বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য়
বর্ষ/১৭তম সংখ্যা/২৫শে আশ্বিন, ১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য
পাকা ধানের ঘ্রাণ
[৩য় পর্ব]
"নক্ষত্র খচিত আঁধার আকাশের নীচে নির্জনে বসে নিধু। হিমে ভেজা শীতল বুক ফেটে কান্না আসে। সুখীকে মনে পড়ে, খুব মনে পড়ে। নিধুর যন্ত্রণার সঙ্গী হয়ে নিঃসাড়ে পড়ে থাকে তালতলার মাঠ।"
পূর্বানুবৃত্তি অলস দুপুরে যখন ঘুঘু ডাকে,
বাবুর গোয়ালে বসে চাষের দিনের নানা কথা ভাবে। আর আনমনা হয় মন। কেন?
সে কথাও জানে নিধু, সুখীর কথা ভেবেই এমন হয়। প্রতি
বছর চাষের শুরুর দিন গিন্নিমা ধানের গোলার সামনে পুজো দেয়। মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ
নিয়ে তবে জমিতে হাল নামে। এই বছর পুজোর সময় আলপনা দিয়েছিল সুখী। সেই আলপনার টান
দেখে খুব খুশি হয়েছিল গিন্নিমা। তারপর…
হরি সামন্তের জমিতে ধান
কাটা চলছে। পাশের জমি থেকে নিধুকে দেখে হরি বলে, "কী নিধু একলা
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবিস?" সম্বিত
ফেরে নিধুর। কথায় কথায় ভেসে গিয়েছিল সুখীর ভাবনায়।
ধানের শিষ কাটার আগে জমির আলে মাথা
ঠেকিয়ে প্রণাম করে। বলে, "লক্ষ্মী মা গো, বছর বছর এমন ভাবেই এসো মা।" কথাটা
শিখিয়ে দিয়েছে গিন্নিমা। প্রত্যেক বছর ধানের শিষ কাটার আগে
নতুন গামছা জমির আলেতে বিছিয়ে নেয় নিধু তারপর প্রণাম করে মা লক্ষ্মীকে।
ধান গাছের গোড়ায় কাস্তের
পোঁচ মারে নিধু। গুনগুন করে গান গেয়ে ওঠে,
গানটা সুখীর গলায় শুনেছিল
নিধু। তারপর থেকে মনে থেকে গেছে।
জমির আলে পা রাখলেই ইদানীং গেয়ে ওঠে গানটা। একটা কথা ভেবে অবাক হয়ে যায়, সুখীর গাওয়া গানগুলো মনে থেকে গেছে কী করে! অথচ কত গানই তো কানে আসে, কই সেসব গানের একটা কলিও তো গাইতে পারে না। কেন? আবার কখন সুখী উঁকি মেরেছে মনের জানালায়।
"ধান কাটা হচ্ছে কবে?"
সামনের জমি থেকে গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে হরি সামন্ত।
"কাল নবান, পরশু থেকে শুরু হবে হরি কাকা।" বলে নিধু।
"জনমুনিষ আসছে তো?"
"আজ বিকেলে আসবে।"
এলাকায় সবাই বড় বড় চাষি। ধান কাটার সময় প্রচুর লোকের প্রয়োজন পড়ে। এলাকার বাগদি, আদিবাসী, বাউরিদের কাজে নেবার পরেও জনমুনিষ নিয়ে চাষিদের মধ্যে অশান্তি বাধে। সবাই চায় সময়ের মধ্যে ধান গোলায় তুলতে। কাজের লোক নিয়ে দড়ি টানাটানি পছন্দ নয় মহিম ঘোষের। তার মুনিষ আসে বাঁকুড়া থেকে। প্রতি বছর চরণ মাঝি জনা সতেরো লোক নিয়ে চাষের সময় হাজির হয়। বাবুর চাষ তুলে দিয়ে ফিরে যায়। আবার ধান কাটার সময় এসে মহিমবাবুর জমির কাজের সামাল দেয়। বাবুকে খবর পাঠিয়েছে চরণ মাঝি আজ সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে যাবে লোকজন নিয়ে।
নতুন ধান নিয়ে বাবুর
বাড়ি ফেরে নিধু। বিকেলবেলায় যাবে পালবাড়ি, প্রতিমা নিয়ে আসবে।
শীতের দুপুর। টুকুস সময়
পরেই দূরের ধানের ক্ষেতে ডুব দেবে সূর্য আর কুয়াশার জাল জড়িয়ে নিয়ে সন্ধ্যা
নেমে আসবে। পালবাড়ির দিকে হাঁটা দেয় নিধু।
পালবাড়ি থেকে প্রতিমা মাথায় নিয়ে যখন মহিমবাবুর বাড়ি আসে নিধু সন্ধ্যা গাঢ় হয়েছে। গিন্নিমা উলু দেয়। বাড়ির উঠানে সুন্দর আলপনা ফুটে উঠেছে, দেখে ভাল লাগে নিধুর। এই আলপনার জন্যই যেন অপেক্ষা করেছিল সকাল থেকে। চরণ মাঝি আর কয়েকজন মিলে আটনে বসিয়ে দেয় লক্ষ্মী প্রতিমা।
গিন্নিমা বলে, "তুমি খুব অন্যায় করলে চরণ। এতবার করে বলেছিলাম তবুও সুখীকে নিয়ে এলে না!"
গিন্নিমায়ের কথা শুনে দু
পা পিছিয়ে আসে নিধু। সুখী আসেনি! বিমর্ষতার আঁধারে ভরে ওঠে মন।
চরণ মাঝি বলে, "আসলে সুখীর বাপ...।"
সুখীর বিয়ে দেবে সুখীর
বাপ। পাত্রপক্ষ আসবে সুখীকে দেখতে, তাই নিয়ে গেছে মামার বাড়ি থেকে। এ
ব্যাপারে নিরুপায় চরণ। হাজার হলেও বিয়ে তো দিতে হবে মেয়ের।
"নিধু তোর জামাপ্যান্ট
কিনে এনেছি। কাল পরবি।" নতুন জামাকাপড়ের প্যাকেটটা
নিধুর হাতে দেয় মহিমবাবু। বাবুর হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে উঠানের একপাশে দাঁড়ায়
নিধু। সময় যেন হেঁয়ালি করছে নিধুর সঙ্গে।
সবার আড়ালে অন্ধকারে বাবুর বাড়ির বাইরে আসে নিধু। তালতলার জমির পাশ দিয়ে যে রাস্তা গেছে সেই পথে পা রাখে। এই কয়দিন এই পথে যাতায়াতের সময় পাকা ধানের গন্ধে বিভোর হয়েছে নিধুর মন। সকাল-সন্ধ্যা সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখেছে একলা দাঁড়িয়ে। বড় ভাল লেগেছে। আজ বড় বিষণ্ণ লাগে, পাকা ধান বুকে নিয়ে কুয়াশার চাদরের নীচে শুয়ে থাকা এই দিগন্ত বিস্তৃত তালতলার মাঠকে গন্ধহীন চরাচর মনে হয়। বুকের ভিতরে কে যেন গান গেয়ে ওঠে,
জমির আলে পা রাখলেই ইদানীং গেয়ে ওঠে গানটা। একটা কথা ভেবে অবাক হয়ে যায়, সুখীর গাওয়া গানগুলো মনে থেকে গেছে কী করে! অথচ কত গানই তো কানে আসে, কই সেসব গানের একটা কলিও তো গাইতে পারে না। কেন? আবার কখন সুখী উঁকি মেরেছে মনের জানালায়।
"কাল নবান, পরশু থেকে শুরু হবে হরি কাকা।" বলে নিধু।
"জনমুনিষ আসছে তো?"
"আজ বিকেলে আসবে।"
এলাকায় সবাই বড় বড় চাষি। ধান কাটার সময় প্রচুর লোকের প্রয়োজন পড়ে। এলাকার বাগদি, আদিবাসী, বাউরিদের কাজে নেবার পরেও জনমুনিষ নিয়ে চাষিদের মধ্যে অশান্তি বাধে। সবাই চায় সময়ের মধ্যে ধান গোলায় তুলতে। কাজের লোক নিয়ে দড়ি টানাটানি পছন্দ নয় মহিম ঘোষের। তার মুনিষ আসে বাঁকুড়া থেকে। প্রতি বছর চরণ মাঝি জনা সতেরো লোক নিয়ে চাষের সময় হাজির হয়। বাবুর চাষ তুলে দিয়ে ফিরে যায়। আবার ধান কাটার সময় এসে মহিমবাবুর জমির কাজের সামাল দেয়। বাবুকে খবর পাঠিয়েছে চরণ মাঝি আজ সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে যাবে লোকজন নিয়ে।
পালবাড়ি থেকে প্রতিমা মাথায় নিয়ে যখন মহিমবাবুর বাড়ি আসে নিধু সন্ধ্যা গাঢ় হয়েছে। গিন্নিমা উলু দেয়। বাড়ির উঠানে সুন্দর আলপনা ফুটে উঠেছে, দেখে ভাল লাগে নিধুর। এই আলপনার জন্যই যেন অপেক্ষা করেছিল সকাল থেকে। চরণ মাঝি আর কয়েকজন মিলে আটনে বসিয়ে দেয় লক্ষ্মী প্রতিমা।
চরণ মাঝি বলে, "আসলে সুখীর বাপ...।"
সবার আড়ালে অন্ধকারে বাবুর বাড়ির বাইরে আসে নিধু। তালতলার জমির পাশ দিয়ে যে রাস্তা গেছে সেই পথে পা রাখে। এই কয়দিন এই পথে যাতায়াতের সময় পাকা ধানের গন্ধে বিভোর হয়েছে নিধুর মন। সকাল-সন্ধ্যা সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখেছে একলা দাঁড়িয়ে। বড় ভাল লেগেছে। আজ বড় বিষণ্ণ লাগে, পাকা ধান বুকে নিয়ে কুয়াশার চাদরের নীচে শুয়ে থাকা এই দিগন্ত বিস্তৃত তালতলার মাঠকে গন্ধহীন চরাচর মনে হয়। বুকের ভিতরে কে যেন গান গেয়ে ওঠে,
"মনের ব্যথা শোনাই কারে
আমার মনের মানুষ রয় সে দূরে।
হায়রে বিধি..."
আমার মনের মানুষ রয় সে দূরে।
হায়রে বিধি..."
বাবুর দেওয়া নতুন
জামাপ্যান্টের প্যাকেটটা শিশির ভেজা ঘাসের উপর নামিয়ে রেখে অন্ধকারে বসে নিধু।
গ্রামের ঘরে ঘরে লক্ষ্মী প্রতিমা আটনে বসেছে, উলু আর শঙ্খ ধ্বনিতে মুখরিত
বাতাস। মা লক্ষ্মীর আবাহনে ব্যস্ত গৃহিণীরা, এক আনন্দঘন মুহূর্ত। এদিকে নক্ষত্র খচিত আঁধার আকাশের নীচে নির্জনে বসে নিধু। হিমে ভেজা শীতল বুক ফেটে কান্না আসে। সুখীকে মনে
পড়ে, খুব মনে পড়ে। নিধুর যন্ত্রণার সঙ্গী হয়ে নিঃসাড়ে
পড়ে থাকে তালতলার মাঠ।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment