প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

চৈতি হাওয়া—নববর্ষ

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ , ১৪৩৩ চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | সম্পাদকীয়   চৈতি হাওয়া—নববর্ষ "দুগ্ধপোষ্য...

Wednesday, April 8, 2026

শিবের গাজন [১ম পর্ব] | অর্পিতা রায় মোদক

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ধারাবাহিক গল্প
 
অর্পিতা রায় মোদক
 
শিবের গাজন
[১ম পর্ব]

"গর্তে মার্বেল ছুঁড়তে ছুঁড়তে কাঁচা খিস্তি দেয়। তবে মেয়েদের সাথে ফালু কখনোই খেলে না। মেয়েদের সাথে কথা বলতেও যেন তার মানে লাগে! যারা মেয়েদের সঙ্গে খেলে ফালু তাদের বলে— তরা কিমন মদ্দ! মেয়ানোকের লগে ঢুলাঢুলি করস!’"

 
জুতোটা পর্যন্ত পায়ে গলানোর সময় হল না। রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে ভাদু। সাবান জলে ভেজা পা, ভাগ্যিস হোঁচট খেয়ে পড়েনি। ভেজা কাপড়েই আরেকটু এগিয়ে গেল চুলের উপর একটুকরো মেঘের মতো সাবানের ফেনা, ক্রমশ ছোট হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে।
 
কেউ তো নেই! কিন্তু ভাদু স্পষ্ট শুনেছে শিঙা আর ডুগডুগির শব্দ। খটেদাও যেন গাইতে শুরু করেছিল! সেই একই গান। খটেদা যেন কাছা দিয়ে কমলা লুঙ্গি পরে হাততালি দিতে দিতে চিক সুরে গাইছে,
-নন্দি-ভৃঙ্গি, আদিসঙ্গ; মৃদঙ্গ বাজিল রে / ও শিব নাচো রে...
 
ভাদু তো নিজের মনেই কাপড় ধুচ্ছিল। এ মুহূর্তে গাঁয়ের কথা কিংবা বাপ-বোনের কথাও মনে আসেনি। হঠাৎ শিঙা বাজল, ডুগডুগিও বাজল। ডুগডুগি বাজল ভাদুর বুকেও। গাঁয়ের চেনা মানুষগুলো গাজন গাইতে গাইতে এতদূরে এই শহরে চলে এসেছে! তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়েছে ভাদু। যুক্তিতর্কের অবকাশ ছিল না।
 
ঘা ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকায় ভাদু। অতি পরিচিত নিষ্প্রাণ বাড়িগুলোর দিকে চেয়ে রইল কিছুটা সময়। ভরদুপুরে বাড়িগুলো যেন পাহারাদারের মতো বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভেতর কিছু একটা গোল-গোল করে পাক খেয়ে পেটে নেমে গেল। ভাদু ফিরে এল কলতলায়। কাপড়ে সাবান ঘষছে। শ্লথ হয়ে আসছে হাতদুটো। গাড়ি নেই, ঘোড়া নেই, ভাদু পাড়ি দিল কাঁটাঝোপঝাড়ের আড়ালে ধুলোর আস্তরণে ডুবে থাকা বড়াই বাড়িতে।
 
আগে এখানে বড়াই অর্থাৎ বুনো কুলের জঙ্গল ছিল। ছিল বন্য জীবজন্তুও। জঙ্গল কেটে মানুষের বাস গড়ে উঠল এইতো সেদিন। তোর্সা এখান থেকে মাত্র আধ মাইল দূরে। নদীচরের প্রায় সমতলে গড়ে ওঠা পাড়াটিতে বাড়িগুলো কেমন যেন এলোমেলো, ইতস্তত। মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো জমিতে ধান কিংবা ভুট্টা গাছ মাথা দোলায়। কোথাও আবার বাঁশ সুপুরি গাছ জড়াজড়ি করে আড়াল করে রেখেছে বাঁশের মাচান, খেলনাঘরের মতো ঘরে ঠাঁই পাওয়া দেবতা আর জং ধরা টিনের ছাপড়া। পায়ের নীচে মিহি বালি, বার্লির মতো সাদা। নদীর মতো আঁকাবাকা মাটির পথ ধরে এগোলে পা দুটো ধুলোময় হয়ে ওঠে।
 
ভাদুর মধ্যে যেন বিপ্লব ঘটে গেছে! যেদিন বাবার সাথে প্রথম এসে দাঁড়িয়েছিল এই রায়-বাড়ির বারান্দায় সেদিন কী অদ্ভুতই না দেখাচ্ছিল! ভুসভুসে গায়ের রং, ন্যাড়া মাথায় কদমফুলের মতো চুল আর নাকে সাদা সুতো বাঁধা। নাক বিঁধিয়েও কুলের লোভ সামলাতে পারেনি ভাদু। তাইতো নাকে একটা এত্ত বড় গ্যাঁজলা বেরোল। সেদিনের সেই থলে হাতে মাথা কাত করে তাকিয়ে থাকা ভাদু আর নেই। এখন আর যখনতখন কারণে-অকারণে হেসে লুটিয়েও পড়ে না। যখন প্রথম এই রায়-বাড়িতে কাজে ঢুকল তখন ওর বয়স আট ছুঁইছুঁই। ভাদুকে এই রায়-বাড়ির কারাগারে ফেলে কাপড়ের টুকরো দিয়ে তালি-তাপ্পি মারা থলে হাতে হাঁকতে হাঁকতে চলে গেছিল বাবা। ভাদু সেদিন কাঁদেনি। মাথা উঁচিয়ে দেখছিল বড় বড় অট্টালিকার চূড়া।
 
ভাদুরা তিন বোন। ভাদু সবার ছোট। বড়দির বিয়ে হয়ে গেছে দুবছর আগেই। সে-ও একসময় ভাদুর মতো বাসাবাড়িতে কাজ করেছে। গায়েগতরে একটু মাংস লেগে চকচক করে উঠতেই, বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে বিয়ে দিয়েছে ভাদুর বাপ। তিন মেয়ের বাপ রাখাল। একটু বুদ্ধি না ধরলে চলে? রাখালের কাছে এই তিনটি মেয়ে যেন তিন  সমুদ্র, আর সে বৈঠা হাতে হতভাগ্য মাঝি!
 
ভাদুর কপাল মন্দ। নাহলে বড়দির পর মেজদিরই কাজে ঢোকার কথা ছিল। ভাদু তখন মোটে ভাতের ফ্যান গালতে শিখেছে। মেজদি মায়ের সঙ্গে পাট ধুতে কিংবা আলু কুড়াতে গেলে চোঙ গলিয়ে উনুনে ফুঁ দিতে দিতে অঝোরে কেঁদে ভাসাত। তখন যদি ভাদুও মা-দিদির মতো জলকাদায় কাজ করতে পারত তাহলে হয়তো ঘরছাড়া হতে হত না।
 
রাখাল তেমন করিৎকর্মা ছিল না কোনকালেই। সেই একই ব্যবসা। কোনওমতে দিন গুজরান। শাক, কচুর লতি, শাপলা, কলার মোচা ইত্যাদি নিয়ে শহরের অলিতে-গলিতে হেঁকে বেড়ায়— সবজি নিবেন গো দিদি, মুচা, লঙ্কা, লেবু, শাপলা আছে গো।’
 
সন্ধ্যা থেকে পাঁচবার ক্যালেন্ডার দেখে ফেলেছে ভাদু। এ-বাড়িতে পলা বৈশাখের জামাকাপড় কেনার ধুম লেগেছে। ভাদু অনেক আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছে, নিজের জামাটা হাতে পেলেই বাড়ি চলে যাবে। দুদিনের কথা বলে গেলেও আটদিনের আগে কিছুতেই ফিরবে না। সে কোথায় কার সংসার ভেসে যায় যাক, ভাদুর কী!
 
কিছুতেই ঘুম আসছে না। ভাদু মিশে যাচ্ছে চৈত্রের ঠাঠা রোদে, এ বাড়ি থেকে ও বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়াচ্ছে গাজনের দলের পিছনে পিছনে। সেবারে কী কাণ্ডটাই না হল! হাসির দমকে কেঁপে উঠছে ভাদুর শরীর। নড়বড়ে চৌকিটা ভাদুর সাথে তাল মিলিয়ে কচকচ করে হাসছে।
 
হাসির দমকে থরথর করে কাঁপছে ভাদুর পেট। ওই ফালুই গো, ফালু! উচ্চিংড়ের মতো ফালুকে কে না চেনে? ফালুর বয়স তখন বারো কি তেরো। অথচ হাবভাবে যেন সে এক জব্বর মরদ! মাথায় লালচে চুল, গা-হাত-পা গিরগিটির মতো খসখসে, বুকের পাঁজর যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে। মা মরা ছেলে, বাঁধনহারা। ভয়ডরের চিহ্নমাত্র নেই। নদীর কিনারের বালি সরিয়ে কাঁকড়া ধরে আনতে পারে। বর্ষা পাইপাই করে ভেলা চলাতে পারে। আর পারে বন্যা এলে বহুদূর সাঁতরে গিয়ে কাঠের ডুম ধরে আনতে।
 
জামার বোতাম খুলে পাঁইপাঁই করে সাইকেল চালিয়ে বেড়ায় ফালু। গর্তে মার্বেল ছুঁড়তে ছুঁড়তে কাঁচা খিস্তি দেয়। তবে মেয়েদের সাথে ফালু কখনোই খেলে না। মেয়েদের সাথে কথা বলতেও যেন তার মানে লাগে! যারা মেয়েদের সঙ্গে খেলে ফালু তাদের বলে— তরা কিমন মদ্দ! মেয়ানোকের লগে ঢুলাঢুলি করস!
 
ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)