বাতায়ন/মাসিক/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/২৮তম সংখ্যা/২রা
ফাল্গুন, ১৪৩১
অমরেন্দ্র চক্রবর্তী সংখ্যা | ছোটগল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
ডেলিভারিম্যান
মনোজ চ্যাটার্জী
"বিরল সামারিটানদের দৌলতে রোহিত এ যাত্রায় বেঁচে যায় তবে তার বাঁ পাটা হাঁটুর উপর থেকে কাটা গেছে। পরে হয়তো জয়পুর লেগ নেওয়া যাবে তবে আপাতত একটা সুদৃশ্য ক্রাচই তার প্রিয়তমা মেরিল।"
'নকিং অন দ্যা হেভেনস ডোর'- বব্ ডিলানের বিখ্যাত সুর বেজে ওঠে কলিং বেলের শব্দে।
-ম্যাডাম, একটা
পার্শেল আছে।
-আবার, তোমাকে
কতবার বলেছি, আমাকে
ম্যাডাম বলে ডাকবে না,
আমি মৃদুলিকা তুমি ডাকনামে মেরিল বলেও ডাকতে পারো।
-সরি ম্যাডাম, আমাদের
কোম্পানির কিছু রুলস ফরম্যালিটি আছে, উই ক্যান্ট ব্রেক দ্যাট।
-তবে রে পাষণ্ড, নিকুচি
করেছে তোর কোম্পানির রুল।
বলেই মৃদুলিকা পার্শেলটা ছুঁড়ে মারে রোহিতাশ্বের বুকে।
রোহিত ইনস্ট্যান্ট ক্ষিপ্রতায় সেটা লুফে নেয়।
বছর দশেক আগে কলকাতায় অনলাইন শপিং ও হোমডেলিভারি শুরু হলেও করোনা মহামারীর পর থেকে তার রমরমা শুরু হয়। মৃদুলিকা সেন্ট জেভিয়ার্সের ইংলিশ অনার্স, যথারীতি এক কদম আগে অন্যদের থেকে। কিন্তু বাবার আকস্মিক অসুস্থতা ও আর্থিক বিপর্যয়ের ফলে পড়াশুনোয় ইতি টেনে বিয়ের পিঁড়িতে বসে, কিন্তু বিধি বাম, মাস ছয়েক পরেই মনকষাকষিতে ডিভোর্স এবং বাবার সাথেই বসবাস, মা অনেকদিন আগেই গত হয়েছেন তাই এই বাড়ির সবকিছুই তার উপর নির্ভরশীল। বাইরের কেনাকাটার প্রায় সবটাই সে অনলাইনে করে নেয়। অনেকদিন থেকেই রোহিত এই বাড়িতে বিভিন্নরকম জিনিস ডেলিভারি করে, ফলে আলাপ থেকে পরিচয় হয়ে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছে। সে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মিয়ে আশুতোষ কলেজ থেকে অনার্স গ্র্যাজুয়েট করলেও অভাবের তাড়নায় অবশেষে এই ডেলিভারিম্যানের চাকরিতে যোগ দেয়। মৃদুলিকার বাড়িতে সে প্রায় ডেলিভারি দিতে আসে, ফলে ঘনিষ্ঠতা এতদূর হয়েছে বলেই আজ সে রোহিতের বুকে পার্শেল ছুঁড়তে পারল।
-ম্যাডাম, আপনি শুধু শুধু রাগ করছেন।
-আবার ম্যাডামের সাথে আপনি, আজ তোরই একদিন কী আমার একদিন।
-ছাড়ো, ছাড়ো, আমার এখন সময় নেই, দশ মিনিটের মধ্যে আমাকে আরেকটা ডেলিভারি করতে হবে দু কিলোমিটার দূরে।
বলেই বাইকে স্টার্ট দেয় রোহিত, একটা কুকুর বিরক্তিতে একবার ঘেউ করে ওঠে। রোহিত এগিয়ে
যায় দেশপ্রিয় পার্ক থেকে সাউদার্ন এভিনিউ এর দিকে।
-ও দাদা, চোখে কি ন্যাবা হয়েছে, আপনার ইন্ডিকেটর দিয়ে আমাকে ধাক্কা মারলেন কেন?
-ও সরি, সরি তাড়াতাড়িতে খেয়াল করিনি।
-আমার রক্ত বার করে দিলেন আর সরি, সরি, ন্যাকা, সরি বললেই সাতখুন মাফ হয়ে যায়, এত তাড়া তো আগে বেরোতে পারেন না, যতসব উটকো জানোয়ার।
চট করে আঁতে ঘা লাগলেও সে টাসলে গেল না, পরের কাস্টমার এর মধ্যেই দুবার ফোন করেছে, আর দেরি করলে কমপ্লেন করে দিতে পারে। অসম্ভব স্পিডে গাড়ি ছুটিয়ে, কোনরকমে রাস্তা পার হওয়া একটা লোককে বাঁচিয়ে, তার শান্তির ছেলে খিস্তি খেয়ে, নটা পনেরোতে সে পরের মাল ডেলিভারি করে।
-এই যে হিরো, তোমার তো নটার মধ্যে আসার কথা, আমার একদিনের মাইনে জানো, তিনটে লেট হলে
আমার একটা সিএল কাটা যায়, আর আমার একদিনের মাইনে হলো ছহাজার টাকা, তার ওয়ান থার্ড মানে দুহাজার টাকা তুমি গুনাগার দেবে তো? নাকি তোমার নামে কোম্পানিতে কমপ্লেন করব?
-প্লিজ স্যার, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, এরপর পাঁচ মিনিটের বেশি লেট হলেই আপনি কমপ্লেন করে দেবেন।
এইভাবে প্রতিদিনের অসংখ্য অপমানের মধ্যে দিয়েই রোহিতের দিন কাটে। বাড়িতে অসুস্থ বাবা অনেকদিন আগেই জুটমিলে লকডাউনের জন্য বেকার। অত্যধিক পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টায় আজ শয্যাশায়ী। মা গোটা সংসার সামলে এধার-ওধার সেলাই, দোকানে কাজ ইত্যাদি করে সংসারের একটু সুরাহা করার চেষ্টা করেন। রোহিতের নির্দিষ্ট আট বা বারো ঘন্টার ডিউটি নয়। দিনে কমপক্ষে কুড়িটি ডেলিভারি তাকে করতে হবে, তার বেশি পারলে ইনসেনটিভ। কুড়িটা শেষ করতেই তার বাড়ি ঢুকতে কোনদিন রাত নটা কোনদিন সাড়ে দশটা। মাসে একদিন রোহিতের ছুটি। সারামাসের ক্লান্তির পর সেদিন ঘুম ভাঙতে সকাল নটা পেরিয়ে যায়। আগে জলখাবার খেয়ে এইদিন সে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় যেত। কিন্তু ক্রমশ অচিনপুরের পথিকের মতো কেরিয়ারিস্ট সফল বন্ধুদের কাছ থেকে সে দূরে সরে যেতে থাকে। আগে মা ডেকে বলত, কী রে বাবুসোনা বন্ধুদের সাথে গল্প করতে যাবি না? এখন জানেন ছেলে ঘরেই বিশ্রাম করবে। বিছানায় হেলান দিয়ে সে অন্যদের মতো মোবাইল নিয়ে বসে না, বাকি দিনগুলোয় তাকে এত বেশি মোবাইল দেখতে হয় যে সে তার বদলে ঘরের জানালা দিয়ে যে এক চিলতে ট্রাপিজিয়ামের মতো আকাশ দেখা যায় সে-দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে। ডেলিভারিম্যান এ এক অদ্ভুত পেশা, এ পেশায় কোনদিন প্রমোশন নেই, শুধু যত বেশি ডেলিভারি করতে পারবে তত একটু বেশি টাকা পাবে। আর যেভাবে হাজারে হাজারে ছেলে এমনকি মেয়েরাও আসছে তাতে ভবিষ্যতে উপার্জন কমবে বই বাড়বে বলে মনে হয় না। এক চিলতে ট্রাপিজিয়ামাকার আকাশ, কবে যে সেখানে উপস্থিত হবে সেই সূর্যদেব, একটু আলো দেবে রোহিতের নিরন্তর ব্যস্ততার করুণ জগতে। তবে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা অন্য কোন গ্যালাক্সি থেকে একটু একটু করে যেন এগিয়ে আসছে রোহিতের দিকে নইলে এক অতীব সুন্দরী বিদুষী মহিলা কেন তার পিঠে কিল চাপ্পড় মারবে। সে অতশত ভাবতে পারে না নাহলে মেরিলের সঙ্গে তার বছর পাঁচেক আগে থেকে আলাপ, পরিচয় ও ক্রমশ অন্তরঙ্গতা। সে ইনফিরিয়াটি কমপ্লেক্সে যতই এড়িয়ে যাক, মেরিলের ক্রমশ কাছে আসা কোনকিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি, যার অন্তিম ফল এই কিলচাপ্পড়। মৃদুলিকা বার বার বললেও সে কখনো তাকে ম্যাডাম ছাড়া অন্য কিছু বলে ডাকেনি, কেবল একদিন কী খেয়াল হয়েছিল কে জানে, সে মেরিল বলে ডাক দিতেই মৃদুলিকার মুখে এক অপূর্ব গোলাপি মেঘের আভা দেখতে পেয়েছিল।
প্রাকসন্ধ্যাকালীন সেই গোলাপি মেঘের আভা তাকেও যেন কিছুটা বিহ্বল করে দিয়েছিল। মেরিল একদিন জানতে চেয়েছিল,
-না মামনি, একমাত্র গুরুতর অসুস্থতা ছাড়া আমার কোন ছুটি নেই। ইচ্ছে করেই মাসে একদিন ছুটির কথা সে বলেনি, কী লাভ?
যথারীতি একদিন সে ডেলিভারি করে যাচ্ছে, হঠাৎ মেরিলের ফোন, এখন তো কোনো ডেলিভারি নেই তাহলে মেরিল ফোন করছে কেন, ও তো ডেলিভারি ছাড়া কোনদিন ফোন করে না। ইতস্ততভাবে সে ফোনটা ধরে,
-আমি এখনই আসছি, গড়িয়াহাটের কাছাকাছি আছি, দু মিনিটের মধ্যে আসছি আমি।
কী যেন কীসের টানে সে কাজটাজ সব ভুলে উত্তর দেয়। তারপরেই তার বাইক ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলে, লাকিলি সব সিগন্যাল গ্রিন পেলেও দেশপ্রিয় পার্কের সিগন্যাল রেড। কিন্তু মেরিলের চিন্তায় সে সিগন্যাল ব্রেক করে এগিয়ে যায়, একেবারে শেষমাথায় সে আর পেরোতে পারে না, গ্রিন সিগন্যালে আসা একটা স্পিডিং কার জোরে ব্রেক কষলেও তার বাঁ পায়ে এসে সজোরে ধাক্কা মারে। ভয়ংকর দুর্ঘটনা দেখে, চারপাশ থেকে লোক ছুটে আসে, এ কী মাথা খারাপ নাকি, এভাবে কেউ বাইক চালায়, তাও আবার রানিং সিগন্যাল ব্রেক করে, ও বাবা, এ তো ডেলিভারিম্যান! যা হোক আগে হসপিটাল নিয়ে চলো, নইলে বাঁচবে না, কী যা-তা ব্লিডিং হচ্ছে। বিরল সামারিটানদের দৌলতে রোহিত এ যাত্রায় বেঁচে যায় তবে তার বাঁ পাটা হাঁটুর উপর থেকে কাটা গেছে। পরে হয়তো জয়পুর লেগ নেওয়া যাবে তবে আপাতত একটা সুদৃশ্য ক্রাচই তার প্রিয়তমা মেরিল।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment