প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Tuesday, September 24, 2024

শেষ থেকে শুরু [২য় পর্ব] | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/১৮ই আশ্বিন, ১৪৩১

ধারাবাহিক উপন্যাস

পারমিতা চ্যাটার্জি

শেষ থেকে শুরু

[২য় পর্ব]

"এখানে আসার আগে গিয়েছিল সে শান্তিনিকেতনে, বিশ্বভারতীতে খোঁজ করে জানতে পারে বউয়াদা পুরুলিয়ার কোনো কলেজের প্রফেসর হয়ে চলে এসেছে। সত্যি কথা বলতে সেও একই আশায় এখানে এসেছে যদি সে খুঁজে পায় তার পুরানো বউয়াদাকে, যে তাকে পাগলের মতন ভালবাসত"


পূর্বানুবৃত্তি সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও অবহেলা করতে নেই। গুণ এবং রূপের এক প্রচ্ছন্ন অহংকার মনকলির মনকে কখন যেন ঘিরে ধরেছিল। আজ মনকলি জীবনযুদ্ধে বিধ্বস্ত, আজ মনে হচ্ছে বউয়াদাকে তার বড় প্রয়োজন, কিন্তু কোথায় পাবে তাকে! বাবার এই একটা কথাই সে অমান্য করেছিল, সাময়িক রূপ আর চাকচিক্যে ভুলে গিয়ে প্রবীরের হাত ধরেছিল পরম নির্ভয়ে, প্রবীর ছিল বাইরে থেকে ডক্টরেট হয়ে আসা ছেলে, নটিংহ্যামে লেকচারার ছিল, সে সব ভুলে প্রবীরের হাত ধরল, এখানে প্রবীর কী করে বা ভবিষ্যতে ইউকেতে ফিরে যাবে কিনা সে বিষয়ে জানতেই চাইল না। তারপর…
 
বারবার অতীতের ভুলের কথা ভুলতে চেষ্টা করছে, না না প্রবীরের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সে বেঁচে গেছে শুধু নয় নিজের অহংকার দম্ভ সব কোথায় মিলিয়ে গেছে। এটুকু শিক্ষা তার হয়েছে বাইরের কোনো চাকচিক্য নয় মানুষকে বিচার করতে হয় তার অন্তরের সত্তা দিয়ে। বউয়াদার বাবারও কিন্তু অনেক পয়সা, বিরাটকায় লাল বাড়িটার ছবি এখনও তার চোখে ভাসে। আসা যাওয়ার পথের ধারেই বাড়িটা পড়ত, ওই বাড়িরই একটা চারচৌকো গ্রিল দেওয়া বারান্দায় সে দাঁড়িয়ে থাকত কবে থেকে। যখন সে স্কুল থেকে ফিরত তখন দেখত ওই বারান্দায় তার আসার পথের দিকে চেয়ে  বউয়াদা দাঁড়িয়ে আছে, আবার কলেজ থেকে ফেরার সময় ওই একই দৃশ্যপট। মাঝে মাঝে মনে হত পড়াশোনা করে কখন? কিন্তু তার সব পড়াশোনা আর ভালবাসা যে রবীন্দ্রনাথ আর শান্তিনিকেতনকে কেন্দ্র করেই ছিল তা সেদিন সে বুঝতে পারেনি।

একদিন রিহার্সালের সময় কথায় কথায় বলেছিল, আমার বাড়ির লোক ভাবে আমি পাগল, কী করে এই গান আর বাংলা নিয়ে আমি এত মাতামাতি করি, কিন্তু আমি কী করব বল! রবীন্দ্রনাথ যে আমার হৃদয়ের তন্ত্রে তন্ত্রে বয়ে চলেছে, তাঁর গানের অসাধারণ ফিলসফি আমাকে মুগ্ধ করে আর সেই টানেই মনে হয় চলে যাই কবির শিক্ষা নিকেতনে বিশ্বভারতীতে,
অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল, আচ্ছা তুমি বাংলা এত ভাল করে বুঝতে পারো কী করে?
ম্লান হেসে সে উত্তর দিয়েছিল, আমার মায়ের কাছ থেকে, মা যে বিশ্বভারতীর ছাত্রী ছিলেন, তাই নাকি! উনি কি বাঙালি?
- না, তবে কর্মসূত্রে আমার দাদুর পোস্টিং ছিল বোলপুরে, পরবর্তী কালে দাদু বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটিতে ইকনমিক্স পড়াতেন, আর আস্তে আস্তে রবীন্দ্রনাথকে জানতে চেষ্টা করেন, বুঝতে চেষ্টা করেন, নিজের অজান্তেই দাদু কখন যেন প্রবল রবীন্দ্র অনুরাগী হয়ে পড়েন।
- তারপর?
- তারপর আর কী, কোন এক পৌষমেলায় এসে মায়ের সাথে বাবার পরিচয় হয়, মায়ের টানেই বাবা বারবার ছুটে যেতেন শান্তিনিকেতনে, একসময় ওদের বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু এত ভালবেসে বিয়ে করেও মাকে বাবা তাঁর যোগ্য মর্যাদা কখনও দিতে পারেননি। আমি হওয়ার পর শেষ কটা বছর মা দাদুর কাছেই থেকে গিয়েছিলেন, ওখানেই একটা ছোট স্কুলে পড়াতেন আর মন ভরে গান গাইতেন, আমিও মায়ের সাথে থেকে থেকে ওই একই দিকে মন পড়ে থাকল, আজও তার থেকে বার হতে পারলাম না। বাবা শুধু বলতেন যে আমি যা ভালবাসি তাই যেন করি, তখন হয়তো মায়ের কথা ভেবেই বলতেন, মা যে অত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন তা বাবা বুঝতেই পারেননি। মায়ের মৃত্যু বাবা মেনে নিতে পারেননি খুব ভেঙে পড়েছিলেন আর আমাকে আঁকড়ে থাকেন এখন, আমার মধ্যে দিয়েই মাকে খোঁজেন হয়তো।

মনকলিকে এ কথাগুলো খুব গভীর ভাবে স্পর্শ করলেও ভালবাসা বা টান কোনদিন অনুভব করেনি। আজ কিন্তু বউয়াদার মতন মানুষকেই ফিরে পাওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। কিন্তু কোথায় তাকে পাবে জানে না। এখানে আসার আগে গিয়েছিল সে শান্তিনিকেতনে, বিশ্বভারতীতে খোঁজ করে জানতে পারে বউয়াদা পুরুলিয়ার কোনো কলেজের প্রফেসর হয়ে চলে এসেছে। সত্যি কথা বলতে সেও একই আশায় এখানে এসেছে যদি সে খুঁজে পায় তার পুরানো বউয়াদাকে, যে তাকে পাগলের মতন ভালবাসত, তার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যান পেয়েই সে চলে এসেছিল, একরকম নিজেকে একলা করে শুধু নিজের কাজ করে গেছে শান্তিনিকেতনের নিরালা নিভৃত কোণে। ওখানে তার সাথে দেখা হয়েছিল তার পুরানো বন্ধু সুচরিতার সাথে, সুচরিতাও পড়ায় বিশ্বভারতীতে, সুচরিতার মুখেই শুনেছিল বউয়দা ফিলসফিতে ডক্টরেট করেছে, রবীন্দ্র দর্শনের ওপরই সে থিসিস লেখে যা বিপুল ভাবে সর্বত্র সমাদৃত হয়। মাঝখানে দুবছর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিল ইউরোপের ফিলসফারদের ওপর কাজ করতে, তাদের দর্শন নিয়ে নানা তথ্য আলোচনা ও রিসার্চ করে, বিদেশের অনেক বড় বড় ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ানোর অফার পেয়েও নেয়নি, সুচরিতার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল আমার শিক্ষা আমি আমার দেশের ছেলেমেয়েদের দেবো, বিদেশের কোনো মোহ আমার নেই। সুচরিতার সাথে দুদিন ছিল তখন অনেক কথাই হয়েছিল। সুচরিতা বলেছিল আমি বড় ভালবেসে ফেলেছিলাম রে মানুষটাকে,
- কোনদিন বলিসনি?
- হ্যাঁ রে বলেছিলাম
- কী বলল?
- কবির কবিতায় উত্তর দিলো, "ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট এ তরী।” আমার ভালবাসার ওপর ঘেন্না ধরে গেছে, তবু তোমাকে বলছি তোমার ওপর দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম বলেই পালিয়ে যাচ্ছি, ভয় করে ভালবাসতে আমার।

তারপরই পুরুলিয়ায় চলে যায়, যাবার আগে আমার সাথে দেখা করে বলে যায়, ভাল থেকো সুচরিতা, খুব ভাল থেকো, আমি জানি প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা বড় মর্মান্তিক, আমি চাই না আমার জন্য কেউ এ কষ্ট পাক, মনে কোরো ভুল মানুষকে ভালবেসেছিলে, নতুন করে বাঁচতে হবে তোমাকে, তোমার জন্য অনেকে হাত বাড়িয়ে দেবে, আমার শুভকামনা তোমার সাথে সবসময় থাকবে, জানি না বলতে পারি না হয়তো তোমার কাছে ফিরে আসতেও পারি, তোমার যত্ন তোমার আন্তরিকতা আমার মনকে ভরিয়ে দিয়েছে, দেখা যাক কী হয়, ভবিষ্যৎ কথা বলবে সুচু,

তারপর জিজ্ঞেস করেছিলাম কোথায় যাচ্ছ? বলেছিল কোথায় যাচ্ছে, ভাইস প্রিন্সিপাল হয়ে, কিন্তু প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল আমি কাউকে যেন না বলি, তারপর জানতে চাইলাম তাহলে আমাকে বললে কেন?
- কী বলল?
- তুই শুনলে দুঃখ পাবি
- পাব না বল?
- বলেছিল, তোমার মতন করে ভালবাসতে কেউ পারে না, হয় স্বার্থ থাকে, না হয় অহংকার থাকে, তুমি কিছু না পেয়েও অনেক কিছু দিয়ে ফেলতে পার, তোমার কাছেই আমাকে ফিরে আসতে হবে।
 
ক্রমশ…
 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)