প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Thursday, December 12, 2024

শেষ থেকে শুরু [৯ম পর্ব] | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক উপন্যাস/২য় বর্ষ/২তম সংখ্যা/০৫ই পৌষ, ১৪৩১

ধারাবাহিক উপন্যাস

পারমিতা চ্যাটার্জি

শেষ থেকে শুরু

[৯ম পর্ব]

"সুচরিতা হেসে বলত কী মানুষ রে বাবা! লোকে বিরিয়ানির ভক্ত হয় এ দেখছি খিচুড়ি বলতে পাগল। এইসব ভাবতে ভাবতে রান্না করছে এমন সময় হঠাৎ রাহুল এসে পেছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ ঘসতে লাগল। সুচরিতা চমকে উঠে বলল, -কি দুষ্টু রে বাবা আর একটু হলে আমি—"


পূর্বানুবৃত্তি এক কাজ করলে আমরা দু-একদিনের মধ্যে রেজিষ্ট্রেশনটা সেরে ফেলি তারপর এক-দেড় মাস পরে তুমি যখন আসবে তখন বিয়ে করেছি যে তা জানিয়ে কয়েকজনকে নিমন্ত্রণ করব, কি রাজি তো? তোমার মত দাও? শুধু আমার মতটা তোমার ওপর চাপিয়ে দিতে চাই নাসুচরিতা এ কথায় ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে রাহুলের বুকে নিজের মাথাটা রেখে বলল, আমিও নিজেকে তোমার বুকে সঁপে দিলাম আর রাহুল তখন দুহাতে ওকে জড়িয়ে ধরল। তারপর...
 
রাহুল বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভাবল একবার রেজিস্ট্রার অফিসে যেতে হবে নোটিশ দেওয়ার জন্য। বেশি কাউকে বলার দরকার নেই দু-একজন কাছের কলিগকে বললেই হবে। হঠাৎ মনে হলো মনকলি আছে এখানে, তার কথা আবার মনে পড়ছে কেন? রাহুল নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে। মনকলি বলেছিল, সে যেন তাকে কী বলতে চায়,  কী বলতে চায় এতদিন 
পরে? আর তো রাহুলের কিছু শোনার নেই। রাহুলের সব ভালবাসাকে সে অপমানে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছিল আর আজ তার সাথে কথা বলতে চায়! কী মনে করে তাকে, তার হাতের খেলনা? সেই বা তাকে নিয়ে এত ভাবছে কেন? এখন তো তার ভাবনার জগতে শুধু সুচরিতার থাকার কথা। যে মেয়েটা নিঃশব্দে তাকে অমলিন ভালবাসায় ভরিয়ে রেখছে দূর থেকে। তারজন্যেই অন্য কাউকে মনে আসতে  দেয়নি এবার সুচরিতার প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। রাহুল তাকে তার ভালবাসার যোগ্য মর্যাদা দিয়ে এবার কাছে নিয়ে আসবে। সুচরিতার সরল হাস্যময়ী মুখের বড় বড় কাজল কালো চোখদুটো চোখের সামনে ভেসে উঠল। এক অনাড়ম্বর স্নিগ্ধ লাবণ্য যেন সুচরিতার সমস্ত  শরীর ও মুখ ঘিরে রয়েছে। তার উজ্জ্বল বড় বড় চোখদুটো যেন কথা বলে। ভাবতে ভাবতেই রেজিস্ট্রি অফিসে পৌঁছে গেলো রাহুল।
 
এদিকে ফোনে মনকলি সুচরিতাকে বলছে জানিস সুচু, খুব ইচ্ছে করছে ছোটবেলার মতন তোদের সাথে আড্ডা দি
-তা আয়না চলে, আন্তরিক ভাবেই সুচরিতা মনকলিকে ডাকেকিন্তু মনকলি বলে
-না-রে এতদিন পরে তোরা দুজনে কাছে এসেছিস দুজনে মিলে একটা সুন্দর মিষ্টি সন্ধ্যা উপভোগ কর আর তাছাড়া—
-তাছাড়া? তাছাড়া কী বল?
-বউয়াদা আমাকে এখন একদম পছন্দ করে না। আসলে আমার প্রথম বয়সের করা অপমানটা এখনও ভুলতে পারেনি।
-তুই কী করে বুঝলি?
-যেদিন প্রথম ওই কলেজে জয়েন করলাম সেদিনই বুঝেছি-রে এখন ওর সমস্ত মন জুড়ে শুধু তুই আছিস। আমি ভাই কাবাব মে হাড্ডি হতে চাই না। বিয়ের সময় যদি বলিস তখন যাব একেবারে
-আরে! তোকে বলব না তাও কখনও হয় না কি?
-তুই বলতে চাইলেও হয়তো তোর বর চাইবে না।
-বউয়াদা তো তোকেই শুধু ভালবেসে এতকাল একলা জীবন কাটিয়ে দিল আজ এতদিন অপেক্ষার পর প্রথম মনে হল যে আমার ভালবাসা চিরকাল একইভাবে বয়ে গেছে কোনদিন বদলে যায়নি। তুই আসিস কাল বিকেলে আমরা অপেক্ষা করব।
 
রাহুল রেজিস্ট্রি অফিসে পৌঁছে মোটামুটি একটা কাছের তারিখ বুক করল তারিখটি ১লা ফাল্গুন। ফাল্গুন মাস বসন্তকাল ভালবাসার মাস। তার কয়েকদিন পরই দোল। যদিও এখন দোল নিয়ে রাহুল খুব একটা মাথা ঘামায় না তবে একটাসময় দোল তার কাছে খুব খুশির উত্সব ছিল। পাড়ার সব ছেলেমেয়েদের নিয়ে নাচেগানে জমজমাট দোল উত্সব পালন করত তারা। আজ মনে পড়লে খুব কষ্ট হয়, সে সবসময় তখন মনকলিকেই প্রাধান্য দিত তাকে নিয়ে ওদের প্রিয় গান ছিল, 'সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে' এই গানটা সবাই খুব উপভোগ করত। মনকলিও তখন বলত এই গান আমার আর বউয়াদার গান এখানে আমি আর কাউকে আসতে দেব না। সুচরিতা বলেছিল একবার কী হিংসুটে রে তুই কেন আমরা গাইতে পারি না? রাহুল সেদিন বলেছিল মনকলি পারমিশন না দিলে এই গান আমি আর কারুর সাথে করতে পারব না। মনকলি তখন নেচে নেচে বলে উঠেছিল দেখলি এই গান আমরা দুজন ছাড়া জমবে না। সেদিন রাহুল দেখেছিল সুচরিতার চোখ ভর্তি জল, রাহুলের মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় সে সুচরিতাকে ডেকে বলেছিল, সুচি এবার ভাবছি তোকে একটা সোলো গান দেব, পারবি তো? সুচরিতা দৌড়ে চলে যেতে যেতে বলেছিল, না না আমি কিছু পারব না যে পারবে তাকে দিও। তখনও রাহুল বোঝেনি বা মানকলির ব্যবহার তাকে বুঝতে দেয়নি যে সে মনকলির কাছে এতটা ব্রাত্য। আজ রাহুল ভাবে সে চিরকাল ভুল করেই এসেছে। নিজের মনটা যে নিজের অজান্তেই কবে সুচরিতার কাছে চলে গিয়েছিল তা বুঝতেই পারেনি তা নাহলে শান্তিনিকেতন থেকে পুরুলিয়ায় কাজ নিয়ে আসার সময়ও সুচরিতার প্রস্তাবে রাজি হতে পারেনি কিন্তু পুরুলিয়ায় আসার পর সে মনে মনে অনুভব করে তার প্রতি সুচরিতার কত যত্ন ছিল। সে কত বলত, কেন রে পাগলি তুই রোজ আমার জন্য কষ্ট করে খাবার তৈরি করে নিয়ে আসিস? সুচরিতা মিষ্টি হেসে বলত কষ্ট আর কী নিজের জন্য যখন খাবার বানাই তখন তোমার জন্য একটু বানিয়ে নি এতে তো আমার কষ্ট হয় না বরং তোমার আমার রান্না ভাল লাগে তোমার তৃপ্তি করে খাওয়া দেখে আমারও খুব আনন্দ হয়। এই ভালবাসাকে আজ রাহুল কোনো কিছুর বিনিময়ে অস্বীকার করতে পারে না। বাড়ি ঢুকে রাহুল দেখল এইটুকু সময়ের মধ্যে সুচরিতা স্নান সেরে একটা হালকা সবুজ তাঁতের শাড়ি পরে কপালে একটা সবুজ টিপ। সুচরিতাকে বেশ মোহময়ী লাগছে। রান্নাঘর হাতড়ে দেখে খিচুড়ি বসিয়ে দিল। তার মনে পড়ল যে বউয়াদা খিচুড়ি খেতে খুব ভালবাসে। প্রত্যেক দোল উত্সবে বলত আজ হল খিচুড়ির দিন। শান্তিনিকেতনে লাঞ্চের সময় যেদিন খিচুড়ি নিয়ে যেত সেদিন বউয়াদা বলত এই খাবারটা পেলে আর আমার কিছু লাগে না। শুধু ওপরে একটু ঘি ছড়িয়ে আনবে ব্য জম্ জায়গা। সুচরিতা হেসে বলত কী মানুষ রে বাবা! লোকে বিরিয়ানির ভক্ত হয় এ দেখছি খিচুড়ি বলতে পাগল। এইসব ভাবতে ভাবতে রান্না করছে এমন সময় হঠাৎ রাহুল এসে পেছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ ঘসতে লাগল। সুচরিতা চমকে উঠে বলল, -কি দুষ্টু রে বাবা আর একটু হলে আমি—
-আমি কী?
-পড়েই যেতাম,
রাহুল ওকে সামনে ধরে বলল, কী করে পড়তে? আমার ওপরে?
-ধ্যাৎ তুমি না ভীষণ অসভ্য।
প্রথম দিনেই ঘরে ঢুকে খিচুড়ির সুগন্ধে মন ভরে গেল। মনের মানুষ না থাকলে কী আর মনের মতন রান্না হয়! ঘরে ঢুকেও অবাক হবার পালা, তার অগোছালো ঘরটাকে কী নিখুঁতভাবে সুচি গুছিয়ে রেখেছে। খাটের ওপর ওর চেঞ্জ পর্যন্ত বার করে রেখেছে। রাহুল ট্রাকস্যুটটা নিয়ে তাদের লাগোয়া বাথরুমে চলে গেল
 
 
ক্রমশ
 

1 comment:

  1. ভালো লাগলো
    পরাণ মাঝি

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)