বাতায়ন/চৈতি
হাওয়া—নববর্ষ/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ছোটগল্প
কবিতা
সামন্ত
নববর্ষ
বিভ্রাট
"রোজ হাঁটতে যাবার নাম করে ঘনশ্যাম ময়রার দোকান থেকে ইচ্ছে খুশি মন ভরে মিষ্টি-টিষ্টি খেয়ে আসতেন। আর বাড়ির লোকের অবস্থা যেন তারাই আসলে সুগার রোগী!"
সবাই বেশ হাসিখুশি আনন্দ-ফুর্তি করতে
করতে বাড়ি ফিরেছিল চৈতি শেষের মেলা থেকে, এমন সময় লখাইকাকার
বড় ছেলে মেজাজ খাট্টা করে সবার খুশিতে জল ঢেলে দিল।
মেলার থেকে ফেরার পথে ঘনশ্যাম
ময়রা একটা হালখাতার নিমন্ত্রণপত্র সহ বেশ বড় অঙ্কের বিল ধরিয়ে দিয়ে বললেন আগামীকাল
দোকানের হালখাতা আছে, এসে সেরে যেও। আসলে
তোমার বাবাকেই নিমন্ত্রণপত্রটা দিয়ে দিতাম কিন্তু বেশ কয়েকদিন হলো তোমার বাবা
দোকানে আসেননি, শরীর-টরীর ঠিক আছে
তো? বলে চলে গেলেন।
এদিকে লখাইকাকার সুগার কিছুতেই কমছে না দেখে
ছেলেরা বড় বড় ডাক্তার দেখাচ্ছে,
দুদিন
ছাড়াই কাঁড়িখানেক করে ওষুধ পালটানোর সঙ্গে বাড়িতে ছোট থেকে বড়
সব সদস্যদেরই খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত ওনার মতোই চলছে। বাচ্চারা কিছু মনপসন্দ খাবারের বায়না করলে লখাইকাকাকে লুকিয়ে-চুরিয়ে
বাইরে থেকে খাইয়ে দেওয়া হয় যাতে উনি অন্তত মন খারাপ না করেন। বাড়ির সবাই মন মেরে জিভের জল শুকিয়ে মুখের স্বাদ ভুলে লখাইকাকার জন্য
যা রান্না হয় সেই রান্না খেয়ে নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে রেখেছে।
আজ বোঝা গেল ওনার সুগার
কন্ট্রোল না করতে পারার রহস্য সেই সঙ্গে এই অবান্তর অঙ্কের একটা বিল!
কত হয়েছে জানো? পনেরো হাজার টাকা। রোজ হাঁটতে যাবার নাম করে ঘনশ্যাম ময়রার
দোকান থেকে ইচ্ছে খুশি মন ভরে মিষ্টি-টিষ্টি খেয়ে আসতেন। আর
বাড়ির লোকের অবস্থা যেন তারাই আসলে সুগার রোগী! বাড়ির বাচ্চাগুলো জানতে পেরে
কান্না জুড়েছে তাদের দাদাইয়ের কীর্তি শুনে। কেন এতদিন
তাদেরকে ভালমন্দ খাবার না দিয়ে দাদাইয়ের বে-স্বাদ খাবার খাওয়ানো হয়েছে? আর এদিকে দাদাই বাইরে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বেশ ভাল ভাল
মিষ্টি এটা-সেটা খেয়ে গেছেন। এর উত্তর তাদের চাই।
লখাইকাকার স্ত্রী কাজল-কাকিমা তো
দাঁত কিড়মিড়িয়ে যা নয় তাই বলছেন। এত নোলা তোমার? বাড়ির কচি কচি নাতি-নাতনিদের মুখটাও মনে পড়ল না একবার যখন
গাণ্ডেপিণ্ডে গিলতে ওইসব খাবার?
ছেলেদের
বলছেন লখাইকাকাকে হাত-পা বেঁধে রোদে ফেলে রাখতে এই গরমে। তাহলে নাকি উচিৎ শাস্তি
দেওয়া হবে।
লখাইকাকা চুপচাপ এমনভাবে
একধারে বসে আছেন মুখটা দেখলে বেচারা ছাড়া কিছুই মনে হবে না। এমন ভাব যেন এর জন্য
তিনি কোন মতেই দায়ি নন বা ওনাকে শুধু শুধু
ভিলেন বানানো হচ্ছে।
অনেক হইচইয়ের মধ্যে
রাত কাটলে, সকালে নববর্ষের খাওয়াদাওয়ার বেশ তোড়জোড় চলছে দেখে
লখাইকাকাও বেশ ফুরফুরে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মনে মনে ভাবলেন যাক, সবাই সবাটা ভুলে গেছে। নতুন বছরটা তাহলে বেশ ভালই কাটবে।
ভালমন্দ খাবারের গন্ধে আজ খিদেটাও একটু বেশি পাচ্ছে। সকালের জলখাবার থেকে শুরু করে
দুপুরে তাহলে বেশ কব্জি ডুবিয়ে খাওয়াদাওয়া হবে এই ভেবে একটু বাইরের দিকে ঘোরাঘুরি
করতে গেলেন। এর-ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে ঘড়িতে বেলা তখন দশটা, বেশ খিদেও পেয়েছে। বাড়িতে ফিরে সকালের খাবার চাইলে করলার
জুস সেই সঙ্গে কাঁচা পেঁপে সেদ্ধ ধরিয়ে দিয়ে গেল বাড়ির কাজের মেয়ে মানদা। কিন্তু
এগুলো কী! সকাল সকাল রান্নাঘর থেকে তো লুচিটুচির গন্ধ আসছিল, সেসব কোথায়!
গিন্নিকে হাঁক দিলে কোন সাড়া
পায় না। আশ্চর্য! কেউ সাড়া দেয় না কেন?
এবার
মানদাকে ডাকলে মানদা এলে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় এগুলো কী? উত্তরে মানদা জানায় কত্তামা এগুলোই দিতে বললেন। আর বললেন
ওগুলো খেয়ে তাড়াতাড়ি স্নান করতে, আজ সবাই একটু
তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া করবে নতুন বছর তো তাই।
কিন্তু এগুলো কেন? লুচি তরকারি মিষ্টি এসব কোথায়? জিজ্ঞেস করলে ওদিক থেকে উত্তর আসে যা দেওয়া হয়েছে চুপচাপ না
খেলে এগুলোও আর জুটবে না।
তার মানে বাড়ির হাওয়া খারাপ
লখাইকাকা বুঝতে পারলেন। চুপচাপ এগুলো না খেলে যদি দুপুরের খাওয়াদাওয়াও এই রকমই ভাগ্যে
জোটে! সেই ভেবে বেশি কিছু না বলে হুজ্জুতি না করে নাক সিঁটকে খেয়ে
স্নান সেরে নিজের ঘরে বসে আছেন আর রান্নাঘর থেকে
হাওয়াতে বয়ে আসা ভালমন্দ খাবারের সুগন্ধ নাক দিয়ে প্রবেশ করে পেটের খিদেকে
দুগুণ বাড়িয়ে তুলছেন।
খাবার সময় হলে সবাই নীচে
একসঙ্গে খেতে বসে আর হাঁটুর ব্যথা নিয়ে লখাইকাকা চেয়ার টেবিলে।
সবাই খাওয়া শুরু করেছে, বেশ সুন্দর করে থালার চারপাশে অনেকগুলো বাটি। কত কিছু আছে
আজ খাবারের মেনুতে।
সব শেষে এলো লখাইকাকার থালা।
একটা বাটিতে খানিকটা করলা সেদ্ধ, একটা বাটিতে পেঁপে
সেদ্ধ আর একটা বাটিতে খানিকটা জন্ডিসের মতো খানিকটা বিনা তেল মশলার চিকেন সেদ্ধ। দেখেই
লখাইকাকা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। তেনার সঙ্গে নাকি শত্রুতা করা হচ্ছে। ইচ্ছে করেই এসব করা
হচ্ছে তাই তিনি নাকি খাবেন না। কাকিমা চেঁচামেচি করলে তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার
হুমকি দেন।
লাল টকটকে খাসি মাংসের পিস
দাঁতে কাটতে কাটতে ছেলেরা বলে উঠল যা দেওয়া হয়েছে ভালয় ভালয় খেয়ে নাও নইলে আর কোন কিছুই জুটবে না আজকের পর থেকে, কারণ বাজারের সব দোকানদারকে বলা আছে তোমাকে যেন আর কেউ
কোনরকম উলটোপালটা কোন কিছুই না দেন। আর তাও তো আজ তোমার কপাল
ভাল যে আজ নতুন বছরে অন্তত মাংস ভাত পাচ্ছ, নইলে তোমাকে ছ মাস দুবেলা শুধু করলা আর পেঁপে সেদ্ধ ভাতই দেওয়া হবে। সব শুনে
লখাইকাকা বাড়ির বাইরে গেলেন না ঠিকই কিন্তু বাড়ির খাবারেও হাত দিলেন না। দেখতে
দেখতে সবার খাওয়া হয়ে গেল লখাইকাকা নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে ছিল এমন সময় বড়
ছেলের মেয়ে সুমি এসে বলল দাদাই খাবারটা এখানে নিয়ে আসব? তা না হলে ঠাম্মী বলছিল খাবারটা বাইরের ঝোপে ফেলে দেবে।
পাড়ার ভুলু এসে চেটেপুটে খেয়ে নেবে।
লখাইকাকা নাতনিকে বললেন
তোমরা সবাই গোলটেবিল করে যুক্তি এঁটেছ আমাকে শাস্তি দেবে বলে? যাও আমি খাব না ওই অখাদ্য-কুখাদ্য খাবার। যার যা ইচ্ছে তাই
করুক গে। বলেই গোঁ গাঁ করতে করতে ভাবলেন যদি সত্যি সত্যিই তাই করে তবে এটুকুও আর
জুটবে না কপালে, এমনিতেও ভীষণ খিদে
পেয়েছে।
নাতনি চলে গেলে নিজেই গিয়ে
চুপচাপ খাবারটা খেয়ে নেন। বাড়ির সবাই তখন ভাতঘুম দিচ্ছে। যদিও খেলেন তা এমনভাবে খেলেন
যাতে করে মনে হয় বিড়াল এসে খেয়ে গেছে। লখাইকাকা খেয়ে উঠতেই মনে হলো যেন দরজার আড়াল
থেকে কারোর হাসির শব্দ। মনের ভুল বলে হাত ধুয়ে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে পাশ ফিরে
চুপচাপ আবার শুয়ে পড়লেন, আর সেই সময়ই মিউঁ করে
ডেকে উঠল বিড়াল। লখাইকাকা মনে মনে বলছেন বাহ্ বেশ সময়মতো বিড়ালটা এসেছে তো, যাক তাহলে বাড়ির সবাই সত্যি সত্যিই ভাববে বিড়ালেই খেয়ে
গেছে। সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে লখাইকাকার স্ত্রী (কাকিমা) নাতি-নাতনিদের নিয়ে
বললেন ঠাকুর ঘরে কে? আমি তো কলা খাইনি!
~~000~~

No comments:
Post a Comment