প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Thursday, December 12, 2024

শিউলি ফুল | তপতী রায়

বাতায়ন/মাসিক/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/২২তম সংখ্যা/২শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩১

মোহন রায়হান সংখ্যা | ছোটগল্প

তপতী রায়

শিউলি ফুল


"ঠিক মনে পড়ত ১৬ই ফাল্গুন। এখনো মনে পড়ে। রজনিগন্ধার গন্ধ ভেসে আসে দূর থেকে। মুখে পান ঢাকা সদ্য বড় হওয়া এক লাবণ্যময়ী মেয়ে, একমুখ হেসে গলায় মালা পরিয়ে দিল। আমিও সেদিন হেসেছিলাম। বোধহয় সেই মুহূর্তে ভালবেসেছিলাম। তাই শত চেষ্টায় ভুলতে পারলাম না।"


মধ্য রাত। হঠাৎ শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল। ডাক্তার দীপ্তের। বর্ষাকাল। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। দীপ্ত জানলা খুলে দেখল গেটটা হাট করে খোলা। কিছু মানুষের শব্দ। বাইরে এসে দেখে কিছু ছেলে একটি মেয়ের সাথে ধস্তাধস্তি করছে। দীপ্ত চিৎকার করে উঠল,
-কী হচ্ছে ওখানে?
একটি ছেলে চিৎকার করে বলল,
-স্যার লাইনের মেয়ে, হীরের আংটি চুরি করে ভাগছে!
মেয়েটি হাউমাউ করে কেঁদে  উঠল,
-আমি চুরি করিনি, আমার স্বামী দিয়েছিল বিয়ের রাতে; এরা সবাই আমার ওপর অত্যাচার করেছে। বলল আংটিটা নেবে না, ফেরত দেবে। আমি ভাল ঘরের মেয়ে, নিজের আপনজন চাকরি দেবে বলে বিক্রি করছে এক দালালের কাছে। জানতে পারলাম, শ্বশুর বাড়ির লোক। সেদিন থেকে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি। পারলাম না
 
দীপ্তর বুকের ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। জোরে পা ফেলে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বহুবছর আগে এক গোধূলি লগ্নে মালাবদল হয়েছিল মেয়েটির সঙ্গেএই সেই মেয়ে শিউলি! চেহারা তামাটে হয়ে গেছেজ্বলজ্বল করছে ক্লান্তিমাখা দুটি চোখ। অদ্ভুত এক লাবন্যময়ী মেয়ে
 
ছেলেবেলায় ইংরেজি গল্পের বই পড়তাম, Once upon a time, তারপর শুরু হতো কাহিনিআমার জীবনের অনুগল্পটা ঠিক এইরকম। দাদুর ছেলেবেলার বন্ধুর নাতনির বিয়েতে গ্রামে গেলামবাবা নামী ডাক্তার। সময়ের অভাব। মা সুন্দরী শিক্ষিতা নাম করা পলিটিশিয়ানের মেয়ে। গ্রামগঞ্জে যাওয়া চিন্তার বাইরে, তবে পলিটিশিয়ান বাবাকে সাহায্য করতে মাঝে মাঝে লালপাড় শাড়ি পরে যেতে দেখেছি গ্রামগঞ্জে এবং আঙুল চেটে খেতেও দেখেছি কলাপাতায়
 
আমি চলে গেলাম বাড়ির মান রাখতে। দাদুর সাথী হয়েদুদিন হইচই করে গ্রাম দেখলাম। সঙ্গে শিউলিও ছিল। আমার বন্ধু ফাজিল দীপু বলল,
-একটা সদ্যফোটা ফুল হাতছাড়া হয়ে গেল চোখের সামনে থেকে।
সত্যি বলতে আমার বেশ ভালই লাগেছিল ওর সঙ্গ। নতুন স্বাদের গন্ধ। ভোরের আলো। স্নিগ্ধ ছায়া। যার সাথে বসে দুটো মনের কথা বলা যায়
 
বিয়ের দিন রাতে খবর এলো ছেলে আগে একটি মেয়েকে বিয়ে করেছে। বিয়ে ভেঙে গেল। দাদুর বন্ধুর মান রাখতে আমাকে বিয়ে করতে হোলো। চিন্তা করার অবকাশ পেলাম নাকলকাতা থেকে বাবা-মা ছুটে এলো। সঙ্গে বেশকিছু রাজনীতির ছেলে। সত্যি বলতে আমিও রাজি ছিলাম না। একটা ষোলো বছরের মাধ্যমিক পাশ করা মেয়েকে বিয়ে করতে। তাদের মধ্যে কী আলোচনা হলো জানি না। ফিরে এলাম কলকাতা। আমার হাসিখুশি মনটা হারিয়ে গেল। দাদু আর দেশের বাড়ি থেকে ফিরল না
 
আমিও বাবার মতো মস্ত বড় ডাক্তার হলাম। শহরের চাকচিক্য সুন্দরী মেয়ের সাথে বিয়ে হলো। দুই ছেলের বাবা। বড় ছেলে ডাক্তারি পড়ছে। ছোট স্কুলে। পুরোপুরিভাবে আমেরিকার বাসিন্দা। তবু মেয়ে দেখলেই কেন জানি না শিউলিকেই খুঁজি। রঞ্জনার বুকে মাথা দিলে শিউলির মুখ ভাসে।
 
আসার সময় দাদুর দেওয়া আংটিটা জোর করে দিয়ে এসেছিলাম। কিছু বলার ইচ্ছে ছিল, বলতে পারিনিশিউলি বলেছিল,
-আমার জন্য চিন্তা করবেন না। যতটুকু আমার প্রাপ্য তার একবিন্দু বেশি পাব না। ছেলেবেলায় মার কাছে শোনা। নতুন পথে এগিয়ে যান। আমার দাদুর মান বাঁচানোর জন্য, অনেক ধন্যবাদ
এক অল্পবয়সি মেয়ের কাছ থেকে এত বড় কথা মনের গভীরে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। কতটা দুর্বল আমরা শহরের পোশাকি বাবুরা, এখনো মনের আনাচেকানাচে ঘুরতে থাকে। এতটা পথ হেঁটে এসেও ভুলতে পারলাম না। অন্যায়! মুখে স্বীকার করার ক্ষমতা না থাকলেও মনের অন্তরালে গভীরভাবে দাগ কেটে যায়
 
মাথার ওপর দিয়ে একটা প্লেন উড়ে গেল। কাল ফিরছি আমেরিকা। চোখের সামনে ছেলেগুলো একটা অচৈতন্য মেয়েকে জিপে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলএকদিন শপথ করেছিলাম মানুষের সেবার জন্য আমার ডাক্তারি পড়া। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম
 
দীপু একদিন বলেছিল, মনখারাপ করিস না। সিদ্ধান্ত নিজে নিতে হয়। শিউলি ফুল রাতে ফোটে ভোরে ঝরে পড়ে। বয়স যখন অল্প ছিল। মাঝে মাঝে বাগানের শিউলি ফুলের গাছের নীচে দাঁড়িয়ে শিউলির কথা ভাবতাম। মা দেখতে পেলেই বকাবকি করত। প্রতিবাদ করবার ক্ষমতা আমার ছিল না। বরাবর একটু দুর্বল প্রকৃতির স্বভাব ছিল। আস্তে আস্তে সব সয়ে গেল। জীবনটা যেন চলার পথে একটা বাঁধভাঙা নদী। ভুলে যাবার চেষ্টা করতাম। ঠিক মনে পড়ত ১৬ই ফাল্গুন। এখনো মনে পড়ে। রজনিগন্ধার গন্ধ ভেসে আসে দূর থেকে। মুখে পান ঢাকা সদ্য বড় হওয়া এক লাবণ্যময়ী মেয়ে, একমুখ হেসে গলায় মালা পরিয়ে দিল। আমিও সেদিন হেসেছিলাম। বোধহয় সেই মুহূর্তে ভালবেসেছিলাম। তাই শত চেষ্টায় ভুলতে পারলাম না
 
আজ আর মা নেই। শিউলিফুলের গাছের নীচে বসে পড়লাম। ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ ঝরা শিউলিফুলের নীচে কী যেন চকচক করছে। তুলে দেখি আমার দেওয়া হীরের আংটি। তাড়াহুড়োতে ছেলেগুলোর হাত থেকে পড়ে গেছে কিংবা শিউলি আমায় চিনতে পেরে ফেরত দিয়ে গেছে। সবটাই আমার জীবনের অসমাপ্ত অণুগল্প হয়ে রয়ে গেল
 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)