বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য়
বর্ষ/২১তম সংখ্যা/১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩১
ধারাবাহিক উপন্যাস
পারমিতা চ্যাটার্জি
শেষ থেকে শুরু
[৭ম পর্ব]
"তা আমি জানি না। তারপরই হঠাৎ ওকে গভীর আবেগে কাছে টেনে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে চোখ, ঠোঁট, গলা আকুল চুম্বনে ভরিয়ে দিতে লাগল, এই আমার ভালবাসা, এই আমার সব, তোর জন্যই আমার অপেক্ষা ছিল রে শুধু বুঝতে দেরি হয়ে গেলো।"
পূর্বানুবৃত্তি তার চেহারার ঔজ্জ্বল্যতা হয়তো সন্ধ্যাবেলার নিভু নিভু দীপশিখার
মতন। কিন্তু ভালবাসায় ভরপুর, সেই স্নিগ্ধ শান্ত
সৌন্দর্য তার চোখের আকুলতাকে বার বার ঠেলে সরিয়ে দিয়ে উচ্ছল ঝর্নার দিকে না এগোনই
ভাল। যে ঝর্নার পাথুরে আঘাতে তার মন একদিন ছিন্নবিছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তারপর…
ক্রমশ রাহুলের গাড়ি ছুটে
চলেছে শান্তিনিকেতনের দিকে। গুসকরা পার হয়ে গেলো আর কিছুটা এগোলেই বোলপুর। কোপাই
নদীর কাছে এসে গাড়ি একটু থামাল। আকাশে আজ পূর্ণ চাঁদ রাহুল নামল কোপাইয়ের ধারে।
নেমে গেলো তরতর করে নদীর একদম কাছে। পাথর কেটে কেটে তিরতির করে এগিয়ে যাচ্ছে নদীটা
রাহুল দেখল চাঁদের ছায়াটা স্থির হয়ে আছে, বড় শান্ত রূপ তার।
মনে হলো কোথায় যেন চাঁদের এই ছায়ার সাথে মিল আছে সুচরিতার। একান্ত নীরব নীরবতার
মধ্যে দিয়ে পরিপূর্ণ তার হৃদয়ের ভালবাসা।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল, রাহুল দেখল সুচরিতার ফোন।
ছেলেমানুষের মতন উচ্ছ্বসিত হয়ে রাহুল, আমি আসছি সুচি আমি
এখনই আসছি। আমাকে যে আসতেই হবে তোমার কাছে। সুচরিতা কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে গেলো তার
বউয়াদার উচ্ছ্বসিত গলা শুনে ভাবল, এতদিনে কি তার অপেক্ষার
দরজায় সত্যি বসন্তের বাতাস লাগল? কিন্তু মনকলিও যে অনেক আশা নিয়ে পুরুলিয়ায় গেলো চাকরি নিয়ে, ওকে তো
সুচরিতাই বলেছিল যে তোর ভালবাসা এখনও তোর অপেক্ষায় আছে, তোকে
শুধু খুঁজে নিতে হবে।
কিন্তু সে কী করবে! তার তো কিছু করার নেই
তখনও পর্যন্ত সে তো জানত বউদার মন জুড়ে শুধু মনকলি আছে। তাই
সেদিন তার প্রেম মর্যাদা পায়নি বউয়াদার কাছে, আজ সে কী করবে! কিছু তো করার নেই কিছুটা অপমানের সাথে হলেও বউয়াদা সত্যি তাকে ভালবাসা অর্পণ
করে তবে তা ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই।
একটু পরেই বেল বাজল তার মানে
বউয়াদা এসে
গেছে। শান্ত ধীর পায়ে গিয়ে সে দরজা খুলে দিলো, রাহুল প্রথমে
একটু দাঁড়াল তারপর এগিয়ে এসে দুহাতে সুচরিতাকে বুকের কাছে টেনে আনল তারপর তার
মুখটা দুহাতের তালুতে ধরে বলল, আমাকে গ্রহণ করবে তো?
আমি তোমার কাছ থেকে দূরে
গিয়ে বুঝতে পারলাম মনটা আমার পুরোপুরি বদলে গেছে। উচ্ছল দাম্ভিক কোনো মুখের আড়াল
থেকে একটা শান্ত স্নিগ্ধ সুন্দর দুটো কালো চোখের মায়াভরা দৃষ্টি ভেসে উঠছে। মনে
হলো তখন, উচ্ছল
ঝর্ণা পাহাড়ের অনেক বাঁকের ফাঁকে হারিয়ে যায় কী শান্ত নদীটা তিরতির শব্দে বয়ে চলে।
সে সুচরিতাকে দুহাতের
আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বলল,
নেবে তো আমায়? সুচরিতার এতদিনে বাঁধ ভেঙে
গেলো, সে বউয়ার
বুকে মাথা রেখে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ল। বউদা তার মাথায় হাত রেখে বলল, আমার এ ভালবাসা অন্তর থেকে উঠে আসা পবিত্র ভালবাসা। কিন্তু মনকলিকে কী বলবে বউয়াদা? আমার তো কিছু জবাব দেওয়ার নেই সুচরিতা,
আর কেনই বা জবাব দেবো বলো তো? হয়তো তুমি বলবে
আমিই বা কেন আসব তোমার কাছে? জবাবে আমি বলব আমি তোমাকে কোনো
অসম্মান করিনি বা বলিনি যে তুমি আমার যোগ্য নও খুব শান্তভাবে নিজের কথা
জানিয়েছিলাম। আসলে রোজ তোমাকে দেখতাম বলে বা তোমার হাতের প্রচুর যত্ন পেতাম বলে
হয়তো নিজের মনকে বুঝতে পারিনি, ধরে নিয়েছিলাম এ যত্ন গভীর
বন্ধুত্বের অঙ্গীকার। কিন্তু যে মুহূর্তে তোমাকে ছেড়ে চলে এলাম তখন শুধু তুমি আমার
মনে জুড়ে বসলে, মনকলি কোথায় হারিয়ে গেলো। নিজেকে নিজে
বলছিলাম, 'এ আমি কী করলাম! নিজেকে নিজে
বুঝতে পারিনি আর পারলাম না আর একজনের গভীর ভালবাসার মর্যাদা দিতে। তখুনি তোমার কাছে আসতে পারছিলাম না কারণ লজ্জা আর অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছিলাম। যে নিজে এসে
ভালবাসার কথা জানিয়েছিল তাকে কেন ফিরিয়ে দিলাম! বড় বোকা আমি নিজেই বুঝিনি নিজেকে, আর একজনের ভালবাসায় মূল্য দিতে পারলাম না। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবে না তো!’
কী করে ফিরিয়ে দিই বলো তো! সেই কোন ছোটবেলা থেকে ভালবেসে আসছি, আজ যখন
সে নিজে এসে কাছে দাঁড়িয়ে আছে তাকে ফিরিয়ে দেবার মতন ক্ষমতা আমার নেই। শুধু মনকলির
সাথে বন্ধুত্বটা হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে।
কেন? আমার জন্যে? আমার মনের ঘরটা যে ছোট সে ঘর থেকে একবার কেউ বেরিয়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার
ঢোকার জায়গা থাকে না।
কিন্তু আমি যে ওকে
বলেছিলাম, বউয়াদা
এখনও তোর অপেক্ষায় আছে, তুই পুরুলিয়ায় যা খুব সম্ভব বউয়াদা
পুরুলিয়া গেছেন।
আচ্ছা সুচরিতা এ উত্তরের
ভারটা তুমি আমার ওপর দাও,
যা সত্যি আমি তাই বলব আর তুমি যে নির্দোষ তাও বলব যদিও এত কিছু বিশ্লেষণ
করে বলার জন্য আমরা বাধ্য নই ওর কাছে। বউয়া সুচরিতাকে আরও কাছে টেনে ওরা কপালে পরে
থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বলল, কী মেয়ে-রে বাবা! কখন এসেছি এতটা পথ ধরে, এক কাপ চাও দিলো
না। আবেশে সুচরিতার চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল, বউয়াদার কথা শুনে নিজেকে
ছাড়িয়ে নেবার জন্য ছটপট করে উঠে বলল, আরে এরকম করে ধরে রাখলে
চা করব কী করে?
তা আমি জানি না। তারপরই
হঠাৎ ওকে গভীর আবেগে কাছে টেনে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে চোখ, ঠোঁট, গলা
আকুল চুম্বনে ভরিয়ে দিতে লাগল, এই আমার ভালবাসা, এই আমার সব, তোর জন্যই আমার অপেক্ষা ছিল রে শুধু
বুঝতে দেরি হয়ে গেলো।
ভাল লাগায় সুচরিতার মুখ
ঢলে পরেছিল বউয়াদার বুকের ওপর, মনে হচ্ছিল তার কোনো জ্ঞান নেই। জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে
বলল শুধু আদরে পেট ভরবে না, চা-টা করে
আনি আগে।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment