বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য়
বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/১৮ই আশ্বিন, ১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
মৃণাল ও একটি অনবহিত সিনে সংবাদ
[২য় পর্ব]
"ওর মায়ের কাছে শিখেছিল। সাথে হাওয়ায় কচ্ছপের গতিতে ধুলো কালি এসে, খরচ-না-হওয়া জীবনটার ধর আর মুণ্ডুর মাঝখান দিয়ে ফস করে উড়ে গেছিল। ওর মা হয়তো সেই রান্নাটাই শিখেছিল খুলনার কোনো এক বিরামহীন ফুরিয়ে যাওয়া নদীর গা ঘেঁষে।"
পূর্বানুবৃত্তি হারানিধির অভ্যাস হয়ে
গেছে খুব ভোরের জেদি একগুয়েঁ
ধোঁয়া আর ছেঁড়া ছেঁড়া বাক্স পুঁটুলি থেকে ভেসে আসা ভ্যাপসা গন্ধের মিশেল, গরম ভাতের
ফ্যান, ডাস্টবিনে ফুলে ওঠা মাছ কিংবা সারা রাত জেগে
বাজারটার এক কোণায় পড়ে থাকা মুটে মজুরের গায়ের তেতো ঘামের গন্ধ, সব কিছু মিলে মিশে
গিয়ে একটানা পচা একটা গন্ধ,
লরি থেকে মাছ খালাস করার সময় দেহাতী হিন্দি আর বাংলা মেশানো
খিস্তির বলিষ্ঠ বিস্ফোরণ, সস্তার ঠেলাঠেলি
আর মাছ বাজারে দর হাঁকাহাঁকির শব্দ। ঘুম থেকে উঠে পরে হারানিধি। জৈষ্ঠ্যের ঝকঝকে ভোর আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্যের তাপ
গনগনে হয়ে পোড়াবে তাবৎ ব্রহ্মাণ্ডকে। তারপর…
কথাটা শুনে
নিধি চুপ করে যায়, গুপ্তবাবুর
নিন্দা শুনে সে খুব একটা অভ্যস্ত নয়, কিন্তু হারানের কথাগুলোর উপর কিছু
বলতে পারে না।
বেশ কিছু বছর আগে এই বৈঠকখানা বাজারে আধপাগলের মতো ছেঁড়া
কাপড়ে ঘুরছিল ছেলেটা। নিধি তখন সবে হোটেলের দুপুরের খাবার পর্ব শেষ করে, সামনের সরু
রাস্তাটায় একটা ঝরঝরে টুল পেতে বসেছে।
এমন সময় ছেলেটা এসে খেতে চেয়েছিল। হেঁশেলে
উনুনের আঁচ নিভে গেছে ততক্ষণে। এঁটো বাসনগুলো পাহাড় হয়ে পরেছিল এক
কোণে। কদাকার
ডেচকির তলা হাতড়ে কিছু আধপোড়া ভাত পাওয়া গেছিল, সাথে সেই ছোলা দিয়ে কুমড়োর সবজি, ঠাকুরটা
হয়তো তুলে রেখেছিল রাতের জন্য। শীতের ধুলো আর রোদ মাখা মায়াবী আলোয়
ছেলেটার মেঘের মতো মুখে, সেটুকু তুলে
দিয়েছিল নিধি।
হাপুস হাপুস বুভুক্ষুতায় থালাটা শেষ করে রাস্তার এক কোনে ছেঁড়া চাদরটা গায়ে
জড়িয়ে শুয়ে পরেছিল ছেলেটা।
রাতের খাবারটা আলাদা করে সরিয়ে রেখে যখন ওর মুখের কাছে ধরতে গেল নিধি, ছেলেটা মাথা
ঝাঁকিয়ে বলেছিল,
"না মাগনা খাবুনি, আমায় কাজ দাও।" এর আগে দেশ থেকে ওর বয়সি একটা ছেলে ধরে নিয়ে
এসেছিল নিধি।
ব্যাটা মহা পেছন পাকা আর ওস্তাদ গোছের ছিল। কিছুদিন পর থেকেই কাজে ফাঁকি দিতে
শুরু করল। কিছু
করতে বললেই হাজার বায়নাক্কা। একদিন তো নিধির মুখের ওপর ছোটবড় কথা
বলে, পয়সাকড়ি
বুঝে নিয়ে কাজ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। নিধি পরে শুনেছিল ব্যাটা এই বাজারেই
একটা মশলার দোকানে কাজ নিয়েছে। আসা যাওয়ার পথে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখত
নিধিকে। এই
ছেলেটাকে দেখে বেশ মায়া হয়েছিল নিধির। গুপ্তদাকে বলে ওকে রেখে দিয়েছিল, সেই থেকে
হারান এই হোটেলেই আছে।
মুখহাত ধুয়ে, চান করে, গুরুর দেওয়া
কৃষ্ণ মন্ত্র জপ করে নিধি।
সারা হোটেল, লজে
গঙ্গার জল ছেটায়।
কর্পূর আর ধুনোর গন্ধে ভুরভুর করে লজের বাতাস। এই লজে
গুপ্তবাবু যাকে তাঁকে ঘর দেন না। পরশু দিনই একটা ছেলে-মেয়ে এসে ঘর চাইছিল, বলে কিনা ভাইবোন! বোনকে পাশের কলেজে অ্যাডমিশন করাতে নিয়ে এসেছে! নিধির দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। বন্ধ
ম্যানহোলের ঢাকনা সরালে যেরকম গুমোট অন্ধকার, সেরকম অন্ধকার পেরিয়ে নিধি হেঁটে
এসেছে অনেকটা দিনকাল।
এখানকার অন্যান্য লজে কী হয়, নিধি খুব ভালভাবেই জানে। আর বেঙ্গল
লজ বাজারের অনেকখানি ভেতরে হওয়াতে, এসব তো এখানে সুবিধে! গুপ্তদাকে ও
চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছিল ব্যাপারখানা। গুপ্তদাও তো কম দিন হোটেল চালাচ্ছেন
না এখানে! শেষমেশ গুপ্তদা ওদেরকে বলে দিলেন, "না বাপু, এখানে ঘর
খালি নেইকো, তোমরা
আশেপাশে দেখো।"
রেডিয়োতে এখন নীতিকথা বাজে। বাজারের মুখটা থেকে একটা চলতি হাওয়া, আঁশটে গন্ধ
গায়ে করে নিয়ে এসে নিধিকে মনে করায়, এবার মাছ কিনতে বেরুতে হবে। এই বেলা
গফুরের কাছে গেলে তাজা মাছ পাওয়া যাবে, কাতলা-রুই-পার্শে-পমফ্রেট, লাল কানকো, চকচকে গা। বেঙ্গল লজের
ভাতের হোটেলে কিন্তু অন্য পাইস হোটেলের মতো রোজ ২৪ রকমের মাছ
পাওয়া যায় না।
নিধি বাজারের ভেতর গিয়ে পকেটের রেস্ত বুঝে, ভাল মাছ বুঝে, যা নিয়ে আসে
রোজ তাই রান্না হয় হেঁশেলে।
বাজার চলতি মানুষজন,
কলেজ পড়ুয়া, বাজারের
মুটে, কাঠের
দোকানে আসা বোঁটকা লুঙ্গির ‘পালিশের লোক’, পুরু চামড়া, গোত্রহীন
চৈত্রমাস কিংবা সলজ্জ আষাঢ়,
সবাই জলহীন মেঘরোদহীন দুপুরে খিদের মুখে দুটো ভাত খেতে আসে, সাথে হয়তো মুরগির মাংসের লাল ঝোল, ইচ্ছেমতন
চেয়ে নেয় বুক, পাঁজরা
কিংবা লেগপিস কিংবা হয়তো কড়া করে ভাজা পোনা মাছ সর্ষে দিয়ে, কখনও বা
শুধুই মাছভাজা, ডাল, ঝুরঝুরে আলু
ভাজা সাথে চাটনি,
পাঁপড়। অবৈতনিক
অবিনশ্বর খিদে আর দু মুঠো ভাতের কোন জাত বা কর্ম-বর্ণ-গন্ধ বিচার নেই এই হোটেলে।
বাজারের
ভেতর তিনশো বছর পুরোনো কোনো কার্নিশে ওঁৎ পেতে বসে থাকা কাকটা নেমে আসে। চোখ বোজার
কৌশলে সুযোগ বুঝে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায় মাছের কাঁটাটা, পোষা
মেনিটার মুখের থেকে।
এখানে অন্য হোটেলের মতো বিরিয়ানি বা চিকেন
চাপ, টমেটো
সস দিয়ে সাঁতলানো চিকেন কষা হয় না। তবে নিয়ম করে পয়লা বৈশাখে রেওয়াজি খাসির মাংস হয়, নিধি নিজে
হাতে রাঁধে।
যে মাংসটা ও ওর মায়ের কাছে শিখেছিল। সাথে হাওয়ায় কচ্ছপের গতিতে ধুলো কালি
এসে, খরচ-না-হওয়া
জীবনটার ধর আর মুণ্ডুর মাঝখান দিয়ে ফস করে উড়ে গেছিল। ওর মা হয়তো
সেই রান্নাটাই শিখেছিল খুলনার কোনো এক বিরামহীন ফুরিয়ে যাওয়া নদীর গা ঘেঁষে। এই রান্না
শেখার গল্পটাই নিধি করে গেছে বারবার। হয়তো সেই সুদীর্ঘ ও একঘেঁয়ে বাক্যরাজির আড়ালে প্রতিবার একটা প্রায় অলৌকিক আন্তরিকতা মিশে
থাকে। কিন্তু
সেই একই সময়ে ওকে দেখলে মনে হয় যেন, মুহূর্তটায় ও সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত, নিঃসঙ্গ ও
নিঃস্ব। নির্গুণ, নির্ঘুম
একটা মুখ হয়ে আশেপাশের অপরিচিত বিবর্তনকে সাক্ষী করে, উনুন ধরিয়ে
কৃষ্ণ মন্ত্র জপ করতে করতে,
এক মুঠো চিনি ছড়িয়ে দেয় উনুনের ভেতর।
সকালের
টিফিনটায় উড়ে ঠাকুরের সাথে হারানও হাত লাগায়। কচুরি, লাল আলুর
তরকারি সাথে কড়া করে চা।
এই টিফিনটা মূলত কলেজের মর্নিং শিফটের ছেলেমেয়ে কিংবা সেইসব ভেণ্ডারদের জন্য,
যারা মাল বয়ে এনে বাজারে ঢুকেছে গত কাল রাতে। সকাল
এগারোটা নাগাদ ভাত চাপে।
হারান হোটেলের বাইরেটায় একটা ভিজে ফেঁসে যাওয়া গামছা পরে, থেবড়ে বসে
আলুর খোসা ছাড়ায়।
উড়িয়া ঠাকুর উনুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া বিশাল কড়া চাপায়। উনুনের
গনগনে আঁচে, কলকলে
ধোঁয়ায় ভরে যায় চারিদিক।
কিছুক্ষণ পর থেকে সেই বাতাসে পুইঁ শাক কষার সুবাস
এসে মেশে। গরম
তেলে পিয়াঁজ ফোড়ন সাথে গোটা ধনে, লঙ্কা ছাড়ার গন্ধ।
ক্রমশ…


No comments:
Post a Comment