বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/অন্য
চোখে/২য় বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১
শারদ | অন্য চোখে
পাভেল আমান
পুজোর গন্ধ
"দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে সম্প্রীতির যে মেলবন্ধন দেখা যায় তা আর কোনও উৎসবে দেখা যায় না। আগে মুসলমানরা পাশে থেকে পুজো উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতেন। কিন্তু এখন মুসলমানদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ বেড়ে চলেছে।"
পুজোর গন্ধ সারা বাংলার আকাশ জুড়ে। কেমন যেন ভাল লাগা প্রশান্তির
অনুভূতি। সবাই যেন আজ দগ্ধতা-যাতনা-হতাশা-শূন্যতা চাওয়াপাওয়ার অপূর্ণতা ভুলে
গিয়ে পুজোর আনন্দ মন-প্রাণে ভাগ করে নিতে একাকার হয়ে গেছে। এখানেই পুজো উৎসব পালাপার্বণের
প্রাসঙ্গিকতা। কথায় বলে ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আর সত্যিই তো তাই, বাংলার
শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোয় তো সেই নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, সব যেন
মিলেমিশে এক হয়ে যায়। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান সকলেই যেন একে অপরের সঙ্গে
কোনও এক অদৃশ্য আন্তরিক টানে পুজোর আনন্দে মেতে ওঠেন। তবে বাংলার এই সংস্কৃতি
অবশ্য আজকের নয়, বহু যুগ ধরে এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরই সাক্ষী থেকেছে বাংলা। দুর্গাপুজো
বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ উৎসব। এই উৎসবে জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সকলে মেতে ওঠে। কারণ,
মা সকলের, উৎসব সকলের। কবি নজরুল বলেছিলেন, “আমরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু
মুসলমান”। সেই মন্ত্রকে পাথেয় করে সম্প্রীতির অনন্য নজির দেখা যায় দুর্গাপুজোয়।
কোথাও কোথাও দেখা যায়, দুর্গাপুজোর আয়োজন করছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা। এ
শুধুই পুজো নয়, এ যথার্থ শারদোৎসব৷ যে পুজোয় শুধু হিন্দু নয়, অংশ নেয় মুসলিম সমাজ,
যে পুজোয় ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে মিশে থাকে অন্ত্যজদের আবেগ, সেই পুজোই যথার্থ
উৎসবের বার্তা বহন করে৷ এখানে দেবী শুধু হিন্দুদের নয়, মুসলমানদেরও মা৷ শরতের আকাশে
সাদা মেঘের ভেলাও যেন একটু থমকে দাঁড়ায় ‘মালদা ঐক্য’ পুজোমণ্ডপের মাথায়৷ কাশবনের
বাতাস ভেসে আসে ইট-কংক্রিটের শহরে৷ শুধু দুর্গাপুজোই নয়, ঈদ-মহরমও এখানে কোনও
বিশেষ সম্প্রদায়ের নয়৷ সবই বাঙালির উৎসব, বাঙালির পরব৷ আমাদের ছোটবেলার দুর্গাপুজো
আর এখনকার পুজোর মধ্যে গুণগত পার্থক্য অনেক। তখনকার পুজোর সামাজিক চরিত্র ছিল
আলাদা। এখনকার পুজো অনেক বেশি বাণিজ্যিক। মণ্ডপ ও মূর্তি তৈরিতে এখন শিল্পসৃষ্টিই
প্রধান হয়ে উঠেছে। মণ্ডপসজ্জা থেকে মূর্তি তৈরিতে নানা ধরনের উপকরণ ব্যবহৃত হচ্ছে।
উঠে আসছে লোকশিল্পের নানা রূপ। থিমের পাশাপাশি ঐতিহ্যের মেলবন্ধনও ঘটছে। পুজো নিয়ে
নানা ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করার ফলে শিল্পী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে বেড়েছে
বৈচিত্র্যের সন্ধান। দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে সম্প্রীতির যে মেলবন্ধন দেখা যায়
তা আর কোনও উৎসবে দেখা যায় না। আগে মুসলমানরা পাশে থেকে পুজো উদ্যোক্তাদের সহায়তা
করতেন। কিন্তু এখন মুসলমানদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ বেড়ে চলেছে। মূর্তি তৈরিতেও হাত
লাগাচ্ছেন মুসলমান শিল্পীরা। মুসলমান প্রধান গ্রামগুলিতেও আয়োজিত হচ্ছে দুর্গা
পুজোর। সেখানে মুসলিম ছেলে ও মেয়েরাই মণ্ডপ ও মূর্তি তৈরি করছেন হাতে হাত মিলিয়ে।
অর্থাৎ বছরের প্রতীক্ষিত শারদ উৎসবকে ঘিরে সমস্ত বাঙালির হিংসা বিদ্বেষ মতানৈক্যকে
সরিয়ে রেখে সবাই যেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্পূর্ণ করতে থাকে মায়ের পুজো। আজ
চারিদিকে দুর্গাপুজোকে ঘিরে কত মানুষের আনন্দ উচ্ছ্বাস। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে
দুর্গাপুজো সর্বজনীন উৎসবে পরিণত। ছোটবেলার মধুর স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে এখনো ষষ্ঠী
থেকে নবমী পর্যন্ত মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দর্শন চলতে থাকে। রাস্তার ধারে
কত মানুষ খাবার থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের দ্রব্যের স্টল বসিয়ে পুজোর কটা দিন
পয়সা রোজকার করে। বাংলার অর্থনীতির পালেও হাওয়া লাগে দুর্গা পূজাকে নিয়ে।
আবালবৃদ্ধবনিতা
সবাই যেন এই কটা দিন একেবারে খুশির আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। অহর্নিশ ভুলতে থাকে
টানাপোড়েন প্রতিবন্ধকতা বিভিন্ন সমস্যাবলি প্রাত্যহিক জীবনের। এভাবেই বাঙালি
চেতনায় জীবনযাত্রায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে শারদ উৎসব। আজ শুধু মনপ্রাণ খুলে
আনন্দ উচ্ছ্বাসে বিভোর হয়ে সমস্ত জড়তা জীর্ণতা হিংস্রতা সংকীর্ণতা ভুলে গিয়ে
একে অপরের সাথে হাত রেখে মানবতার আহবানে সাড়া দিয়ে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা দেবী
দুর্গার আরাধনায় মগ্ন হয়ে। এভাবেই আবহমান কালব্যাপী আপামর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত
অংশগ্রহণে দুর্গাপুজো সম্প্রীতি ও সমন্বয়ের বার্তাবাহক হয়ে উঠেছে।
***

No comments:
Post a Comment