। সুতো তোলার জন্য চাইলে টাকাও দিবে। আমাকে দেয় বলে বলছি। আর পাঁচটা-দশটা মানুষের থেকে আলম সেখ সম্পূর্ণ আলাদা একটা মানুষ। না হলে একমাত্র মেয়ের কত কত বিয়ে আসছে; দিচ্ছে না। গরিব ঘরের একটা সৎ পাত্র দেখে বিয়ে দেবে। যদিও বর্তমানে মানুষের কাছে সততার কোনো মূল্য নেই। যেনতেন প্রকারে পয়সা রোজগার করতে পারলেই হল। কিন্তু আলম সেখের কাছে সততার মূল্য অনেক। তার মতে, একটা সৎ জিনিস কোটি টাকার চাইতেও বেশি দামি। আলম সেখ সত্যি একটা ব্যতিক্রমী মানুষ। সমাজে এরকম কল্যাণকামী মানুষ দেখা যায় না।
- আলম সেখের বাড়ি?
- ইসলামপুর থানার কাছে। আমি তোকে একদিন নিয়ে যাব। নিয়ে গিয়ে পরিচয় করে দিব।
এরমধ্যে ডিম সেদ্ধ আর চা হয়ে গেলে তারা তা খেয়ে উঠে পড়েছিল। বিল মিজানুল লাট্যা মিটিয়েছিল। আইনুদ্দিন দিবে বলে নিষেধ করলেও শুনেনি। বলেছিল— তুই যেদিন ব্যবসায় উন্নতি করতে পারবি সেদিনই তোর পয়সায় খাব; তার আগে খাব না।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment