বাতায়ন/চৈতি
হাওয়া—নববর্ষ/পর্যালোচনা/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | পর্যালোচনা
কবিতা— প্রবহমান
কবি— অমৃতা মুখার্জি
পর্যালোচক— প্রদীপ কুমার দে
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | পর্যালোচনা
কবিতা— প্রবহমান
কবি— অমৃতা মুখার্জি
পর্যালোচক— প্রদীপ কুমার দে
"কবিতার রূপকগুলো (মেঘ-বৃষ্টি, ডিঙি, জোয়ার-ভাটা) খুব সাবলীলভাবে মিলেমিশে গেছে। বিশেষ করে শেষের দু লাইন কবিতাটিকে একটি পূর্ণতা দিয়েছে—যেখানে লড়াইয়ের শেষে একাকীত্ব আর অপেক্ষার চিরন্তন সত্যটি ফুটে ওঠে।"
[কবির নাম না-জেনে শুধু কবিতা ও শিরোনামের ভিত্তিতে এই পর্যালোচনা]
পাতা ঝরা নিঃশব্দে, বড় ক্লান্ত যাপনকাল,
নাগরিক দিন ধূসর, ক্রমশ জমছে হাটুরে কোলাহল।
চেনা মুখ বড় অচেনা লাগে জীবনের চালচিত্রে
সাদা-কালো এই দ্বন্দ্বে, ধন্দে পুরনো সত্যি-মিথ্যে।
মন তুই কত দূরে, চল ঘুরে আসি মেঘ-পাহাড়ে,
খুচরো জীবন ভাঙিয়ে, ভেঙে নিষেধের বেড়া পেরিয়ে।
পথেই হঠাৎ মেঘ-বৃষ্টি, আবার আকাশ আলো
কখন যে তোর ফুরোয় আবেগ, কখন বাসিস ভাল।
জীবন স্রোতে ভাসছে ডিঙি অথৈ পারাবার,
তুফান উঠুক মাঝ দরিয়ায় ঢেউ
ভেঙে দিক ঘর।
নদী এখন বইছে যেমন জোয়ারভাটার মাঝে,
হাটুরে দিন যাচ্ছে মুছে, হাজার নষ্ট-কাজে।
হঠাৎ যদি বাঁধ-ভাঙা স্রোত দুরন্ত বন্যায়,
হতেই পারে, একলা তুমি… আবার অপেক্ষায়।
উপরিউক্ত 'প্রবহমান' কবিতাটি আমাদের
মনুষ্য জীবনের ক্লান্তি, আত্মিক শূন্যতা এবং
প্রকৃতির মাঝে মুক্তির এক চমৎকার আর্তি। লেখনীতে এক ধরণের বিষণ্ণ কিন্তু প্রবহমান
সুর আছে, যা পাঠকের মনে দাগ কাটে।
কবিতাটির একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা—
বিষয়বস্তু ও ভাবার্থ—
কবিতাটি শুরু হয়েছে ক্লান্ত
যাপনকাল এবং ধূসর নাগরিকতার চিত্র দিয়ে। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল যখন মানুষের চেনা
মুখগুলোকে অচেনা করে তোলে, তখন কবির মন 'মেঘ-পাহাড়ের' অজানায় হারিয়ে যেতে
চায়। জীবনকে এখানে একটি ডিঙি নৌকার সাথে তুলনা করা হয়েছে,
যা কখনও
শান্ত জোয়ার-ভাটায় চলে, আবার কখনও তুফানের
মুখে পড়ে। শেষ দিকে এসে কবিতাটি একটি অস্তিত্ববাদী সত্যকে তুলে ধরে—শত ভিড়ের মাঝেও
মানুষ দিনশেষে 'একলা' এবং পরবর্তী কোনো কিছুর 'অপেক্ষায়'।
চিত্রকল্প ও নির্মাণ—
কবিতার শব্দচয়ন এবং চিত্রকল্প
বেশ শক্তিশালী—
হাটুরে কোলাহল ও ধূসর দিন:
নাগরিক একঘেয়েমিকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
খুচরো জীবন ভাঙিয়ে: এই উপমাটি চমৎকার। জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত বা সঞ্চয় দিয়ে আমরা যখন বড় কোনো মুক্তির স্বাদ নিতে চাই, তখন এই শব্দবন্ধটি খুব প্রাসঙ্গিক।
সাদা-কালো দ্বন্দ্ব: নৈতিকতা বা সত্য-মিথ্যের দোলাচলকে এটি নির্দেশ করে।
ছন্দ ও সুর—
কবিতাটি মূলত অন্ত্যমিল
নির্ভর এবং এতে একটি সহজ লয় আছে। তবে কিছু কিছু চরণে মাত্রাবৃত্ত বা অক্ষরবৃত্তের
সুনির্দিষ্ট শাসন না থাকায় পড়ার সময় কোথাও কোথাও একটু হোঁচট খেতে হয়। যেমন:
"হাটুরে দিন যাচ্ছে মুছে, হাজার
নষ্ট-কাজে"—এই লাইনটির ওজন তার আগের লাইনগুলোর তুলনায় কিছুটা ভারী মনে হতে
পারে। তবে আধুনিক কবিতায় ভাবের প্রাধান্য থাকলে এটি খুব একটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
সবল ও দুর্বল দিক—
সবল দিক: কবিতার রূপকগুলো
(মেঘ-বৃষ্টি, ডিঙি, জোয়ার-ভাটা) খুব সাবলীলভাবে মিলেমিশে গেছে। বিশেষ করে শেষের
দু লাইন কবিতাটিকে একটি পূর্ণতা দিয়েছে—যেখানে লড়াইয়ের শেষে একাকীত্ব আর অপেক্ষার
চিরন্তন সত্যটি ফুটে ওঠে।
অন্যদিকে
"নষ্ট-কাজে" বা "নিষেধের বেড়া"র মতো কিছু শব্দ কিছুটা ক্লিশে
(বহু ব্যবহৃত)। এখানে আরও অপ্রচলিত বা নতুন কোনো শব্দ ব্যবহার করলে কবিতাটির ধার
আরও বাড়ত।
'প্রবহমান' একটি গভীর জীবনবোধের
কবিতা। এটি নাগরিক জীবনের খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসার আকুলতা এবং জীবনের অনিশ্চয়তাকে
মেনে নেওয়ার গল্প বলে। শব্দ বুননে আপনার পরিপক্কতা প্রশংসনীয়। ধন্যবাদ জানাই কলমে।
চেনা মুখ বড় অচেনা লাগে জীবনের চালচিত্রে
মন তুই কত দূরে, চল ঘুরে আসি মেঘ-পাহাড়ে,
পথেই হঠাৎ মেঘ-বৃষ্টি, আবার আকাশ আলো
কখন যে তোর ফুরোয় আবেগ, কখন বাসিস ভাল।
জীবন স্রোতে ভাসছে ডিঙি অথৈ পারাবার,
নদী এখন বইছে যেমন জোয়ারভাটার মাঝে,
হঠাৎ যদি বাঁধ-ভাঙা স্রোত দুরন্ত বন্যায়,
খুচরো জীবন ভাঙিয়ে: এই উপমাটি চমৎকার। জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত বা সঞ্চয় দিয়ে আমরা যখন বড় কোনো মুক্তির স্বাদ নিতে চাই, তখন এই শব্দবন্ধটি খুব প্রাসঙ্গিক।
সাদা-কালো দ্বন্দ্ব: নৈতিকতা বা সত্য-মিথ্যের দোলাচলকে এটি নির্দেশ করে।

No comments:
Post a Comment