ধারাবাহিক গল্প
অপূর্ব দাশগুপ্ত
বহ্নিশিখা
[২য় পর্ব]
"নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে উঠে গিয়ে দেরাজ খুলে একটা চিঠি এনে তিমিরের হাতে দেয়। দ্বৈপায়নের চিঠি।
মাসখানেক আগে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দ্বৈপায়ন কী এক ডিগ্রি নিতে চলে গিয়েছে দিল্লিতে। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিল সে। মুনিয়ার থেকেও। তিমিররা এক সন্ধ্যায় তাকে বিদায় জানিয়েছে অনুষ্ঠান করে। মুনিয়ার গান গাইবার কথা ছিল। সে আসেনি সেদিন। দ্বৈপায়ন বলেছিল, -মুনিয়া এলো না, তিমির?"
পূর্বানুবৃত্তি
এক এক দিন হাওয়া ওঠে পাগলের মতো। শুকনো যত পাতা, অশ্বত্থ, বাঁশ, পেয়ারা
আর যত সব হাবিজাবি, ছেঁড়া কাগজের টুকরো, ন্যাকড়া, এইসব নিয়ে মশকরা করে এলোমেলো
হাওয়ার স্রোত। এ এক গঞ্জ এলাকা। যথেষ্ট দূরত্ব রেখে গৃহস্থদের বাড়িগুলি শান্ত
দাঁড়িয়ে থাকে।মুনিয়াদের বাড়িটির শ্রী একটু আলাদা, অন্য
বাড়িগুলির চেয়ে বেশি সুন্দর। তারপর…
দূর মফস্সলের এই অঞ্চলটির মানুষগুলির মধ্যে জটিলতা কম। সংসার আর রোজগার করতে গিয়ে মানুষকে স্বাভাবিক সারল্য কিছুটা বাঁধা রাখতে হয়েছে, যেমন হয়ে থাকে মানুষের সমাজে, তবু তুলনায় এখানকার মানুষেরা সাদাসিধে। খবর
দূর মফস্সলের এই অঞ্চলটির মানুষগুলির মধ্যে জটিলতা কম। সংসার আর রোজগার করতে গিয়ে মানুষকে স্বাভাবিক সারল্য কিছুটা বাঁধা রাখতে হয়েছে, যেমন হয়ে থাকে মানুষের সমাজে, তবু তুলনায় এখানকার মানুষেরা সাদাসিধে। খবর
কাগজ পড়ে, রেডিও শোনে, রবিবারে রবিবারে ভাল করে বাজার করে।
বেশিরভাগ মানুষ ব্যবসা করে, কেউ কেউ চাকুরিজীবী, স্কুলে, সরকারি নানা দপ্তরে তারা রুজির
জন্য যায়। একটু সম্পন্ন ঘরের কর্তারা ছেলেমেয়েদের বলেন, পড়, পড়। ভাল পাস করলে কলকাতায়
পড়াব। কলকাতা বড় দূরের। বড়ই রহস্যের জায়গা, বুদ্ধিমানেদের জায়গা এদের কাছে। কেউ
কলকাতা ঘুরে এলে, এরা তাকে ঘিরে ধরে। বলে, কোথায় কোথায় গেলে? কালিঘাট গিয়েছিলে,
পার্টি পলিটিক্সের হালচাল কী, যুক্তফ্রন্ট টিকবে মনে হয়?
গঞ্জে সম্প্রতি একটা হেলথ সেন্টার খুলেছে। ডাক্তারও এসেছে একজন, কলকাতার ছেলে, একেবারে নবীন যুবক। ডঃ দ্বৈপায়ন বসুর নায়কদের প্রায় সব গুণাগুণ আয়ত্বে। চেহারাও দেখবার মতো। সে কী না পারে! তিমিরদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে নেমে পড়ে। কথা বলে মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তার চিকিৎসায়, তার ব্যবহারে লোকজন খুশি। ফাংশনে সে গাইল, 'মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান।' ছেলেমেয়েরা সকলেই মুগ্ধ হয়। মেয়েরা একটু বেশি। তিমির আর তার বন্ধুদের সঙ্গে তার খুব জমে যায়।
তিমির ডঃ বসুর অবসরে তার কোয়ার্টারে যায়। তিমিরের সঙ্গে আড্ডা মারতে দ্বৈপায়নেরও ভাল লাগে। একদিন তিমির গিয়েছে দ্বৈপায়নের সান্নিধ্য পেতে। এটা-সেটা কথার পর দ্বৈপায়ন বলে,
-তিমির তোর শালা মাগি পটানো চোখ।
তারপর বের করে রং ও তুলি, বলে, একটু মুখটা ঘুরিয়ে বোস।
-আপনি ছবিও আঁকেন?
-আরে তেমন কিছু নয়, মাঝে মাঝে সা রে গা মা বাজিয়ে নিই।
তিমির গলায় মজা ঢেলে বলে,
-আপনাকে নাকি রোজ সন্ধ্যায় মুনিয়াদের বাড়িতে দেখা যাচ্ছে?
দ্বৈপায়ন ঘাবড়ে যায় না। একটু চুপ করে থাকে, সামান্য বিষণ্ণ দেখায় তাকে। একটু পরে বলে,
-মেয়েটার বড্ড ইমোশন তিমির! আমার ইমোশন আমি ছবিতে প্রকাশ করে ফেলি। মুনিয়া করবে কী?
-গানে প্রকাশ করবে।
-না রে, তা হবে না, ওকে তবে নিজে গান লিখতে হবে, সুর দিতে হবে। ও গভীর ডিপ্রেশনে আছে তিমির। ওর বাবাকেও বলেছি। ওর দীর্ঘ চিকিৎসার দরকার। ইমিডিয়েট দরকার। কিন্তু ওর বাবা গুরুত্ব দিলেন না।
এর পর বছরখানেক কেটে গেছে। মার্চ মাস শেষ হতে চলেছে। এখানে এ সময়েও আলতো শীত থেকে যায়, যদিও শীতের ফুল ম্লান হচ্ছে। রাত্রে আকাশ থাকে পরিষ্কার, দূরে অন্ধকারে জোনাকিরা জ্বলে, যেমন আকাশে জ্বলে নক্ষত্রমালা। একদিন সন্ধ্যার পর তিমির মুনিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যায়।
হায়ারসেকেন্ডারির টেস্ট পরীক্ষা থেকেই মুনিয়ার রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে। যে মেয়ে পরীক্ষায় প্রথম হত, হায়ারসেকেন্ডারিতে সে পাস করে তৃতীয় বিভাগে। তমালরা অনেকেই কলকাতায় ভর্তি হতে যাবে। মুনিয়া পণ করেছে সে আর পড়বে না। খবরটা শুনে তিমির আজ ছুটে আসে।
-কী সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছিস এসব?
মুনিয়া তার ঘরে বসে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে। দু চোখ দিয়ে জল ঝরছিল আগে থেকেই। তিমিরের কথায় সে কোলে মাথা গুঁজে নিলো। তার ফরসা আঙুল হাঁটু জড়িয়ে রেখেছে।
পরে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে উঠে গিয়ে দেরাজ খুলে একটা চিঠি এনে তিমিরের হাতে দেয়। দ্বৈপায়নের চিঠি।
মাসখানেক আগে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দ্বৈপায়ন কী এক ডিগ্রি নিতে চলে গিয়েছে দিল্লিতে। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিল সে। মুনিয়ার থেকেও। তিমিররা এক সন্ধ্যায় তাকে বিদায় জানিয়েছে অনুষ্ঠান করে। মুনিয়ার গান গাইবার কথা ছিল। সে আসেনি সেদিন। দ্বৈপায়ন বলেছিল,
-মুনিয়া এলো না, তিমির? কী যে হয় মেয়েটার।
-পড়ব চিঠি? তিমির অনুমতি চাইলে মুনিয়া বলে,
-পড়তেই তো দিলাম তোকে।
তিমির পড়ে,
মুনিয়া,
কী সন্মোধন করি তোমায় বুঝতে পারি না। তোমার চিঠির উত্তরে বলি, তোমার মধ্যে আমি সব সম্পর্কের স্বাদ পেয়েছি। প্রেমিকার, ছোট বোনের, এমনকি মায়ের। একজন নারীর সব গুণগুলি দিয়ে তুমি আমাকে ধন্য করেছ। আমাদের সম্পর্কের কোন সংজ্ঞা হয় না। একসঙ্গে জীবনযাপনে তুমি বা আমি কেউই সুখী হব না, এটুকু বুঝেছি।
আমি তোমার সঙ্গে মনে মনে সব সময় থাকব। চিঠি লিখবে। আমি পৌঁছে আমার নতুন ঠিকানা জানাব
তোমাকে
তোমাদের
দ্বৈপায়ন দা।
গঞ্জে সম্প্রতি একটা হেলথ সেন্টার খুলেছে। ডাক্তারও এসেছে একজন, কলকাতার ছেলে, একেবারে নবীন যুবক। ডঃ দ্বৈপায়ন বসুর নায়কদের প্রায় সব গুণাগুণ আয়ত্বে। চেহারাও দেখবার মতো। সে কী না পারে! তিমিরদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে নেমে পড়ে। কথা বলে মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তার চিকিৎসায়, তার ব্যবহারে লোকজন খুশি। ফাংশনে সে গাইল, 'মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান।' ছেলেমেয়েরা সকলেই মুগ্ধ হয়। মেয়েরা একটু বেশি। তিমির আর তার বন্ধুদের সঙ্গে তার খুব জমে যায়।
তিমির ডঃ বসুর অবসরে তার কোয়ার্টারে যায়। তিমিরের সঙ্গে আড্ডা মারতে দ্বৈপায়নেরও ভাল লাগে। একদিন তিমির গিয়েছে দ্বৈপায়নের সান্নিধ্য পেতে। এটা-সেটা কথার পর দ্বৈপায়ন বলে,
-তিমির তোর শালা মাগি পটানো চোখ।
তারপর বের করে রং ও তুলি, বলে, একটু মুখটা ঘুরিয়ে বোস।
-আপনি ছবিও আঁকেন?
-আরে তেমন কিছু নয়, মাঝে মাঝে সা রে গা মা বাজিয়ে নিই।
তিমির গলায় মজা ঢেলে বলে,
-আপনাকে নাকি রোজ সন্ধ্যায় মুনিয়াদের বাড়িতে দেখা যাচ্ছে?
দ্বৈপায়ন ঘাবড়ে যায় না। একটু চুপ করে থাকে, সামান্য বিষণ্ণ দেখায় তাকে। একটু পরে বলে,
-মেয়েটার বড্ড ইমোশন তিমির! আমার ইমোশন আমি ছবিতে প্রকাশ করে ফেলি। মুনিয়া করবে কী?
-গানে প্রকাশ করবে।
-না রে, তা হবে না, ওকে তবে নিজে গান লিখতে হবে, সুর দিতে হবে। ও গভীর ডিপ্রেশনে আছে তিমির। ওর বাবাকেও বলেছি। ওর দীর্ঘ চিকিৎসার দরকার। ইমিডিয়েট দরকার। কিন্তু ওর বাবা গুরুত্ব দিলেন না।
এর পর বছরখানেক কেটে গেছে। মার্চ মাস শেষ হতে চলেছে। এখানে এ সময়েও আলতো শীত থেকে যায়, যদিও শীতের ফুল ম্লান হচ্ছে। রাত্রে আকাশ থাকে পরিষ্কার, দূরে অন্ধকারে জোনাকিরা জ্বলে, যেমন আকাশে জ্বলে নক্ষত্রমালা। একদিন সন্ধ্যার পর তিমির মুনিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যায়।
হায়ারসেকেন্ডারির টেস্ট পরীক্ষা থেকেই মুনিয়ার রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে। যে মেয়ে পরীক্ষায় প্রথম হত, হায়ারসেকেন্ডারিতে সে পাস করে তৃতীয় বিভাগে। তমালরা অনেকেই কলকাতায় ভর্তি হতে যাবে। মুনিয়া পণ করেছে সে আর পড়বে না। খবরটা শুনে তিমির আজ ছুটে আসে।
-কী সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছিস এসব?
মুনিয়া তার ঘরে বসে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে। দু চোখ দিয়ে জল ঝরছিল আগে থেকেই। তিমিরের কথায় সে কোলে মাথা গুঁজে নিলো। তার ফরসা আঙুল হাঁটু জড়িয়ে রেখেছে।
পরে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে উঠে গিয়ে দেরাজ খুলে একটা চিঠি এনে তিমিরের হাতে দেয়। দ্বৈপায়নের চিঠি।
মাসখানেক আগে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দ্বৈপায়ন কী এক ডিগ্রি নিতে চলে গিয়েছে দিল্লিতে। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিল সে। মুনিয়ার থেকেও। তিমিররা এক সন্ধ্যায় তাকে বিদায় জানিয়েছে অনুষ্ঠান করে। মুনিয়ার গান গাইবার কথা ছিল। সে আসেনি সেদিন। দ্বৈপায়ন বলেছিল,
-মুনিয়া এলো না, তিমির? কী যে হয় মেয়েটার।
-পড়ব চিঠি? তিমির অনুমতি চাইলে মুনিয়া বলে,
-পড়তেই তো দিলাম তোকে।
তিমির পড়ে,
মুনিয়া,
কী সন্মোধন করি তোমায় বুঝতে পারি না। তোমার চিঠির উত্তরে বলি, তোমার মধ্যে আমি সব সম্পর্কের স্বাদ পেয়েছি। প্রেমিকার, ছোট বোনের, এমনকি মায়ের। একজন নারীর সব গুণগুলি দিয়ে তুমি আমাকে ধন্য করেছ। আমাদের সম্পর্কের কোন সংজ্ঞা হয় না। একসঙ্গে জীবনযাপনে তুমি বা আমি কেউই সুখী হব না, এটুকু বুঝেছি।
আমি তোমার সঙ্গে মনে মনে সব সময় থাকব। চিঠি লিখবে। আমি পৌঁছে আমার নতুন ঠিকানা জানাব
তোমাকে
তোমাদের
দ্বৈপায়ন দা।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment