প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Tuesday, September 24, 2024

মৃণাল ও একটি অনবহিত সিনে সংবাদ | শাশ্বত বোস

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১৭তম সংখ্যা/২৫শে আশ্বিন, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

শাশ্বত বোস

মৃণাল ও একটি অনবহিত সিনে সংবাদ

[৩য় পর্ব]

"হালায় লুঙ্গি তুইলা তর পোদ মারে নাই?" কথাটায় সম্বিৎ ফেরে নিধির শব্দের অনুপ্রাণনে উপর দিকে তাকিয়ে দেখেবাঁশের ভাড়ার মাথা থেকে একটা ছেলেখৈনি-গুটখা খাওয়া কালো দাঁত বের করে হাসছে আর তলায় ওর বয়সি আরেকটা ছেলেকে কী যেন ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে আশেপাশের জিজীবিষু জগৎটার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন এরা।"


অঙ্কন- শাশ্বত বোস

পূর্বানুবৃত্তি
 গুপ্তবাবুর নিন্দা শুনে নিধি খুব একটা অভ্যস্ত নয়, কিন্তু হারানের কথাগুলোর উপর কিছু বলতে পারে নাবাজারের ভেতর তিনশো বছর পুরোনো কোনো কার্নিশে ওঁৎ পেতে বসে থাকা কাকটা নেমে আসে চোখ বোজার কৌশলে সুযোগ বুঝে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায় মাছের কাঁটাটা, পোষা মেনিটার মুখের থেকে এখানে অন্য হোটেলের মতো বিরিয়ানি বা চিকেন চাপ, টমেটো সস দিয়ে সাঁতলানো চিকেন কষা হয় না। তারপর…

পৌষের কোন হিম ধরা রাতে কুয়াশার সর সরিয়ে, মৃত্যু এসে ওর মাকে নিয়ে চলে গেছিল, কোন পা-টা আগে ফেলেছিল, এখন আর মনে পড়ে না নিধির শুধু মনে আছে তখন ওর বারো বছর বয়স, বয়ঃসন্ধির সবে শুরু ওদের রানাঘাটের ক্যাম্পের টিনের দেওয়ালের গা ঘেঁষে উনুনের ধোঁয়ায় নির্দোষ বিষ শরীরে নিয়ে ওর মা রান্না করছে, পিছনে দুটো বিড়াল বসে লেজ নাড়ছে, পাশের ক্যাম্পে খালি গলায় গলা সাধছে খুকিদি, লাল শাকের রংটা কমলা দেখাচ্ছে কুয়াশা কেটে গিয়ে এখনও কয়েকটা দিন মায়ের হাতের স্পেশাল পোনা মাছের ঝোলটা রাঁধে নিধি কড়াইতে অল্প সর্ষের তেল দিয়ে মাছগুলোকে ভেজে নিয়ে, সেই তেলেই পিয়াজ-রসুন-টমেটো-আদাবাটা দিয়ে সমানে কষতে থাকে খুন্তি নাড়ার সাথে সাথে, ঝুল কালির মাথা থেকে চুন সুরকি খসে পড়ে। কয়লার ধোঁয়ায় চোখ জ্বলতে থাকে নিধির রানাঘাটের বাড়ির কাঁঠালিচাঁপা গাছটা ঢলঢলে চাঁদের পাটালি গায়ে মেখে, মৃত্যুমুখী অন্ধকারকে পিছনে ফেলে ফ্যাটফ্যাটে একটা ফণা তুলে এসে দাঁড়ায় নিধির সামনে
 
দুপুরের খাওয়া পর্ব মিটতে মিটতে বিকেল চারটে এর ফাঁকে গুপ্তবাবু ফিরে যান নিজের আর্মহার্স্ট স্ট্রিট-এর বাড়িতে হারান, ঠাকুর আর বাকি ছেলেপুলে এ-সময়টা একটু গড়িয়ে নেয় নিধি কিন্তু দুপুরে ঘুমায় না দুপুরবেলাটায় বাজারটার অন্য রূপ লোকজনের আনাগোনা কমে আসে অনেক মশলার দোকানগুলো থেকে ঠিক দুপুর দুটো বেজে সতেরো মিনিটে অচেনা একটা গন্ধ ভেসে এসে, নিধির নাক চোখ মুখ দিয়ে ভেতরে ঢুকে সজোরে টোকা মারে একটা চাবুক মারা বাজারি হইহল্লা বাজারের মাঝখানের পেচ্ছাপখানার গন্ধটাকে চাপা দিতে চায়, উল্টে তাতে গুড় বাজারের তাল পাটালির চাক ভেঙে আজ্ঞাবাহী ধরণের একটা অতি আলো বা অতি শব্দের মাঝে ফ্যাকাশে হয়ে যায় চড়াই পাখিটার ঘুম এই সমস্যা কাকেরও এই সমস্যা হোটেলের কড়ি-বরগায় বাসা বাঁধা পায়রারও গন্ধটা নিধিকে টেনে নিয়ে যায় বাজারের উত্তর দিকে সেখানে দোকান জুড়ে ডাঁই করে রাখা শুকনো লঙ্কা, খেজুর, কাজু কিসমিস, বাতাসার স্তুপ শব্দহীন, ক্লান্তিহীন ভাবে ঘুরে বেড়ানো কত মানুষ আছড়ে পরে, আবার উঠে দাঁড়ায় এই দিকে শুঁটকির একটা পচনশীল টক গন্ধ সারা গায়ে মেখে নাক খুঁটতে খুঁটতে হেঁটে চলে একটি শিক্ষিত ধোপ দুরস্ত উন্মাদ আকাশের নীল রংটা গড়িয়ে পড়ে তার পায়ের কাছে জিতে যাওয়া-হেরে যাওয়া জীবনটার হিসেব কষতে কষতে আপন মনে বলে চলে, "পচে যাবে, সব একদিন পচে ফুলে যাবে ব্যাকটেরিয়াগুলো এই দোকানটা থেকে ছড়িয়ে গিয়ে, পচা শরীরগুলো খুবলে খুবলে খাবে" উত্তরদিকের কোনো আবর্জনা স্তুপের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিধির চোখদুটো বুজে আসে এক অদৃশ্য প্রেতাত্মা এসে যেন ভ করে তার উপর নিধি ছাপাখানাটার পাশ দিয়ে গলির পথ ধরে, তারপর একসময় বড় রাস্তাটা পার করে এসে সার্পেনটাইন লেনবরাবর খুঁজতে থাকে তার ছোটবেলার ভাতঘুমটা সেটা বুঝি তখন ডুব দিয়েছে দুপাশের উঁচু উঁচু পুরোনো দিনের কলোনিয়াল বাড়িগুলোর মাঝের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা এক চিলতে আকাশের শূন্যতায়, নিশ্চিত ক্ষুধার সাথে প্যাঁচ কষতে গিয়ে ভোকাট্টা হয়ে পড়ে আছে পাশের হুজুরীমল লেনে’। সেটাকে অক্সি অ্যাসিটিলিনের শিখায় গলিয়ে গয়না বানিয়ে ফেলছে সাতপুরোনো কোনো স্যাকরার দল
 
জগৎ সিনেমায় বেশ কিছুদিন হলো শো বন্ধ যাচ্ছে হল মালিকের সাথে স্টাফেদের আকচাআকচি চলছে কিছু নিয়ে নিধি আজ দেখল হলের বাইরের দেওয়ালে বিশাল বড় একটা হোর্ডিং ঝোলাচ্ছে একদল লোক নিজেদের ভেতর খিস্তিখামারি করছে, রিকশাওয়ালা, বাসের কন্ডাকটর, বাজারের মেছুরে, বিহারি মুটেদের মুখের খিস্তি নিধি দেখেছে অতি পরিচিত এই বাজারটার শরীর জুড়ে জটিলতর সমীকরণের এই যে জাল বোনে কত শত দুপুর-বিকেলহীন মানব তরঙ্গ, তাদের মুখের নিতান্ত বর্জিত অপশব্দই বলে দিতে পারে তাদের আবাস, জনপদ কিংবা কতটা ইতর অনুষঙ্গে এই দৈনিক উৎসবমুখরতার মানচিত্রে তাদের আগমন এই চত্বরে কেউ হয়তো মশলা নিয়ে এসেছে, কেউ-বা ত্রিপল পট্টি থেকে মাল নিয়ে গিয়ে লোকালে ব্যবসা করবে, কেউ বা এসেছে একুয়ারিয়ামের মাছ বা পাথর নিতে, আবার দু পয়সা লাভের আশায় কেউ ক্যানিং লাইন থেকে ঝুড়ি করে ফল নিয়ে এসে বসেছে বাজারের বাইরেটায় চিহ্নহারা কর্মব্যস্ত শিয়ালদহ, বাস-ট্রাম, ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্টের সাউন্ডস্কেপের সাথে লোকগুলোর থেকে ভেসে আসা শব্দের টাকডুমাডুমের মাঝে পরে, এক জটিল বর্গক্ষেত্রের কোণ বরাবর বাহকহীন পালকিতে বসে দোল খেতে থাকে নিধি
"হালায় লুঙ্গি তুইলা তর পোদ মারে নাই?" কথাটায় সম্বিৎ ফেরে নিধির শব্দের অনুপ্রাণনে উপর দিকে তাকিয়ে দেখে, বাঁশের ভাড়ার মাথা থেকে একটা ছেলে, খৈনি-গুটখা খাওয়া কালো দাঁত বের করে হাসছে আর তলায় ওর বয়সি আরেকটা ছেলেকে কী যেন ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে আশেপাশের জিজীবিষু জগৎটার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন এরা বিশাল পোস্টারটার দিকে হিম হিম চোখে চেয়ে থাকে নিধি এটা কোনো সিনেমার পোস্টার নয় বাংলা যেটুকু পড়তে পারে তাই দিয়ে লেখাগুলো পড়ার চেষ্টা করে পোস্টারটার এক পাশে একটা কাঁচাপাকা চুলের লোককে দেখে চেনা চেনা ঠেকে ওর পোস্টারটার ডান পাশে কীসের যেন একটা লিস্ট, তাতে কিছু নাম এর মধ্যে কয়েকটা নাম আগে শুনেছে নিধি এগুলো সিনেমার নাম, ‘খারিজ’, ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘চালচিত্র’। ছেলেটার মুখে যেন খিস্তির ফোয়ারা এটাই যেন ওর কাছে এখন জলভাতের মতনশব্দগুলো বড্ড কানে বাজতে থাকে নিধির তলায় দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে এগিয়ে গিয়ে নিধি এবার জিজ্ঞেস করে, "ও ভাই শুনছ? এদিকে শুন"
নিধিকে দেখে ছেলেটা মুখের হাসি থামিয়ে এগিয়ে আসে, "বলেন!"
"এইডা কী ব্যাপার কইতে পারো?"
ছেলেটার চোখে মুখে একটা অকিঞ্চিৎকর বিরক্তি খেলে যায়, "দূর বাল, এইসব হইল বড়লোকগুলার ধ্যাশডামো, ওই দাদুর বুইঝলেন শত বৎসর পূর্ণ হইল. হালায় সেঞ্চুরি মারসে ফিলিম বানাইতো, তাকে লইয়া নাচনকোঁদন হইবো বুইড়া ফিলিম বানাইয়া কী ছিড়সে কেডা জানে! আমাগো কনো কামে আইসে বুড়া? কইতে পারেন?"
নিধির চোখে একটা ভুতুড়ে স্বপ্নের ঝিম ধরা ঘোর লেগে আসে ছবিটার দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করে নামটা পরে নিধি, ‘মৃণাল সেন’। নিধির চোখের সামনে কালো জানালাটার ওপার থেকে একটা মুখ ভেসে ওঠে, ধরহীন একটা মুখ হালকা ফুঁ দিলে উপর থেকে ধুলোবালি সরে গিয়ে মুখটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাঙামাইমার মুখ, পৃথিবীর সমস্ত মিথ্যাবাদীকে একপাশে রেখে কোনো এক অন্ধকার বিকেলে তিনি নিধিকে ডাক দিচ্ছেন, "নিধু, অ নিধু, টিভিতে সিনেমা দেখাইতেসে, দেখবা না? তর লগে মুড়ি ভাইজ্যা রাখসি, আইস চাঁদ আমার" মা মারা যাবার পর নিধি ছোট ভাই বোনদের নিয়ে কল্যাণী সীমান্তের মামাবাড়ি গিয়ে উঠেছিল মামা ওদের খুব একটা দেখতে পারতেন না অথচ নিঃসন্তান রাঙা মাইমা বুক দিয়ে আগলাতেন, খালি বলতেন নিধু মোর প্যাটের ছাওয়াল আছিল গত জনমে জনম জনম ফিরিয়া আইস চাঁদ এই অভাগীর কোলে"
 
ক্রমশ…
 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)