বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য়
বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/১৮ই আশ্বিন, ১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য
পাকা ধানের ঘ্রাণ
[২য় পর্ব]
"শ্রাবণের বৃষ্টি বুঝি এত মাস পরে নিধুর মনজমিকে সিক্ত করে তুলেছে। দিনের কোনো-না-কোনো সময়ে সুখীর কথা মনে পড়ে রোজ। একলা কাজ করবার সময় গান করে গুনগুন করে। নিধুর হলো কী! তখন মনে মনে হাসে নিধু। নিজেই ভাবে এত গান আসে কোত্থেকে! আর ফিশফিশ করে সুখী যেন বলে, "...গান কখন আসে জানো?"
পূর্বানুবৃত্তি আষাঢ়ে বর্ষার দিনে জমির আলের ওপর দাঁড়িয়ে
চাষের কাজে দেখভাল করতে করতে সুখীকে কোমর দুলিয়ে গান করতে দেখে রসকষহীন নিধু বাজখাঁই
গলায় চিৎকার করে বলে কাজের সময় এখানে গানটান চলবে না। সুখী সে কথায় পাত্তা না দিয়ে
বলে পারো তো গান থামাও। তারপর…
মুখে মুখে গান বাঁধতে পারে
সুখী। নিমেষে সুর করে তাক লাগিয়ে দেয় সকলকে। আবার বলে কপিল দাসের দলে পালাগান
গাইবে। সেই কথা শুনে এক প্রকার জোর করেই নিজের সঙ্গে মহিমবাবুর বাড়ি কাজে নিয়ে
এসেছে চরণ। এখন বুঝিয়ে শুনিয়ে ভাল ছেলের হাতে তুলে দিতে পারলে বাঁচে।
সব শুনে নিধু বলে, "বিয়ে দিয়ে দাও। ও
মেয়ে কোনো কম্মের নয়। কথায় কথায় গান! কাজ পণ্ড করে শুধু।"
"পাত্র খুঁজছি। বললেই কী আর তেমনটি পাওয়া যায় গো।" বলে চরণ মাঝি।
সেদিনের সেই কথা মনে করে এখন হেসে ওঠে নিধু। ভাবে, নিধু কি পাত্র হিসাবে তেমনটি নয়! কথাটা ভেবে হোহো করে হেসে ওঠে নিধু। আচ্ছা যদি তেমন হয়! চরণ মাঝি বলল, "সুখীকে তুমি...।"
"গোয়াল ঘর ঝাঁটা টেনে
পরিষ্কার করতে আর কতক্ষণ লাগবে নিধু? কাল পুজো। এখনো নতুন
ধানের শিষ নিয়ে এলি না! এরপর কখন কোন কাজটা করবি তুই!"
গিন্নিমায়ের কথায় চটকা ভাঙে নিধুর। এতক্ষণ কী সব ভাবছিল।
ধান কাটার দিন যত এগিয়ে
আসছে নিধুর মন যেন সরস হয়ে উঠছে। শ্রাবণের বৃষ্টি বুঝি এত মাস পরে নিধুর মনজমিকে
সিক্ত করে তুলেছে। দিনের কোনো-না-কোনো সময়ে সুখীর কথা মনে পড়ে রোজ।
একলা কাজ করবার সময় গান করে গুনগুন করে। নিধুর হলো কী! তখন
মনে মনে হাসে নিধু। নিজেই ভাবে এত গান আসে কোত্থেকে! আর ফিশফিশ করে সুখী যেন বলে, "...গান কখন আসে জানো?"
নিধু বোঝে ইদানীং তার মনে কাজ ছাড়াও
নানারকম ভাবনা আসে। অলস দুপুরে যখন ঘুঘু ডাকে, বাবুর গোয়ালে
বসে চাষের দিনের নানা কথা ভাবে। আর আনমনা হয় মন। কেন? সে
কথাও জানে নিধু, সুখীর কথা ভেবেই এমন হয়। তখন মনে হয় গান
জানলে বোধ হয় ভাল হত। এইবার ধান কাটার সময় সুখী এলে নিধু বলবে তাকেও যেন দুটো
গান শিখিয়ে দেয় সুখী। নিধুর সে কথা শুনে সুখী কী বলবে?
হয়তো হেসে বলবে "তোমায় দিয়ে হবে না গো নিধুবাবু। গান গাইতে
হলে মন লাগে, মন। সে সব তোমার নাই।" নিধুর মন আছে?
নিশ্চয়ই আছে, নয়তো
নির্জন দুপুরে বুকের মধ্যে শূন্যতা ঘুরপাক খায় কেন!
মহিমবাবু বলে, "ইদানীং মাঝে মধ্যেই কী আকাশপাতাল ভাবিস নিধু? কাজ ছেড়ে জমিতে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকিস!" বাবুর কথা শুনে চুপ থাকে
নিধু। ভিতরে ভিতরে লজ্জা পায়। বেশ লজ্জা পায়।
আজ নিধুর হাতে অনেক কাজ
রয়েছে। বিকেলবেলার মধ্যে চরণ মাঝি লোকজন নিয়ে হাজির হবে মহিমবাবুর বাড়ি। সুখীও
আসবে। থাকবে দিন পনেরো-কুড়ি। ধান কাটা শেষ হলে পরে ফিরে যাবে আবার।
চরণ মাঝির লোকেদের থাকা
খাওয়ার জায়গা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে না রাখলে গিন্নিমা রেগে যাবে। তাই সাতসকালে
মহিম ঘোষের বাড়িতে এসে কাজে লেগেছে নিধু আর সুখীর কথা বারবার পিছন টেনে ধরে।
কাল আবার লক্ষ্মী পুজো। নবান্ন লক্ষ্মী। গ্রামের লোকে বলে "নবান"। নতুন ধানের অন্ন মা লক্ষ্মীকে উৎসর্গ করে তবেই গেরস্থের মুখে ভাত ওঠে, নিয়ম এমন। সারা গ্রামের লোক এমনটাই মানে। প্রত্যেক বছর ধান কাটা শেষ হলে পরে নবান্ন উৎসব হয়। তবে এই বছর তা হয়নি। সামান্য কিছু নতুন ধান কেটে এনে নিয়মরক্ষা করবে চাষি। তারপর হবে ধান কাটা। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত লেগেছে নিধুর। গিন্নিমাকে জিজ্ঞাসা করে, "ধান কাটলাম না, গোলায় নতুন ধান এলো না, তার আগেই নবান? এটা কেমন হলো মা!"
"তিথিনক্ষত্র কি আমার
কথায় চলে নিধু? যে বার যেমন হয়। তুই হাতের কাজ শেষ করে
আমাকে ধানের শিষ এনে দে, লক্ষ্মীর ঘটে
দেবো। আর শোন বিকেলবেলায় পালবাড়ি থেকে প্রতিমা নিয়ে আসবি, তোর বাবু প্রতিমা পছন্দ করে রেখে এসেছে। আমি যাই খানিকটা খড়িমাটি ভিজিয়ে
রাখতে হবে। সুখী বিকেলে এসে আলপনা দেবে।" সুখী আলপনা দেবে!
প্রতি বছর চাষের শুরুর দিন গিন্নিমা ধানের গোলার সামনে পুজো দেয়। মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ নিয়ে তবে জমিতে হাল নামে। এই বছর পুজোর সময় আলপনা দিয়েছিল সুখী। সেই আলপনার টান দেখে খুব খুশি হয়েছিল গিন্নিমা। বলে, "নবানের সময় সুখীকে নিয়ে আসবে চরণ। নবান্ন লক্ষ্মীর সামনে সুখী আলপনা দেবে। খুব ভাল মেয়ে তোমার ভাগনি সব কাজে...।"
চরণ বলে, "হ্যাঁ মা অবশ্যই নিয়ে
আসব।"
"ও নিধু, আর কখন যাবি বাবা। শীতের বেলা। শুরু হতেই শেষ।" আবার তাড়া দেয়
গিন্নিমা।
হাত চালিয়ে কাজ শেষ করে নিধু। কাস্তে নিয়ে হাঁটা দেয় জমির দিকে। তালতলার মাঠে এসে দাঁড়ায়। পাকা ধানের গন্ধে ম-ম করছে বাতাস। এক বুক বাতাস টানে নিধু। যেদিকে তাকায় ধান আর ধান। কে যেন সোনার গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে প্রকৃতির বুকের উপর। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখে নিধু। সোনালিধান দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। আহা পৃথিবীর কী রূপ! আগে কখনও দেখেছে নিধু, এইভাবে দেখেছে! দিগন্তব্যাপী ধানের বাহার দেখতেই থাকে নিধু। যেন নতুন কোনো আনন্দ উপত্যকার সামনে দাঁড়িয়েছে যার মনোমুগ্ধকর রূপ আগে কোনোদিন দেখেনি নিধু।
শেষ দু বছর বর্ষা বিমুখ
ছিল। ধানের ফলন ভাল ছিল না একদম। শ্রাবণ মাসেও জমির মাটি ফেটে চৌচির! বোঝো। সেচের
জলে কি আর তেমন চাষ হয়?
কথায় বলে, "পাতালের জলে পুষ্ট ধান নাহি
ফলে।"
এই বছর বর্ষা নিজের ছন্দে
ছিল। আর মা লক্ষ্মীও সুদে আসলে সব পুষিয়ে দিয়েছে। চাষিরা খুব খুশি।
সেদিন মহিমবাবু গিয়েছিল জলার মাঠে। নিধু ছিল সঙ্গে। জমি উপচে ধান, বাবু বেজায় খুশি। বলে "নিধু এইবার নবানের সময় তোকে ভাল দেখে একটা
জামাপ্যান্ট কিনে দেবো।" নিধু ভাবে শুখা বছরে এই বাবুই কেমন বদলে যায়। মেজাজ
তিরিক্ষি থাকে। শুধু মহিমবাবু কেন গেলোবার হরি সামন্ত হাটের মাঝে দাঁড়িয়ে চিৎকার
করে বলে, "দূর দূর চাষ করে
বোকায়। জমিজায়গা বেচে দিয়ে ব্যাংকে টাকা রেখে দেবো। সারাবছর রোদে জলে পুড়ে চাষ
করে হাত টাকা নেই, শুধু ঝাঁটা আর কুলো।" আর এই বছর তারই
মুখে অন্য কথা। বলে, "নিধু ফলন দেখে মন ভরে যাচ্ছে রে।
বাড়িতে বসেই পাকা ধানের বাস পাচ্ছি।" এই হলো চাষির
কথা। নতুন ধানের গন্ধ পেলেই চাষি খুশি। নিধুর বাপ বলতো
"নতুন ধানের বাসে, চাষির মন
ভাসে।" কথাটা ঠারেঠোরে সত্যি। ছেলেবেলা থেকে তাই শুনে
আসছে। এইবার চাষের সময় সুখী বলছিল "ভেবে দেখেছ কোনোদিন নতুন ধানের বাস চাষি কখন পায়? যে বছর ফলন ভাল হয়। কই শুখা বছরে তো
নতুন ধানের বাস পায় না চাষি। সেই বছর কি ধান কাঁকরের হয়?
তা তো নয়। তাহলে? আসলে মনের আনন্দ। বেজায়
ফলন দেখে চাষির মন উপচে খুশি আসে তখন সোনালি ধান দেখলেই ধানের
বাস পায়। আসল কথাটা হল অন্য। মনে খুশি তো জগৎ আলো, মনে
আঁধার তো দুনিয়া কালো, বুঝলে নিধুবাবু, এ কথা সবার জন্য সত্যি।" সুখীর কথাটা একলা বসে ভেবেছে নিধু। সুখী বলে,
"ও কথার মানে তুমি বুঝবে না নিধুবাবু। মনের কাছে জানতে চেয়েছ
কোনোদিন তোমার মন কী চায়? সময় কোথায়
তোমার! শুধু ধান আর কাস্তে। শুখা আর বর্ষা। রোয়া আর নিরান। মাঠ আর গোলা, এই তোমার জীবন। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলবে, জানতে
পারবে অনেক কিছু।"
নিধু বলেছিল, "যত বাজে বকিস। কাজের
কথা বল।"
সুখী বলে, "তোমার কাজ নিয়েই থাকো
নিধুবাবু, কে বলেছে বাজে কথা ভাবতে।" সেদিন সুখীর চোখে
চোখ রেখেছিল নিধু। পড়ন্ত বিকেলে অন্যরকম লেগেছিল সুখীকে।
সেদিনের সেই কথা মনে করে এখন হেসে ওঠে নিধু। ভাবে, নিধু কি পাত্র হিসাবে তেমনটি নয়! কথাটা ভেবে হোহো করে হেসে ওঠে নিধু। আচ্ছা যদি তেমন হয়! চরণ মাঝি বলল, "সুখীকে তুমি...।"
গিন্নিমায়ের কথায় চটকা ভাঙে নিধুর। এতক্ষণ কী সব ভাবছিল।
কাল আবার লক্ষ্মী পুজো। নবান্ন লক্ষ্মী। গ্রামের লোকে বলে "নবান"। নতুন ধানের অন্ন মা লক্ষ্মীকে উৎসর্গ করে তবেই গেরস্থের মুখে ভাত ওঠে, নিয়ম এমন। সারা গ্রামের লোক এমনটাই মানে। প্রত্যেক বছর ধান কাটা শেষ হলে পরে নবান্ন উৎসব হয়। তবে এই বছর তা হয়নি। সামান্য কিছু নতুন ধান কেটে এনে নিয়মরক্ষা করবে চাষি। তারপর হবে ধান কাটা। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত লেগেছে নিধুর। গিন্নিমাকে জিজ্ঞাসা করে, "ধান কাটলাম না, গোলায় নতুন ধান এলো না, তার আগেই নবান? এটা কেমন হলো মা!"
প্রতি বছর চাষের শুরুর দিন গিন্নিমা ধানের গোলার সামনে পুজো দেয়। মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ নিয়ে তবে জমিতে হাল নামে। এই বছর পুজোর সময় আলপনা দিয়েছিল সুখী। সেই আলপনার টান দেখে খুব খুশি হয়েছিল গিন্নিমা। বলে, "নবানের সময় সুখীকে নিয়ে আসবে চরণ। নবান্ন লক্ষ্মীর সামনে সুখী আলপনা দেবে। খুব ভাল মেয়ে তোমার ভাগনি সব কাজে...।"
হাত চালিয়ে কাজ শেষ করে নিধু। কাস্তে নিয়ে হাঁটা দেয় জমির দিকে। তালতলার মাঠে এসে দাঁড়ায়। পাকা ধানের গন্ধে ম-ম করছে বাতাস। এক বুক বাতাস টানে নিধু। যেদিকে তাকায় ধান আর ধান। কে যেন সোনার গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে প্রকৃতির বুকের উপর। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখে নিধু। সোনালিধান দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। আহা পৃথিবীর কী রূপ! আগে কখনও দেখেছে নিধু, এইভাবে দেখেছে! দিগন্তব্যাপী ধানের বাহার দেখতেই থাকে নিধু। যেন নতুন কোনো আনন্দ উপত্যকার সামনে দাঁড়িয়েছে যার মনোমুগ্ধকর রূপ আগে কোনোদিন দেখেনি নিধু।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment