প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Friday, September 27, 2024

শারদ | অজানা রহস্য | রুচিরা সাহা

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১

শারদ | ছোটগল্প

রুচিরা সাহা

অজানা রহস্য


"মালতী ছিল রান্নাঘরে, আর শ্বেতা তার ছেলেকে নিয়ে নিজের ঘরে শুয়ে ছিল আর হরেন তাকে মাথার চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে বিছানা থেকে নামিয়ে গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে দেয়। দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়।"


সালটি সম্ভবত ১৯৯২। শীতের সন্ধেবেলা। প্রায় সব বাড়িতেই সন্ধ্যাবাতি দেওয়ার পর্ব চলছে। আশেপাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি স্বর্ণকারের দোকান। তারাও দোকানে ধূপ প্রদীপ নিয়ে ব্যস্ত। এইরকম পরিস্থিতিতে হঠাৎ একজন মহিলার আর্তনাদ শোনা গেল। কিন্তু কোন দিক থেকে আসছে কেউই তদন্ত করে বার করে উঠতে পারলেন না। সবাই নিজের 
নিজের দোকানে। আবারও করুণ আর্তনাদ ভেসে আসছে। কয়েকজনের তত্ত্বাবধানে ঘটনার রহস্য এগোতে থাকে। ষষ্ঠীবাবু বলেন "ওই উত্তরদিকের বাড়ির দোতলা থেকে আসছে মনে হচ্ছে!" বংশীবাবু বলেন "আরে পোড়া গন্ধ তো?" এইভাবে বেশ কয়েকজন ওই বাড়িটির দিকে এগিয়ে যায়। হরেনবাবু দোকানে নেই তার কর্মচারী দোকানে বসে রয়েছে। দেড় বছরের একটি ছেলে আছে হরেনবাবুর। ষষ্ঠীবাবু একটু ডাকাবুকো লোক। বলেন হরেনকে ডাকত। কর্মচারী একটু আমতা আমতা করে। বাড়ির ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে সেটা পাশের বাড়ির শরিকেরা বুঝতে পেরেও চুপচাপ ছিলেন। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই পেছনদিকে কলাবাগানে কী যেন ঝপাস করে পড়ল। হরেন অগ্নিদগ্ধ অবস্থায়, আর দেড় বছরের ছোট্ট শিশুটি অঘোরে ঘুমোচ্ছে খাটের এককোণে। কেউ একজন হরেনকে একটি কম্বল দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হরেনের স্ত্রী কোথায়? অনেকক্ষণ পরে ষষ্ঠীবাবু জিজ্ঞাসা করেন। ততক্ষণে হরেনকে হাসপাতালে ভর্তি করার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হয়ে গিয়েছে। ছোট্ট দেড় বছরের শিশুটির চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গিয়েছে। মালতী দৌড়ে কোলে নিতে যায়। ঠিক তখনই ষষ্ঠীবাবুর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। এদিকে বাড়ির পেছনের কলাবাগান থেকে বিকট পোড়া গন্ধ আসছে। সব দোকান আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। সকলেই হরেন দত্তর বাড়ির দিকে। পাড়ার কয়েকজন মিলে পেছনের দিকে যায় দেখে এসে চক্ষু স্থির সকলের। আসল ঘটনা জানার জন্য ততক্ষণে পুলিশ এসে পৌঁছে গিয়েছে। নানান লোকের নানান কথা। মালতীর কথার মধ্যে কতটা সত্যি ছিল সেটা একমাত্র মালতীই জানত। তার কথায় অনেক অসঙ্গতি ছিল। হরেনের একটু কথা বলার পরিস্থিতি হলে সে অভিযোগ করে "তার স্ত্রী শ্বেতা ছেলের জন্য দুধ গরম করতে গিয়ে গ্যাস থেকে আগুন লাগে, তখন তাকে বাঁচাতে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন তাতেই তিনি দগ্ধ হয়ে যান।" কিন্তু কলাবাগানের মৃত দেহটি? রাত্রি এগারোটার সময়ে একটা ভ্যানে প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে পুলিশ নিয়ে যায়। হরেন সংজ্ঞা হারায়। মালতীর কথা "বৌমনি বাঁচতে চাইতনি"। কারণ জানতে চাওয়া হলে মালতী চুপচাপ থাকল। কিন্তু দেড় বছরের ছোট্ট শিশুটি খুঁজছে তার মাকে এক এক সময় শিশুটি প্রচণ্ড কেঁদে উঠছে। যথা সময়ে আদালতে পেশ করা হলো ঘটনা। হরেনের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা অর্থাৎ শ্বেতার বাবা-মা বাচ্চাটিকে তাঁদের কাছে নিয়ে রাখতে গেলে হরেন আইনের সাহায্য নিয়ে তার কাছেই রাখার চেষ্টা করে। কথার অসঙ্গতি থাকায় মালতীকে সেই রাত্রে থানায় রাখা হয়। পাড়ার লোকের এবং অন্যান্য সকলেরই ধারণা ছিল মালতীই শ্বেতাকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। এদিকে হরেনকেও পুলিশ আটক করেছে, কিন্তু সে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার জন্য চিকিৎসাধীন। অতি সহজ সরল ভদ্রলোক। ডাক্তার, পুলিশ, এমনকি আইনজীবী সকলেরই ধারণা হরেন নির্দোষ। তিনমাস পরে হরেন বাড়ি ফিরে আসে। এরপর সে ক্রমাগত শ্বশুরবাড়ির উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে মামলাটি তুলে নেওয়ার জন্য। এদিকে মালতীর বাড়ি থেকে লোক আসে কারণ সে বেশ কয়েক মাস টাকা পাঠায়নি। হরেন মালতীর ভাই শিবাকে পাওনা টাকা দিয়ে দেয়। শিবা বোবা ছিল। বাংলা ভাষায় কথা ঠিক বুঝতে পারত না। সে এইটুকুই বুঝল যে মালতী সেখানে থাকে না। কিন্তু মালতী কোথায় সেটা সে জানবার বা বোঝার চেষ্টাও করেনি। নেশায় মত্ত হয়েই থাকত। হরেন প্রতি মাসে মালতীর বাড়ির ঠিকানায় টাকা পাঠিয়ে দিত। দিন, মাস গড়িয়ে তিন বছর পার হয়ে গেল। হরেন দত্ত ছেলে সৌভিককে একটি নার্সারি স্কুলে ভর্তি করান। প্রথম প্রথম স্কুলে আসত অন্যান্য শিশুরা কাঁদলে সে চুপচাপ দেখত। সবসময় ও একটা ভয়ের মধ্যেই থাকত। সৌভিক জানত তার যখন দেড় বছর বয়স তখন তার মা মারা গিয়েছে। মাতৃস্নেহ বিহীন শৈশব কাটতে লাগল। বাবাকে প্রচণ্ড ভয় পেত। কিন্তু হরেন দত্তের স্ত্রী শ্বেতার মৃত্যু নিয়ে আর সেরকম কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু মালতী থাকল জেলের ভেতরে। আদৌ কি মালতী দোষী? প্রশ্নটা থেকেই যায় সকলের মনের মধ্যে। গরমের দিন আলো নেই। হরেন দত্তর বৌদির সকাল থেকেই খুব খারাপ অবস্থা। কিন্তু কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিলেন। হরেন দত্ত একটি বারের জন্যও নিজে যাননি এবং ছেলেকে যেতে দেননি। কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি এক অত্যন্ত অবিশ্বাস্য কথা বলেন। "মালতীর সাথে হরেনের স্ত্রী শ্বেতার সুসম্পর্ক ছিল।" কী হয়েছিল তাহলে সেদিন? আর শেষ উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেন। প্রায় কয়েক বছর পর মালতী জেল থেকে ছাড়া পায়। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। একজন মহিলা পুলিশ ইন্সপেক্টর একাকী থাকতেন তাঁর কাছেই মালতীর স্থান হয়। জেলের মধ্যে মালতীর মনে পড়ত ওই দেড় বছরের শিশুটির মুখখানি। কী ঘটেছিল সেদিন? হরেন তাঁর স্ত্রী শ্বেতার বাবার কাছে থেকে তাঁর বসত ভিটে মাটিটি অধিকার করতে চেয়েছিল। প্রতি মাসেই স্ত্রীকে বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য অত্যাচার করত। শ্বেতা তার বৃদ্ধ বাবার আর্থিক অবস্থা খুব ভাল করেই জানত। তার ভাই একটা কাজের জন্য ঘোরাঘুরি করে কিন্তু সেরকম কোনো চাকুরি পায়নি কাজেই একটা হোটেলে কাজ করে। যা পায় তা দিয়েই সংসার কোনো রকম চলত। শ্বেতা শেষের দিকে ঠিক করেই নিয়েছিল আর কোনো অর্থ তার বাবার কাছে চাইবে না। শুরু হলো হরেনের সাথে শ্বেতার চরম অশান্তি। কী হয়েছিল সেদিন? দুপুরবেলায় চরম অশান্তি হরেন শ্বেতাকে বেশ মারধর করে, শ্বেতা সিঁড়ি থেকে পরে পরে যায়, মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল। হরেন বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। শ্বেতাকে  সেখান থেকে উদ্ধার করে এই মালতী। ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে শ্বেতা পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, মালতী ছিল রান্নাঘরে, আর শ্বেতা তার ছেলেকে নিয়ে নিজের ঘরে শুয়ে ছিল আর হরেন তাকে মাথার চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে বিছানা থেকে নামিয়ে গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে দেয়। দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়। একদিকে শ্বেতার আর্তনাদ অন্য দিকে মালতীর চিৎকার। হরেন মালতীকে এবার মেরে ফেলার জন্য এগোতে থাকে নিজের প্রাণ বাঁচাতে মালতী বটি উঁচিয়ে ধরে হরেন পালাতে যায় শ্বেতা তখন বাঁচার জন্য হরেনকে জড়িয়ে ধরে আর সে তাকে বাড়ির পেছনের কলাবাগানে দোতলার বারান্দা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ততক্ষণে তার গায়ে আগুন ধরে গিয়েছে। মালতী ছোট্ট সৌভিককে কোলে নিয়ে বেরোবে ঠিক সেই সময় লোকজন এসে পরে। সৌভিক বড় হয়ে গেছে এখন। একটা কোম্পানিতে চাকুরি করে। কিন্তু বাড়িতে আসে কম। মালতী শেষ বয়সে সৌভিকের কাছেই থাকত। একটা মানসিক কষ্ট, আর ক্ষীণ শরীরে একদিন বিদায় নিলো সকলের কাছ থেকে।
 

সমাপ্ত

1 comment:

  1. গল্পটিতে কোন প্যারাগ্রাফ নেই কেন?

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)