বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য়
বর্ষ/১৭তম সংখ্যা/২৫শে আশ্বিন, ১৪৩১
ধারাবাহিক উপন্যাস
পারমিতা
চ্যাটার্জি
শেষ থেকে শুরু
[৩য়
পর্ব]
"মনকলি উদাস হয়ে যায়, নিজের মনেই বলে, বড় ভুল করেছিলাম সেদিন তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বউয়াদা, কোন অভিমানে তুমি কোথায় চলে গেলে, তুমি কি জানো, তোমার মিতুল আজ পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে কিন্তু তুমি তো এখন সুচিকে ভালবাস, তোমার মনে আর আমার কোন জায়গা নেই। সত্যি কি জায়গা নেই?"
পূর্বানুবৃত্তি
বারবার অতীতের ভুলের কথা ভুলতে চেষ্টা করছে, না না প্রবীরের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সে বেঁচে গেছে শুধু নয় নিজের
অহংকার দম্ভ সব কোথায় মিলিয়ে গেছে। বউয়াদা মনকলিকে খুব
গভীর ভাবে স্পর্শ করলেও ভালবাসা বা টান কোনদিন অনুভব করেনি। আজ কিন্তু বউয়াদার মতন
মানুষকেই ফিরে পাওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। কিন্তু
কোথায় তাকে পাবে জানে না। তারপর…
মনকলি
বাড়িটা পেয়েছে খুব সুন্দর। খোলা জানলা দিয়ে নীল আকাশ যেন নুয়ে পড়েছে রাঙা মাটির
পথের ধারে। আদিবাসীর স্ত্রী পুরুষেরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দুধারে ঝুঁকে
পড়েছে লাল পলাশের
বন। অযোধ্যা পাহাড় একটু দূরে, মেঘের মাঝে আবছায়া দেখা যায় মাঝে মাঝে। আদিবাসী একটি
মেয়ে তার বাড়ির কাজের জন্য ঠিক হয়েছে, কালো শরীরে ভরাট যৌবন, মুখে একটা সরলতা, সব
মিলিয়ে মেয়েটিকে বেশ চটকদারই লাগে।
মেয়েটি একমুখ সরল হাসি হেসে বলল, উ দিখো, মুর আবার লাম, উ যি যা পারে তা বলি ডাক দেয়, মুর মরদটা তো ঘরকে ঢুকেই চিল্লাতে চিল্লাতে বলবে অহন, আরে এই তু গেলি কুথায়? দাঁড়া ফের তুয়ার চ্যালাকাঠের বাড়ির খাওনের শখ গ্যাছে লাকি রে?
- হ হ উ আমাদের সব মরদরাই দ্যায়, আবার এতের বেলায় সুহাগটা করে, সুয্যি উঠলেই গাল পারে, পান্তা খেইয়ে কামটায় যায়, সাঁঝের বেলাটায় ঘরকে হাঁড়িয়া খাইয়ে ঢুকেই চিল্লাতে থাকে। উ আমাদিগের সয়ে গেছে রে দিদি। তবে বাপ মা ইকটা লাম দিয়াছিল বটেক, চম্পা বইল্যে ডাকতক, আর এহনে মুকে বুধনের মা বলে সোবাই,
- তোমার ছেলের নাম বুধন বুঝি?
- হ দিদি, ইসকুলে পড়তে পাঠাইসি, তার লগে বুধনের বাপ আমারে এমন মারছিল যে মুর কোন সার ছিল না, হাসপাতালটায় লিয়ে গিয়েছিল, উখানে ডাক্তারবাবুরা বলছে উয়াকে আর যদি মারো তুমাকে তু পুলিশে দিমু, একমুখ হেসে বলে আর মুর গায়ে হাত তুলে লাই, বলেক আমি ভাবছিলাম তু আর বাঁচবি না, তুয়াকে ছেইরে মু তো বাঁইচতে পারবক লা, বুধনের কী হইবেক, অহন আমারে খুব ভালবাসে, মেলা বসলে, মুর লগি কাচের চুড়ি, পুঁথির মালাটা লিয়ে আসে।
মনকলির মনটা কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়, সে হয়তো চ্যালাকাঠের বাড়ি খায়নি, কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক বড় মার খেয়েছে জীবনে, বউয়াদাকে খুঁজে পাবে! তার মনে দোলাচল চলতে থাকে। যে মানুষটাকে একদিন অবহেলায় জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, আজ তার জন্যই অপেক্ষা করে যাচ্ছে, কবে দেখা পাবে, কোন কলেজে পড়ায় এখানে, সব খোঁজ নিতে নিতে ঠিক পেয়ে যাবে, তার অপরিণত বয়সের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে। সে যে অসুস্থ একথা জানাবে না। কারুর দয়া সে চায় না। এখানে তার সেই অহংবোধ এখনও থেকে গেছে।
সেদিন শনিবার ছিল, পরের দিন রোববার, ছুটি আছে, মনকলি চম্পাকে সাথে নিয়ে কাছেই একটা স্থানীয় বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র যেমন চাল, ডাল, আটা, ময়দা, বিস্কুট, পাঁউরুটি, দুধ, মাখন আর রান্নার জন্য তেল মশলা। এখানে দুটো গ্যাস স্টোভ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব কিছু কিনে আনার পর চম্পা বলল, কী আঁধবো দিদিমণি?
মনকলি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে, হেমন্তের বাতাস বইতে শুরু করলেও দিনের বেলাটায় মাথার ওপর সূর্যদেব বেশ গনগনে আগুনের হল্কা ছড়ান, কিন্তু বাড়িতে ঢুকলেই একটা সুন্দর শীতলতা অনুভূত হয়। মনকলি বলল, আগে একটু সীবত খাওয়াবে?
- উ মা দিদি কী বইলছেক দিখ! খাওয়ামি না ক্যানে? মু অহনি আনসি।
একটু পরে সে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট নিয়ে এলো, মনকলি বলল তুমিও একটু চা বিস্কুট নিয়ে বসো আমার কাছে,
- আরে রাঁধবে রাঁধবে, তরিতরকারি তো কিছুই কেনা হয়নি, ডাল আর চাল দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলো,
- তুমি তো ঘুরে কিছুই দিখ লাই গো, পিছনের উঠনের লগে কী সোন্দর ফুল, ফল, সবজির গাছ আছে জানো? উ বাজারটা থিকা আলুটা, কিনলেই হবেক অনে, আমাগো বাড়িতে উঠোনে মুরগির ঘরটা বানাইছে বুধনের বাপটা, উহান থিকা ডিম, মাংসটা লিয়ে আসতে পারবোক অনে, বুধনের বাপটা তো লতুন দিদিমণির জন্য কডা ডিম পাঠায় দিসে, খেইয়ে দিখ, দেশি মুরগির সোয়াদটাই ভালটা অছে গোন।
এরপর মনকলি বলল ঠিক আছে খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা করে নিও তোমার আর আমার জন্য,
- লারে দিদি আমাকে ঘরকে যেইয়েই খাইতে হবেক, কামে অসছি বলেক মরদটা মুর আন্না করসে, না খাইলেক বহিত গরমটা দেখাইবেক।
- আচ্ছা চম্পা এখানে কলেজের কোনো মাস্টারমশাইকে জানো যিনি খুব গান করেন?
- লা তো মু তো জানিক লাই রে, মু মোর মরদটাকে শুধাইবো অনে।
মনকলি উদাস হয়ে যায়, নিজের মনেই বলে, বড় ভুল করেছিলাম সেদিন তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বউয়াদা, কোন অভিমানে তুমি কোথায় চলে গেলে, তুমি কি জানো, তোমার মিতুল আজ পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে কিন্তু তুমি তো এখন সুচিকে ভালবাস, তোমার মনে আর আমার কোন জায়গা নেই। সত্যি কি জায়গা নেই? হয়তো সত্যি নেই, সুচি তোমাকে সত্যি ভালবাসে সেই ছোট থেকে, তোমাদের মিল হোক এটাই চাই, আমি শুধু সেদিনের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে নেব, আর কিছু নয়। তুমি এখানেই আছ এই খবর পেয়েই তো আমি এখানে চলে এসেছি, তোমাকে খুঁজে পাবো তো বউয়াদা!
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment