প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, April 8, 2026

চৈত্রকুমার | ইন্দ্রজিৎ রায়

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ছোটগল্প
ইন্দ্রজিৎ রায়
 
চৈত্রকুমার

"শুধু চৈতিচৈতালী এদের ভিড়। কেনচৈত্র কি শুধু মেয়েদেরএই জেন্ডার বায়াস আমি কিন্তু মেনে নেব নাএটা বলে এক তরুণ কবিচায়ের ভাঁড়টা ফেলে হেঁটে চলে গেল।"

 
প্রকৃতি নিয়ে অনেকে গান কবিতা লেখেন। আমিও লিখি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে প্রকৃতি একটা চাপা আতঙ্ক উপস্থাপিত করেছে আমার কাছে। এই আতঙ্কের চরিত্রটা ঠিক ভূত-পেত্নির আতঙ্ক না, ত্রাসও না, একটা খাঁখাঁ মফস্‌সলি চওড়া রাস্তা যেটা যার দুপাশে প্রাচীন ভাঙাচোরা বাড়ি। যারা মফস্‌সলে বড় হয়েছেন এই আতঙ্কটা বুঝবেন। হলদেটে শ্যাওলা ধরা বাড়িগুলো আস্তে আস্তে নিশ্চুপ হয়ে যায়, জং ধরা সাইকেলটা, ঝুড়ি, মাছের জা, বাঁশের বাখারি আস্তে আস্তে যেন উড়ে যায়। হ্যাঁ। একদিন সকালে উঠে দেখি, নেই। এই আতঙ্কটার কথা বলছে নোটবুক। চৈত্রকুমারের। যেটা চৈত্র স্পেশাল, চৈত্র সেলের মতো ৭০% অ। বোঝো ঠ্যালা! দশ টাকার জিনিস, তার দাম হয়ে গেল তিন টাকা। যাক গে।
 
তা সেই রাস্তায় এখনো প্রোমোটিং হয়নি। সে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যেন চলে যাই চেনা শহরে, রাস্তা হারিয়ে ফেলার একটা নেশা পেয়ে বসে। চৈত্র কিছুক্ষণ পরে ঘুরতে ঘুরতে সেখানে আসে, আমি বলি যে এতক্ষণ হেঁটে গলা শুকিয়ে গেছে। চৈত্র বলে জানি তো, সেজন্যই তো জল নিয়ে এসেছি। পিপাসা পাবে জানি। একটা ভেজা ঠান্ডা বাতাস পাক খেয়ে ওঠে গলিগুলোর মধ্যে। দশটা পনেরোটা বছর, পায়ে জড়িয়ে যায় পায়ে জড়িয়ে যায়, লতার মতো। চওড়া রাস্তা, যার দুপাশে পুকুর আমি খুব বেশি পাহাড় পর্বতে যাইনি আমি তো ট্যুরিস্ট নই তেমন। আসলে পৃথিবীতে যারা আসে টুরিস্টের মতো, এটা চৈত্রকুমার বলতো নাকি? কে চৈত্রকুমার? তাদের আর আলাদা করে টুরিস্ট থাকতে হয় না। সেই মানুষেরা মফস্‌সলের গভীরেও পাহাড়, খাদ, পার্বত্য নদী খুঁজে পেতে পারে। কদম গাছের বড় বড় পাতা খসে পড়লে তাদের মনে হয় যে পৃথিবীটা পাশ ফিরছে। চৈত্র বাতাস এটা কাটারির মতো। সমস্ত দৃশ্যপটে কেটে পালটে দেয়, কসাই প্রকৃতি আমি দেখেছি, ঠান্ডা চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী লাগবে? আপনি যদি বলেন রান তো রান, যদি বলেন সিনা তো সিনা, আপনি যা বলবেন সেভাবে কেটে আপনার দৃশ্য, শোকে, অশোকে আপনার কাছে উপস্থাপন করবে চৈত্র।
এর কি কোনো লিঙ্গ আছে? মেয়েদের নাম শুনি চৈত্র দিয়ে ছেলেদের নাম শোনা যায় না তো, চৈত্রকুমার, চৈত্রানন্দ, চৈত্রময়, হয়? আমি জানি না। একমাত্র কবি, নাট্যকার চিরঞ্জীব বসুর ভীষণ প্রিয় উপন্যাস আমার, তার নামটা কাছাকাছি, সেটা চোৎরা পাতার ঘর। বিছুটি, চোৎরা বলে ওপার বাংলায়। চোৎরা আর চৈত্রের কি কোন যোগ আছে কোথাও? পাতা আর চৈত্র। আছে, আছে।
 
দুপুরবেলা, চওড়া রাস্তাটার দুপাশে ফাঁকা হ্যাঙারগুলো দাঁড়িয়ে থাকে যেখানে সন্ধেবেলা, সস্তার জিনিষ পাব, দুঃখী মা আর ছেলে, হাত ধরাধরি করে সেই জামা, টি-শার্ট, নাইটির অরণ্যে ঘোরে। তাদের চোখে শিশুর বিস্ময়। তাদের দেখে চৈত্রকুমারের চোখে জল আসে। ফি বছর দলে দলে মানুষ চৈত্র সেলের বাজার করতে নেমে আসবেন। চৈত্রর সঙ্গে প্রকৃতির যোগ আছে। প্রকৃতি আমার দিকে তাকিয়ে বলে, তোর মাকে চিনতাম রে। তোর দিদাকে চিনতাম। চন্দ্রবাবুকে চিনতাম। চৈত্র বাতাসের ভেতর দাঁড়িয়ে, চন্দ্রবাবুর কথা মনে পড়ে। ধবধবে সাদা গেঞ্জি জামা, পাজামা, কাপ প্লেটে চা খেতেন। আর ফেলুদার মতো, ফিলটার ছাড়া চারমিনার সিগারেট মুঠো করে ধরে টান দিতেন স্যার। চারমিনারের গন্ধে ম-ম করত ওদের বসতবাড়ি। আমরা সপ্তাহে দুদিন করে পড়তে যেতাম, অধুনা কৃতি তবলিয়া, বাল্যবন্ধু সোমনাথ, অতনু, নিশিকান্ত, যে কখনোই হোমওয়ার্ক করত না কারণ তার সময় ছিল না। পরে জেনেছিলাম, নিশিকান্ত ওর বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে লিপ্ত ছিল। এত বড় একটা কর্মকাণ্ড সে করত, শ্যালো পাম্প চালিয়ে ধানখেতে জল দিত। সে ধানগুলো চাল হলে আমরা খেতাম। কোনোদিন জানতেই পারিনি। আমরা তখন করণী শিখছি, নতুন ক্লাসে উঠে, সেটাও চৈত্র মাস। মনে পড়ে অঙ্কে করণীর হোমওয়ার্ক দিয়েছিলেন চন্দ্রবাবু। পরের দিন আমরা সবাই টুকটাক হোমওয়ার্ক করে এসেছি নিশিকান্ত করেনি। চন্দ্রবাবু চারমিনারে একটা টান দিয়ে আলতো করে জিজ্ঞেস করলেন, নিশিকান্ত, করণী করোনি? চৈত্র উড়িয়ে নিয়ে গেছে সেসব। কেটে ফালা করে রান, সিনা। যে শিমুলতলার পাড়ায় মা-বাবার কমল বড়ুয়ার মতো একটা সংসার করে দিয়েছিলাম সেটাও। এখন শুধু প্রকৃতির আঁচলে, শিমুল ফলগুলো ফেটে, ধবধবে সাদা তুলো ছড়িয়ে যায় সারা পাড়া, জেন জী তাদের গাড়ি, বাইকের চাকায় শিমুলের ফল থেঁতলে তুলো মাড়িয়ে চলে যায়। তারা হয়তো জানেই না যে শিমুল তুলো কোথা থেকে আসে, বা জানার প্রয়োজন হয়নি হয়তো। একদিন হবে। চৈত্র সে প্রয়োজন করাবে। এ বাতাস যার গায়ে লেগেছে সে জানে। এই লিঙ্গহীন বাতাসের বিষ কিন্তু চৈত্রকুমার বলে কেউ নেই, সত্যিই নেই চৈত্রসুন্দর, চৈত্রানন্দ, চৈত্রময় নেই, শুধু চৈতি, চৈতালী এদের ভিড়। কেন? চৈত্র কি শুধু মেয়েদের? এই জেন্ডার বায়াস আমি কিন্তু মেনে নেব না, এটা বলে এক তরুণ কবি, চায়ের ভাঁড়টা ফেলে হেঁটে চলে গেল। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে জামাটা একটু ঠিক করে নিলাম। চৈত্র বাতাসে কেমন যেন এদিক-ওদিক হয়ে গেছিল।
 
চৈত্র কাউকে ছাড়ে না।
 

~~000~~

6 comments:

  1. Oshadharon ekti lekha! Sotti toh eta bhebei dekha hoy ni keno শুধু চৈতি, চৈতালী এদের ভিড়!

    ReplyDelete
  2. অসাধারণ। গদ্য পদ্য একাকার

    ReplyDelete
  3. RISHIRAJ CHAKRABORTYApril 12, 2026 at 6:57 PM

    আপনি যদি বলেন রান তো রান, যদি বলেন সিনা তো সিনা, আপনি যা বলবেন সেভাবে কেটে আপনার দৃশ্য, শোকে, অশোকে আপনার কাছে উপস্থাপন করবে চৈত্র।
    True, life has to be cut, sliced up to be presented either to the dogs or the gods
    Great piece of writing
    Leaves nothing untouched

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)