বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক সংখ্যা/বরষা/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/১৪তম/১৪ই ভাদ্র,
১৪৩১
বরষা | ছোটগল্প
সঙ্ঘমিত্রা দাস
অনুপমা
"হঠাৎ পিছন থেকে মৃদুস্বরে ডাক "মা" আভি ওর ছেলে। ফাইভে পড়ে "তুমি কেঁদো-না, তোমার সব লেখা আমার খুব ভাল লাগে। তাই আমার ওন লাইন ক্লাসের জন্য বাবার দেওয়া পুরোনো মোবাইলে ছবি তুলে রাখি, বন্ধুদের শোনাব বলে।"
দেখেশুনে স্কুল শিক্ষক পাত্রের সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছিল অনুপমার। বাবা সম্বন্ধ
করে বিয়ে দেন। মা-ছেলের ছোট সংসার, কোন দাবিদাওয়া নেই শুধু মেয়ের চাকরি করা চলবে না। মন দিয়ে সংসারের সব দায়িত্ব পালন করে সংসারটা
গুছিয়ে রাখতে হবে। বেশ আনন্দেই ঘটা করে শুভ কাজ সম্পন্ন হলো। চাকরিবাকরির বিশেষ
ইচ্ছে কোনদিনও ওর ছিল না। একটু লেখালেখি আর ঘুরে বেড়াতে পারলে এক বেলা না খেলেও
চলে যায়।
প্রথম ছ মাস সুখেই কাটল। বছর ঘুরতে কোলে ছেলে এলো। এদিকে শাশুড়িমা ঘরের সব দায়িত্ব
তার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। নিজেকে বেশ গিন্নিবান্নি মনে হতে লাগল এই চব্বিশ বছর
বয়সেই। অনুপমা ঘর বাইরের সব দিক, বাচ্চার সমস্ত দেখভাল করে
নাজেহাল। তবুও তার মধ্যে চলল লেখা আর সাহিত্যসভা। তার এই বেরোনো নিয়ে শুরু হলো
অশান্তি। ঘরের কাজে ঠিক কতটা অসুবিধা হচ্ছে বা এত উড়ুউড়ু মন বেশ খারাপ লক্ষণ এমন
মন্তব্য শুনতে হলো প্রতি মুহূর্তে। স্বামীরও একই মত, চাকরি
না করা মেয়ে এনেছিল তো সে ঘরে থাকবে বলেই। আর তাছাড়া তার পরিচিতির বাইরেও বৌএর
আলাদা একটা পরিচিতি গড়ে উঠলে মেল ইগো হার্ট করে বৈকি। মুখে না বললেও অনুপমার সেটা
বুঝতে অসুবিধা হয় না। ও লক্ষ্য করেছে শাশুড়িমা খুব একটা
পছন্দ করেন না আজকাল। ওর কাজে সাহায্যের হাত বাড়ানো তো দূরের
কথা, ছেলের সামনে ইনিয়েবিনিয়ে নানা খুঁত ধরেন। পাড়াপ্রতিবেশীর কাছে ছেলে পর হয়ে যাবার দুঃখ করেন। বৌমা আসার পর
সে নাকি বদলে গেছে। বাড়িতে কেউ এলেই বাবা মারা যাবার পর কত কষ্টে ছেলেকে মানুষ
করেছেন সেই গল্প করে বেশ খানিকটা কান্নাকাটি করে নেন।
এইভাবে দশ বছর সংসারে কেটে গেছে অনুপমার। স্বামীও তার মায়ের কষ্টের জন্য এখন
তাকেই দায়ী করে। তার সাথে আজকাল শুরু হয়েছে অনুপমার লেখালেখি নিয়ে চরম আপত্তি।
ছেলের পড়াশোনার দোহাই দিয়ে সবটা বন্ধ করার প্রাণপণ চেষ্টা। সব দিক সামলে, ছেলের স্কুল, হোমওয়ার্ক, রান্না, বাজার,
ব্যাংক শেষে রাতে একটু লিখতে বসলেই বচসা শুরু। কোনদিন ঘুম পেয়েছে
বলে আলো নিভিয়ে দেওয়া বা কোনদিন শাশুড়িকে সন্ধ্যায় চা
দিতে দেরি হবার বাহানায়। নিত্য দিনের ঝগড়া, বেরোনো নিয়ে
অশালীন মন্তব্য লেগেই থাকে। আস্তে আস্তে ওর লেখালেখিও কমে যায়। মনমরা থাকে
সবসময়। কীভাবে কাটছে জীবন? ঘরবন্দি হয়ে সংসারের জাঁতাকলে পিষতে থাকে। এভাবেই চলবে দিনের পর দিন?
কোন কোন সময় এক-দুটো কবিতা পাঠিয়ে দেয় পত্রিকার দপ্তরে। ছাপা হয়েছে জানতে পারলে হাজার
অশান্তির মাঝেও মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। কিন্তু সভায় উপস্থিত হয়ে সম্মানের সাথে
গ্রহণ করার সুযোগটুকুও এখন পায় না।
সমস্ত শখ বিসর্জন দিয়ে, সাংসারিক নিত্য অশান্তি সহ্য করে কেমন যেন হারিয়ে যেতে থাকে
অনুপমা। তবু ছেলেটাকে বুকে আগলে সামনে এগিয়ে চলতে থাকে।
এবার পুজোয় বড় একটা প্রকাশনা সংস্থা থেকে ওর গল্প চেয়ে পাঠিয়েছে। খুব
খুশি। দুপুরে শাশুড়ি, ছেলে ঘুমোলে, স্বামী
অফিসে, ও লিখতে থাকে। এভাবে প্রায় শেষ করে এনেছে গল্পটাকে।
আজ খুব বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সন্ধের দিকে তুমুল বর্ষায় উত্তর কোলকাতার এই নিচু বাড়িগুলোর ঘরে জল ঢুকে যায়। অনুপমা ওর স্বামী,
শাশুড়ি সকলে মিলে ঘরের সব দরকারী জিনিসপত্র
বসার ঘরের খাটের ওপর জড়ো করল যাতে কিছু ভিজে গিয়ে নষ্ট না হয়। সব সরিয়ে ব্যবস্থা
করতে হাঁপিয়ে উঠল সবাই। অনুপমা গোড়ালি ডোবা জলে দাঁড়িয়ে রান্না সারল। রাতে
সকলে খেতে বসেছে শোবার ঘরের খাটে, বিছানা সরিয়ে। অনুপমার
মনে পড়ল ওর খাতাটা বালিশের তলায় ছিল। তাড়াতাড়ি তুলে দেখে, নেই। চারপাশে তাকাতেই চোখে পড়ল মেঝের জলের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে আছে ওটা,
ঝপ করে তুলে নিল কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
একেবারে ভিজে ছিঁড়ে আসছে পাতাগুলো। হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল
অনুপমা। এতদিনের সব পরিশ্রম, স্বপ্ন জলে ভেসে গেছে। শাশুড়ি, স্বামী নির্বিকার। তারা রাতের খাবার নিয়ে
খুঁটিনাটি কথাতেই ব্যস্ত।
অনুপমার রাতে আর খাওয়া হয়নি। হতাশা চেপে বসছে যেন। কাদের জন্য ও এত কিছু করে।
যাদের কাছে ওর বিন্দুমাত্র দাম নেই। কতটা অপমান, তাচ্ছিল্য
সহ্য করা উচিত একটা সংসারকে টিকিয়ে রাখতে? এলোমেলো সব
ভাবনা। খাতাটা কোলের ওপরে, চোখের জলে আরো ভিজছে।
সকলে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। বৃষ্টি কমে এসেছে। জলও নেমে গেছে। হঠাৎ পিছন থেকে মৃদুস্বরে ডাক "মা" আভি ওর ছেলে। ফাইভে পড়ে "তুমি কেঁদো-না, তোমার সব লেখা আমার খুব ভাল লাগে। তাই আমার ওন
লাইন ক্লাসের জন্য বাবার দেওয়া পুরোনো মোবাইলে ছবি তুলে রাখি, বন্ধুদের শোনাব বলে। কেউ টের পাবার আগে তুমি ওখান থেকে তাড়াতাড়ি ওগুলো
পাঠিয়ে দিও।"
অনুপমা জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকে ছেলেকে। সম্পূর্ণ হেরে যাবার মুহূর্তে
বিজয়ের হাসি ফুটে ওঠে ওর মুখে। কেউ তো আপন আছে যে ওর ভাবনার সাথী হয়ে পাশে আছে।
***

No comments:
Post a Comment