বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/১৮ই আশ্বিন,
১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়
ক্ষমা
[২য় পর্ব]
"ডাকো বহুকে, আমি ক্ষমা চাইব ওর কাছে। আজ এক দেবীর জন্য আমি জীবন ফিরে পেয়েছি, বিশ্বাস হচ্ছে না বিটি।রং, ধর্ম দিয়ে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। কত অপমান করে তাকে অসম্মান করেছি। বহু আমাকে ক্ষমা না করলে, আমার মরেও প্রায়শ্চিত্ত করা হবে না।"
পূর্বানুবৃত্তি
- ছিঃ ছিঃ শেষ পর্যন্ত
একটা কালুয়া মেয়ে। সাদা মেয়ে পেলে না? ওর মা কাঁদতে কাঁদতে ঘরে
ঢুকে গেলেন। ওর বোনেরাও আমার দিকে এক ঘৃণার দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে মা-এর পিছন পিছন চলে
গেল। ওর বাপুজি চিৎকার করে উঠলেন, “বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে। আমি জানব আমাদের কোন পুত্র সন্তান নেই।” বলে তিনি আমাদের মুখের ওপর জোরে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমরা
বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম বাইরে। পঁয়ত্রিশ ঘন্টা জার্নি করার
পরেও প্রায় এক ঘণ্টার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকাতেও যখন আর দরজা খোলা পেলাম না, আমি তখন অশোককে বললাম, “তুমি তোমাদের
পরিবারের একমাত্র পুত্র, তুমি থাকো। আমি হটেলে থাকছি। নো
প্রবলেম, অশোক। তাহলে ওনারা বুঝতে পারবেন যে, আমরা হাজব্যান্ড ওয়াইফ নই।”
- অশোক আর কোন কথা
বলতে পারল না। আমার হাত ধরে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে নিয়ে গেল। সেখানে ট্যাক্সি নিয়ে
সোজা ওবেরয় হোটেলে উঠলাম। রিটার্ন টিকিটের জন্য
অপেক্ষা করতে আমরা বন্ধুর মতো এক সপ্তাহ হোটেল থেকে আর নাগপুরের সাইট ভিউ দেখে, ফিরে এলাম। হ্যাঁ নিজেকে খুব অপরাধী
মনে করতে লাগলাম। আর অশোক? একেবারে চুপচাপ হয়ে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে আর কথা বলতে পারত
না। ইতিমধ্যে আমি চাকরি পেয়ে গেলাম ব্যটন
রুজ 'লেডি অফ দ্য লেক' প্রাইভেট হসপিটালে। আর অশোক পিএইচডি শেষ করবার জন্য আদা জল খেয়ে
লেগে পড়ল। দুজনেই ব্যস্ত হবার জন্য আমাদের দেখা সাক্ষাতের সময় প্রায় হত না, বলা যায়। তখন মোবাইল ফোনের চল ছিল না।
কিন্তু একদিন হঠাৎ অশোকের ফোন আমার এপার্ট্মেন্টের ফোনে। জানাল, সে খুব সিক হয়ে পড়েছে। আমি
ওকে আর হস্পিটালাইজড করিনি। মেন্টালি ডিপ্রেজড মনে হল সব দেখে। কাজের শেষে ওর
ডর্মে এসে দেখাশুনা করতে লাগলাম। একদিন খুব ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে, ও খুব ঘুমাচ্ছে ভেবে আমি
যেই আস্তে করে বেরিয়ে আসছিলাম, আমাকে ডেকে হঠাৎ, “নিকি- আই ওয়ান্ট টু ম্যারি ইউ”।
আমি বলেছিলাম, “বাট আই উইল নট।”
“হোয়াই নিকি? আমাকে এতদিনেও চিনতে পারোনি? আমি কিচ্ছু শুনব না। আমি ভাল হয়ে গেলেই তোমাকে বিয়ে করব। তুমি তোমার প্যারেন্টদের জানিয়ে দাও। এটাই আমার ফাইনাল কথা।”
আমি আমার মা-বাবাকে বলাতে তারা বললেন, “আমাদের এই কালো রংকে পৃথিবীর কেউ ভালবাসে না। তুমি এত ভাল মেয়ে সব দিকে আর এটা বোঝো না? নিজের লাইফ স্পয়েল কোরো না, প্লিজ। আমাদের বান্ধবী হেজ ফ্যামিলি ইন্ডিয়ান বিয়ে করে বাচ্চা নিয়ে আজ একা আছে। এরা গ্রিন কার্ড পাবার জন্য আমাদের বিয়ে করে নিকি। বোঝো একটু।”
আমি চিন্তা করতে লাগলাম। তারপর অশোক ভাল হয়ে যাবার পর আবার আমাকে ফোর্স করতে শুরু করে। শেষে বলে, “চলো আমি তোমার মা-বাবার কাছে নিজে যাব।”
ওনারা তো অশোককে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন।
- সে তো হবেনই অশোক হ্যান্ডসাম, স্মার্ট আর সবার ওপরে ভদ্র খুব।
অর্ক বলে ফেলল।
- এক্সজ্যাক্টলি অর্ক। তবে আমি ওকে কষ্ট দিইনি কারণ জানলাম ও মেন্টালি ডিসব্যালান্সড তখনও। তাই ওকে বিয়ে করব বলে দিলাম আমার প্যারেন্টদের। আমাদের কান্ট্রিতে ছেলেমেয়ে যাকে উপযুক্ত মনে করবে তাকেই লাইফ পার্টনার করে। তাই বিনা দ্বিধায় আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। দুই মতেই বিয়ে হল- ক্রিস্টান এবং গুজরাতি। তখন আমি অবশ্য পুরোপুরি গুজরাটি বলেই -হেসে ফেলল।
“ফ্রম টুডে উই আর ইন দ্য সেম বোট টুগেদার অশোক। অ্যান্ড টুগেদার ফর দ্য হোল
লাইফ।" বলে প্রমিস করলাম। আমরা আস্তে আস্তে নিজেদের
সেটেল্ড করলাম। বাড়ি, গাড়ি কিনলাম। দু বছর পর আমাদের বেবি গার্ল হল।”
মাঝখানে অশোক বলে উঠল, “আমার একটাই ভয় ছিল শুধু, নিকির ব্যাপারে কোনদিন যেন কোন ভুল সিদ্ধান্ত না নিই।”
- কিন্তু নিকি এটা
কিন্তু ভারী অন্যায় বেবিকে আনোনি কেন? রিম্পি কথার মাঝে বলে উঠল।
- না ওকে ওর গ্র্যান্ড প্যারেন্টদের কাছে রেখে এসেছি। জানো নিশ্চয়ই আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। কাজেই শি ইজ দেয়ার লাইফ।
- ওর নাম কী?
অর্ক জিজ্ঞেস করল।
- অশোকা, বলেই মিষ্টি করে হাসল নিকি। দেখতে হুবহু অশোকের মতো হয়েছে খালি চুলটা আমার মতন। একদিন নিয়ে আসব ওকে। আর না হয় আমাদের বাড়িতেও তোমরা এসো নেক্সট লঙ উইকন্ডের শনিবারে। জানো তো এইবার দেশে যাব বলেছি অশোকাকে নিয়ে। দেখা যাক ওনারা মেনে নেন কিনা?
হঠাৎ একদিন নিকির ফোন- কাঁপা
গলায় "অশোকের বাবা খুব
সিরিয়াস। ওর বড় বোন জানিয়েছে, হার্ট সার্জারি করতে অনেক টাকার
দরকার।" আমরা দেশে যাচ্ছি।
বললাম ওখানে গিয়ে অশোকের বাবা কেমন আছেন জানিয়ে ফোন কোরো, প্লিজ। চিন্তায় থাকব আমরাও।
খটাস করে ফোন রেখে দিল নিকি।
একদিন ফোন এলো নাগপুর থেকে অশোকের যে, “ফ্রেন্ডস! বাপুজি ভাল আছেন। মা আর বোনদের কাছে জিজ্ঞেস করেছেন, এত টাকা জোগাড় হল কীভাবে?
ওরা বলেছে "নিকি ভাবী সব ব্যবস্থা করেছে। সে তো নামকরা
নার্স আমেরিকায়, বাপুজি। এই দেখো ভাইয়ার মেয়ে অশোকা।" মা তখন মুখ টিপে হাসছেন।
- ডাকো বহুকে, আমি ক্ষমা চাইব ওর কাছে। আজ এক দেবীর জন্য আমি জীবন ফিরে পেয়েছি, বিশ্বাস হচ্ছে না বিটি। রং, ধর্ম দিয়ে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। কত অপমান করে তাকে অসম্মান করেছি। বহু আমাকে ক্ষমা না করলে, আমার মরেও প্রায়শ্চিত্ত করা হবে না।
- আমি ভিতরে গেলে দুই হাত ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন উনি। আমরা সবাই ভাল আছি ফ্রেন্ডস। তোমরা ভাল থেকো। তোমাদের জন্য কী নিয়ে যাব, জানিও। আমাদের তো আরো একবার বিয়ে হল এখানে। বলে হি হি করে হেসে উঠল সেই যুদ্ধজয়ী মেয়ে।
চোখে জল এসে গেল অর্ক-এর। রিম্পিকে বলল, "মহাসিন্ধুর পাড়ে বসেই দেখলাম আষাঢ়-শ্রাবণের অবিশ্রান্ত ধারা। সূচীভেদ্য অন্ধকারের মধ্যেও প্রত্যক্ষ করলাম কী তীব্র আলোর ঝলকানি।"
আমি বলেছিলাম, “বাট আই উইল নট।”
“হোয়াই নিকি? আমাকে এতদিনেও চিনতে পারোনি? আমি কিচ্ছু শুনব না। আমি ভাল হয়ে গেলেই তোমাকে বিয়ে করব। তুমি তোমার প্যারেন্টদের জানিয়ে দাও। এটাই আমার ফাইনাল কথা।”
আমি আমার মা-বাবাকে বলাতে তারা বললেন, “আমাদের এই কালো রংকে পৃথিবীর কেউ ভালবাসে না। তুমি এত ভাল মেয়ে সব দিকে আর এটা বোঝো না? নিজের লাইফ স্পয়েল কোরো না, প্লিজ। আমাদের বান্ধবী হেজ ফ্যামিলি ইন্ডিয়ান বিয়ে করে বাচ্চা নিয়ে আজ একা আছে। এরা গ্রিন কার্ড পাবার জন্য আমাদের বিয়ে করে নিকি। বোঝো একটু।”
আমি চিন্তা করতে লাগলাম। তারপর অশোক ভাল হয়ে যাবার পর আবার আমাকে ফোর্স করতে শুরু করে। শেষে বলে, “চলো আমি তোমার মা-বাবার কাছে নিজে যাব।”
ওনারা তো অশোককে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন।
- সে তো হবেনই অশোক হ্যান্ডসাম, স্মার্ট আর সবার ওপরে ভদ্র খুব।
অর্ক বলে ফেলল।
- এক্সজ্যাক্টলি অর্ক। তবে আমি ওকে কষ্ট দিইনি কারণ জানলাম ও মেন্টালি ডিসব্যালান্সড তখনও। তাই ওকে বিয়ে করব বলে দিলাম আমার প্যারেন্টদের। আমাদের কান্ট্রিতে ছেলেমেয়ে যাকে উপযুক্ত মনে করবে তাকেই লাইফ পার্টনার করে। তাই বিনা দ্বিধায় আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। দুই মতেই বিয়ে হল- ক্রিস্টান এবং গুজরাতি। তখন আমি অবশ্য পুরোপুরি গুজরাটি বলেই -হেসে ফেলল।
মাঝখানে অশোক বলে উঠল, “আমার একটাই ভয় ছিল শুধু, নিকির ব্যাপারে কোনদিন যেন কোন ভুল সিদ্ধান্ত না নিই।”
- না ওকে ওর গ্র্যান্ড প্যারেন্টদের কাছে রেখে এসেছি। জানো নিশ্চয়ই আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। কাজেই শি ইজ দেয়ার লাইফ।
- ওর নাম কী?
অর্ক জিজ্ঞেস করল।
- অশোকা, বলেই মিষ্টি করে হাসল নিকি। দেখতে হুবহু অশোকের মতো হয়েছে খালি চুলটা আমার মতন। একদিন নিয়ে আসব ওকে। আর না হয় আমাদের বাড়িতেও তোমরা এসো নেক্সট লঙ উইকন্ডের শনিবারে। জানো তো এইবার দেশে যাব বলেছি অশোকাকে নিয়ে। দেখা যাক ওনারা মেনে নেন কিনা?
বললাম ওখানে গিয়ে অশোকের বাবা কেমন আছেন জানিয়ে ফোন কোরো, প্লিজ। চিন্তায় থাকব আমরাও।
খটাস করে ফোন রেখে দিল নিকি।
একদিন ফোন এলো নাগপুর থেকে অশোকের যে, “ফ্রেন্ডস! বাপুজি ভাল আছেন। মা আর বোনদের কাছে জিজ্ঞেস করেছেন, এত টাকা জোগাড় হল কীভাবে?
- ডাকো বহুকে, আমি ক্ষমা চাইব ওর কাছে। আজ এক দেবীর জন্য আমি জীবন ফিরে পেয়েছি, বিশ্বাস হচ্ছে না বিটি। রং, ধর্ম দিয়ে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। কত অপমান করে তাকে অসম্মান করেছি। বহু আমাকে ক্ষমা না করলে, আমার মরেও প্রায়শ্চিত্ত করা হবে না।
- আমি ভিতরে গেলে দুই হাত ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন উনি। আমরা সবাই ভাল আছি ফ্রেন্ডস। তোমরা ভাল থেকো। তোমাদের জন্য কী নিয়ে যাব, জানিও। আমাদের তো আরো একবার বিয়ে হল এখানে। বলে হি হি করে হেসে উঠল সেই যুদ্ধজয়ী মেয়ে।
চোখে জল এসে গেল অর্ক-এর। রিম্পিকে বলল, "মহাসিন্ধুর পাড়ে বসেই দেখলাম আষাঢ়-শ্রাবণের অবিশ্রান্ত ধারা। সূচীভেদ্য অন্ধকারের মধ্যেও প্রত্যক্ষ করলাম কী তীব্র আলোর ঝলকানি।"
সমাপ্ত

দারুণ লাগল গল্পটা
ReplyDelete