প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, December 11, 2024

বহ্নিশিখা [৩য় পর্ব] | অপূর্ব দাশগুপ্ত

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক গল্প/২য় বর্ষ/২তম সংখ্যা/১২ই পৌষ, ১৪৩১

মোহন রায়হান সংখ্যা | ধারাবাহিক গল্প

অপূর্ব দাশগুপ্ত

বহ্নিশিখা

[৩য় পর্ব]


"তিমির ফোন কানে নিতেই শুনতে পায় মুনিয়ার হাসি। হাসতেই থাকে বহুক্ষণ। শেষে কোনক্রমে হাসি থামিয়ে বলে, দ্বৈপায়ন এসেছিল জানিস। কী অদ্ভুত না? এতদিন পরে কোথা থেকে এসে হাজির। আমার জন্যে কত মায়া এখনো জানিস?"



পূর্বানুবৃত্তি হায়ারসেকেন্ডারির টেস্ট পরীক্ষা থেকেই মুনিয়ার রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে। যে মেয়ে পরীক্ষায় প্রথম হত, হায়ারসেকেন্ডারিতে সে পাস করে তৃতীয় বিভাগে। তমালরা অনেকেই কলকাতায় ভর্তি হতে যাবে। মুনিয়া পণ করেছে সে আর পড়বে না। খবরটা শুনে তিমির আজ ছুটে আসে। মুনিয়া তার ঘরে বসে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে। দু চোখ দিয়ে জল ঝরছিল আগে থেকেই। তিমিরের কথায় সে কোলে মাথা গুঁজে নিলো। তারপর...
 
বছরদুয়েক পরে তিমির পুজোর ছুটিতে বাড়ি ফিরে শুনল যে মুনিয়ার বাবা ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে আসামে চলে গেছেন। মুনিয়ার বিয়ে হয়েছে কলকাতায়। বর পোস্টেড শিলং শহরে। সেখানেই মুনিয়া বরের সঙ্গে আছে। তিমিরদের কোন বন্ধুকেই মুনিয়া তার বিয়ের খবর জানায়নি। তিমিরের মনটা খারাপ হয়ে যায়। নিবিড় দুঃখবোধ থেকে মুনিয়া ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল কী? কে জানে! গ্র্যাজুয়েশনটা পর্যন্ত করল না। পুজোর ছুটিতে তিমির বাড়ি ফিরেছে অনেক দিন পরে। অন্যান্য বন্ধুরা ছুটে আসে। হই হই করে পুজোর দিনগুলি কাটে, কিন্তু তিমিরের মনটা একটু বিগড়েই থাকে। সে ঘুরপথে লাইব্রেরি যায়, যাতে মুণিয়াদের বাড়ি আর চোখে না পড়ে তার।
 
জীবন কেটে যায় জীবনের নিয়মমাফিক, বাঁধাধরা পথে। তিমির ফিজিক্সে সাম্মানিক নিয়ে পাস করে ভারতীয় স্টেট ব্যাংকে চাকরি পায়। বিয়ে করে, প্রমোশন পায়, ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতে থাকে ঘনঘন। এরই মধ্যে ছেলেমেয়ে মানুষ করা, বদলি আটকাতে দৌড়াদৌড়ি করা, ছাপোষা জীবন কাটে তিমিরের।
একদিন মেয়ের কী একটা বইয়ের খোঁজে তিমির গিয়েছিল কলেজস্ট্রিট। সেই কলেজ জীবনের প্রেসিডেন্সি কলেজের গেটে দ্বৈপায়নের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়।
-দ্বৈপায়ন দা!
-তিমির না? রীতিমতো জেন্টলম্যান, সেই রোগা ছেলেটার এই হাল, ভাবা যায় না।
হাতে সময় ছিল দুজনেরই, দুজনে কফিহাউসে বসে।
-সংসার করেছ দ্বৈপায়ন দা?
-হুমম, একটি মেয়ে।
সেই ফেলে আসা দিনগুলির কথা হয়। তিমির খবর দেয়,
-মুনিয়ার শিলংয়ে বিয়ে হয়েছিল, জানো দ্বৈপায়ন দা।
-তুই খোঁজ রাখিস ওর।
-না, চেষ্টা করেছি পারিনি। ফেসবুকে খুঁজেছি, নেই। বন্ধুদের কারও সঙ্গে ও যোগাযোগ রাখেনি।
দ্বৈপায়ন চুপ করে থাকে। শেষে বলে,
-ফোন নম্বরটা দে তোর। একটা মিসডকল করে রাখ। আমি পরশু ফিরব ব্যাঙ্গালোর। আসিস একবার। ফোন করিস।
অবসরের পর কলকাতা থেকে সাময়িক বিদায় নিয়ে তিমির তার সেই অখ্যাত ভিটেবাড়িতে মাঝে মাঝে ফেরে। অতবড় বাড়ি আজ খাঁ খাঁ করে। মা-বাবা চলে গেছেন। শূন্য বাড়ি সামলে রাখে পুরোনো এক মালি। এ বাড়ি আর রাখা যাবে না। বিক্রি করে দিতে হবে। এখানেও কত নতুন আধুনিক ধারায় বাড়ি হয়েছে। তাদের বাড়িটি এখনও টিনের চাল আর কাঠের দেওয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর সংস্কার করেও লাভ নেই।
তিমির বসেছিল খাটে। জানালার পাশে। লোহার শিকের ফ্রেমে বাঁধানো আকাশ দেখা যাচ্ছে। সন্ধ্যা নামছে। দপ করে বিদ্যুৎ চলে যায়। তিমির আলোর ব্যবস্থা কী করবে ভাবছে, এমন সময় ফোন বেজে ওঠে। অচেনা নম্বর।
-তিমির কাকুর সঙ্গে কথা বলছি?
-হ্যাঁ, আমি তিমির।
-আমি বহ্নিশিখা চক্রবর্তীর ছেলে, নীলয়।
-বহ্নিশিখা? তুমি মুনিয়ার ছেলে?
-মা কথা বলবে, ধরুন। কদিন থেকে আপনাদের কথাই বলছে কেবল।
এতদিন পর মুনিয়া কথা বলতে চাইছে। ফোন নম্বর জোগাড় করল কেমন করে?
তিমির ফোন কানে নিতেই শুনতে পায় মুনিয়ার হাসি। হাসতেই থাকে বহুক্ষণ। শেষে কোনক্রমে হাসি থামিয়ে বলে,
-দ্বৈপায়ন এসেছিল জানিস। কী অদ্ভুত না? এতদিন পরে কোথা থেকে এসে হাজির। আমার জন্যে কত মায়া এখনো জানিস?
তিমির বলে,
-তাই? তোর খবর বল? আমি এখন এসেছি লতাবাড়িতে।
-আমার আর কী খবর। বরের সঙ্গে তো অনেকদিন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ছেলের কাছে থাকি, বুঝলি। খুব শরীর খারাপ রে আমার। বিছানাতে জীবন কাটছে।
এই কথা বলে সে আবার হাসতে থাকে, যেন বরের না থাকা, শয্যাশায়ী থাকা সব খুব হাসির কথা।
-দ্বৈপায়ন আসাতে তোর কথা খুব মনে পড়ল। ফোন নম্বর জোগাড় করলাম তোর। আমাদের বাড়িটা আছে রে টিকে?
-আছে।
-তুই এখন থাকিস কোথায় মুনিয়া, শিলংয়ে নয় নিশ্চয়ই।
-না রে, কলকাতায়, লেকটাউনে।
-আমি কলকাতা ফিরে তোর সঙ্গে দেখা করতে যাব একদিন। ফোন করব।
-আমাকে দেখে তোর ভাল লাগবে না তিমির। দ্বৈপায়ন বলছিল, খুব খারাপ দেখতে হয়েছি নাকি।
-শোন মুনিয়া, লাইট নিভে গেল হঠাৎ। আজ ছাড়ছি। আমি কাল ফোন করছি তোকে।
পরদিন আর ফোন করা হয়নি।
পরের দিন আবার সেই পাগলা হাওয়া উঠেছে, সেই আগের মতো। এত জায়গায় কাটালো তিমির, এমন হাওয়া কেবল এখানেই বয়। বড় মনখারাপ আমদানি করে পাগল করা উদাসী এই হাওয়া।
সন্ধ্যাবেলা মুনিয়ার ছেলের ফোন আসে। সে বলে,
-মা গতকাল গায়ে আগুন দিয়েছে কাকু। আমরা বাড়ি ছিলাম না… তখন।
তিমির প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে
-কী করে? কেন?
-মা তো বহুদিন অসুস্থ। অসংলগ্ন কথা বলত ইদানীং। শরীর ঠিক ছিল না। তোমাদের কথা শেষেরদিকে বলত খুব।
-দ্বৈপায়নদা এসেছিল কবে? মানে কতদিন আগে?
-এরকম কেউ আসেনি তিমিরকাকু। এই নাম আমিও প্রথম শুনলাম মায়ের মুখে।
কী আর বলে তিমির। চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ, শেষে বলে,
-সাবধানে থেকো তোমরা। তোমার মা আমার খুব বন্ধু ছিল, জানো। ফোন করো, যোগাযোগ রেখো।
 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)