প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Tuesday, September 24, 2024

শারদ | অভিমান | সুদীপ্তা চট্টোপাধ্যায়

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১

শারদ | ছোটগল্প

সুদীপ্তা চট্টোপাধ্যায়

অভিমান


"বাবান হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে ঠাম্মি বলে জড়িয়ে ধরে। চোখে চশমা নেই। তবুও চিনতে অসুবিধে হয়নি। স্পর্শে বুঝে গেছে এ তার প্রিয় নাতি। প্রিয়াঙ্কা এগিয়ে আসে। যত্ন করে চোখে চশমাটা পরিয়ে দেয়। শুভজিৎ অবাক হয়। প্রিয়াঙ্কা মায়ের নতুন চশমা কবে কিনল! প্রিয়াঙ্কার সবদিকে নজর। শুভজিৎ দেখে মায়ের মুখে এক তৃপ্তির হাসি।"


একের পর এক সিগারেটে টান দিয়েই চলেছে শুভজিৎ। বিচ্ছিরি একটা ভ‍্যাপসা গরম। তারপর সিগারেটের গন্ধ। ঘরটাতে থাকা যায়-না। প্রিয়াঙ্কা তাই পাশের রুমে ছেলের কাছে শুয়েছে। আর কিছুদিন পর সে হোস্টেলে চলে যাবে। হঠাৎ একটা  আননোন নাম্বারে ফোন আসে। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও ফোনটা রিসিভ করে নেয় শুভজিৎ। এত রাতে কে! একটু বিরক্ত হয়।
- হ‍্যালো, কে?
- শেষ পর্যন্ত মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে এলি শুভ।
গলাটা শুনে চমকে ওঠে শুভজিৎ। কী বলবে খুঁজে পায় না। নিজের কাকা। তবুও নাম্বারটা সেভ নেই ফোনে। ব‍্যস্ত জীবনে কোনো আত্মীয়র সাথেই ঠিক ভাবে সম্পর্ক রাখা হয়ে ওঠেনি। মাঝে মাঝে অফিস কলিরা আসে। তখনই যা একটু পার্টি হয়। গল্প গুজব। খাওয়াদাওয়া।
অনেক রাত পর্যন্ত পার্টি চলত। ড্রিংকস, ধূমপান। মাঝে মাঝে বন্ধুদের চাপে দুপেগের একটু বেশিই খেয়ে ফেলত। শুভ বুঝতে পারত, মা বিরক্ত হচ্ছে। কিন্তু মা তাকে কিছু বলত না। বয়স আর সময়ের সাথে সাথে সব সম্পর্কের মধ্যে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
গলার স্বর জড়িয়ে আসে। কাঁপা গলায় কথা শুরু করে। আজ সকালেই রেখে এসেছি। আবাসনটি বেশ ভাল। শুনেছি ভাল কেয়ার নেয়। তাছাড়া মা-ও কোনো  আপত্তি করেনি।
কথাটা শোনার পর মায়ের মুখে কোনো অভিযোগ বা অভিমানের ছাপ ছিল না। মনে হয়েছিল দু'কামরার এই বদ্ধ ফ্ল‍্যাটের জীবন থেকে সে নিজেই মুক্তি চায়।
প্রিয়াঙ্কা  আপত্তি করেছিল। বলেছিল, সব দিক আমি সামলে নেব।
শুভজিৎ বলেছিল, তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। সব দিক একসাথে সামলানো সম্ভব নয়। মায়ের বয়স হয়েছে। বাবান খুব ছোট।
প্রিয়াঙ্কা রাজি হয়নি। অন্য বৌদের মতো যখনতখন তোমার কাছে হাত পাততে পারব না। সবসময় একটা কাজের লোক রাখার কথা বলেছিল। রাজি হয়নি প্রিয়াঙ্কা। বলেছিল দেখনি টিভিতে, পরিচারিকারা খাবারে কী সব মিশিয়ে দিয়ে বাড়ির মালিককে খুন করে পালিয়ে যায়। শুভজিতের কোনো যুক্তিই প্রিয়াঙ্কার কাছে খাটে না।
সেদিন বাবান স্কুলে। ফাঁকা ফ্ল‍্যাটে মা একা। অ‍্যাকসিডেণ্টটা কীভাবে ঘটল তা আজও ভেবে পায় না শুভজিৎ। জ্ঞান হারিয়ে বাথরুমে বেশ কয়েক ঘণ্টা পড়ে ছিল। এ ঘটনার পরেই  শুভজিৎ এ সিদ্ধান্ত নেয়। জনে জনে এটা কীভাবে বোঝাবে পরিস্থিতি মানুষকে দিয়ে সবকিছু করিয়ে নেয়। তবু এইভাবে ফোনটা আসায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। মায়ের মুখটা ভেসে এল চোখের সামনে। সেভাবে কাকার সাথে কোনো কথা বলতে পারেনি শুভজিৎ।
এখন আমি ব‍্যস্ত আছি। পরে কথা হবে। ফোনটা নিজের থেকেই কেটে দিল শুভজিৎ। ঘর থেকে বেরিয়েই পাশের ঘরে চোখ পড়তেই দেখল, প্রিয়াঙ্কা বাবানকে জড়িয়ে ধরে ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো। শহর ঘুমিয়ে। কালো আকাশে শুধু আধ খাওয়া চাঁদ। বাবানের ঘরে মা থাকত। ঠাম্মি ঠাম্মি করে বেশ কান্নাকাটিও করেছে। কিছুতেই ঘুমোতে চাইছিল না। রোজ ঠাকুমার কাছে গল্প শোনার  অভ‍্যেস।
বাবানকে দেখবে কে! ক্লাস ফাইভ। পড়ার চাপ বাড়ছে। দুজনেরই প্রাইভেট চাকরি। সময় নেই। বাবান চলে যাবে হোস্টেলে। মা গেছে বৃদ্ধাশ্রমে।
ইচ্ছে করছে আজ রাতটা ধোঁয়ায় ডুবে থাকতে। চিন্তা, অপরাধবোধ ধাওয়া করে বেড়াচ্ছে। ফুটবল অন্ত প্রাণ শুভজিৎ। তখন ক্লাস নাইন। ব‍্যস্ত উকিল প্রণববাবুর চোখে পড়ল, ছেলে ফুটবল ফুটবল করে মাঠে ছুটে বেড়াচ্ছে।
সেদিন শুভজিতের ফুটবল ম‍্যাচ। ভোরে প্র‍্যাকটিসের সময় দেখে কে তার ফুটবলের হাওয়া বের করে দিয়েছে। মা প্রমীলাদেবী তখন রান্নাঘরে।
- কী রে এত চিৎকার করছিস কেন?
- ফুটবলের এই অবস্থা কে করেছে?
ছেলের  রাগ দেখে প্রমীলাদেবী চুপ করে যায়। হাতে এক কাপ চা আর একটা কাগজ নিয়ে প্রণববাবু উপদেশের সুরে বললেন, দেখেছ পেপারটা। মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। মাধ্যমিকে এক থেকে কুড়ি হয়েছে ছেলেদের দেখ। সারাদিন কত ঘণ্টা পড়ে। আর তুমি! ফুটবল  আর ফুটবল। ও ফুটবলে আর হাত দেবে না। পড়ো এখন থেকে, শুধু পড়ো। শুভজিৎ বুঝতে পেরেছিল ফুটবলের এই অবস্থা তার বাবাই করেছে। মা সব জেনেও চুপ করে দাঁড়িয়ে  আছে। একটা কথাও বলেনি। মা বাবার বিরুদ্ধে কথা বলে না। বাবার কথাই এ বাড়ির শেষ কথা। খুব অভিমান হয়েছিল মায়ের উপর। ফুটবলকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাতের পর রাত চোখের জল ফেলেছে শুভ।
তারপর একদিন বইমুখো হয়ে গেছে। ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। তার সাথে সাথে কখন সে জ‍্যান্ত একটা মানুষ থেকে মেশিনে পরিণত হয়েছে  সেটা কেউ টের পায়নি।
ভোরের পাখি ডাকছে। সারারাত ঘুম হয়নি শুভজিতের। এখন একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রিয়াঙ্কা রান্নাঘরে। আজ তার অফিস যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কাল অনেক রাত পর্যন্ত বাবান কান্নাকাটি করেছে। এখন ঘুমে কাদা।
এক কাপ চা নিয়ে প্রিয়াঙ্কা শুভজিৎকে ডাক দেয়। ওঠো, অফিস যেতে হবে। তোমার তো আবার মিটিং আছে। 
মা, মা কী উঠে পড়েছে। বিড়বিড় করতে থাকে শুভজিৎ
- সে তো এখন— নিজেকে সংযত করে নেয় প্রিয়াঙ্কা। তুমি তো কোনো কথাই শুনলে না। তুমি কী এখনো ঘুমিয়ে আছ। প্রিয়াঙ্কা একটা ঠেলা দেয় ঘুমন্ত শুভজিৎকে। প্রিয়াঙ্কার চোখে পড়ে শুভজিৎ-এর লাল হয়ে যাওয়া চোখ। আজ মিটিংটা ক‍্যানসেল করে দাও শুভ। বলো তোমার শরীর ভাল নেই।
- বাবান স্কুলে যায়নি প্রিয়াঙ্কা।
- না। কাল আনেক রাত পর্যন্ত ঠাম্মি ঠাম্মি করেছে। তাই আজ আর পাঠাব না। কিছুদিন পর তো হোস্টেলে চলেই যাবে।
- তুমি আমার কোনো কথা শুনছ না প্রিয়াঙ্কা।
প্রিয়াঙ্কার হাত দুটো নিজের কাছে টেনে নেয় শুভজিৎ। বাথরুমে ঢুকে পড়ে শুভ। আনেক্ষণ শাওয়ারের জলে ভিজতে ইচ্ছে হয় তার। হঠাৎ বাথরুমের কোনে চোখ পড়তেই দেখে একটা ভাঙা চশমা বাথরুমের কোনে পড়ে আছে। শুভ হাতে নিয়ে দেখে এটা মায়ের চশমা। সেদিন বাথরুমে পড়ে গিয়ে চশমাটা ভেঙে গিয়েছিল। শুভ বলেছিল তোমাকে একটা ভাল ডাক্তার দেখিয়ে নতুন চশমা করিয়ে দেব। কিন্তু এত ব‍্যস্ত যে সময় করে চশমাটা করে উঠতে পারেনি। মা চশমা ছাড়া কিছুই দেখতে পায় না। অথচ যাবার সময় একবার সে কথা মনে করিয়ে দিল না।
আজ আমি মিটিং-এ যাচ্ছি না। মিটিং ক‍্যানসেল করেছি। চলো প্রিয়াঙ্কা আমরা কোথাও ঘুরে আসি। প্রিয়াঙ্কা রাজি হয়ে যায়। ছেলেকে উঠিয়ে রেডি করতে থাকে। প্রিয়াঙ্কা জানে শুভর মনটা ভাল নেই। মুখে না বললেও মাকে সে ভালবাসে।
গাড়ি চলতে থাকে বৃদ্ধাশ্রমের দিকে। বেশ কিছু বৃদ্ধা ফুলগাছের যত্ন নিচ্ছে। কিছু জন একে অপরের সাথে গল্পে ব‍্যস্ত। শুভজিতের গাড়ি বৃদ্ধাশ্রমের গেটে এসে দাঁড়ায়। কৌতূহলী দৃষ্টিতে একদল বৃদ্ধ-বৃদ্ধা শুভজিতের দিকে তাকিয়ে থাকে। শুভজিৎ দূর থেকে দেখে, তার মা একটা চেয়ারে বসে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভেবে চলেছে। বাবান হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে ঠাম্মি বলে জড়িয়ে ধরে। চোখে চশমা নেই। তবুও চিনতে অসুবিধে হয়নি। স্পর্শে বুঝে গেছে এ তার প্রিয় নাতি। প্রিয়াঙ্কা এগিয়ে আসে। যত্ন করে চোখে চশমাটা পরিয়ে দেয়। শুভজিৎ অবাক হয়। প্রিয়াঙ্কা মায়ের নতুন চশমা কবে কিনল! প্রিয়াঙ্কার সবদিকে নজর। শুভজিৎ দেখে মায়ের মুখে এক তৃপ্তির হাসি। শুভজিৎ কাছে যেতে পারে না। কোথায় একটা বাধ ঠেকছে। একটা সিগারেট ধরায়। নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে একটা ধোঁয়ার জগত তৈরি হয়। সেই জগতে দেখতে পায়, বাবান চলে গেছে হোস্টেলে। সে-ও একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার হবে। হয়ে উঠবে ব‍্যস্ত মানুষ। তার ব‍্যস্ততাও হয়তো একদিন তাকেও—
আর কিছুই ভাবতে পারে না শুভজিৎ। একটা প্রাণখোলা হাসির শব্দে তার সম্বিত ফিরে আসে। সামনে এগিয়ে দেখে দুটি অসমবয়সি মানুষ তাদের নিজেদের গল্পের মধ্যে ডুবে আছে।
 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)