প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

ভাইজ্যাগ ও আরাকু | চন্দ্রানী মজুমদার

বাতায়ন/শারদীয়া/ভ্রমণ/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ভ্রমণ
চন্দ্রানী মজুমদার
ভাইজ্যাগ ও আরাকু

বঙ্গোপসাগরের অপরূপ দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। চারপাশের প্রকৃতি এখানে মনোমুগ্ধকর, কোথাও কোথাও বড় জাহাজও দেখতে পাওয়া যায়। থোতলাকোন্ডাতে একটি ২০০০বছর পুরানো বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ আছে।


কিছুদিন আগে ঘুরে এলাম অন্ধ্রপ্রদেশের ভাইজ্যাগ ও আরাকু থেকে, মোট ৩ রাত্রি ও ৪ দিনের ট্যুর ছিল। হাওড়া স্টেশন থেকে বিকাল ৪টের 'কন্যাকুমারী এক্সপ্রেস' ধরে পরের দিন ভোর ৬টায় পৌঁছে গেছিলাম বিশাখাপত্তনম বা ভাইজ্যাগ স্টেশনে। এখান থেকে অটো ভাড়া করে পৌঁছে গেলাম 'রামাকৃষ্ণা বিচ' বা সংক্ষেপে 'আরকে' বিচে। একটা বাঙালি হোটেলে ভাড়া নিলাম এই সমুদ্রসৈকতের কাছেই। আমাদের হোটেল থেকে আরকে বিচ - খুব সুন্দর দেখা যেত। এরপর হোটেলে ব্যাগ রেখে, ফ্রেশ হয়ে, ব্রেকফাস্ট করে নিলাম, তারপর প্রথম দিনই বেরিয়ে পড়লাম সাইড সিন দেখতে।
টেনেটি বিচ, ভাইজ্যাগ
প্রথম দিন আমরা অটো ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম যথাক্রমে - টেনেটি পার্ক, থোতলাকোন্ডা বৌদ্ধ কমপ্লেক্স ও বিচ ভিউ পার্ক, ভিমলি বিচ, রামনাইডু ফিল্ম স্টুডিও, কৈলাশগিরি, রুশিকোন্ডা বিচ, বালাজি টেম্পল, ইস্কন মন্দির।
টেনেটি বিচ
সন্ধ্যার দিকে দেখলাম - এখানকার বিখ্যাত ৪টে মিউজিয়াম - কুরসুরা সাবমেরিন, এয়ারক্র্যাফট, হেলিকপটার ও ন্যাভাল মিউজিয়াম। টেনেটি পার্ক, রুশিকোন্ডা বিচ এবং ভিমলি বিচ
ভিমলি বিচ
থেকে বঙ্গোপসাগরের অপরূপ দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। চারপাশের প্রকৃতি এখানে মনোমুগ্ধকর
, কোথাও কোথাও বড় জাহাজও দেখতে পাওয়া যায়। থোতলাকোন্ডাতে একটি ২০০০বছর পুরানো বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ আছে। এর অনতিদূরে বিচ ভিউ পার্ক থেকে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য মনোমুগ্ধকর। রামনাইডু ফিল্ম স্টুডিওতে গিয়ে একটা তেলেগু সিনেমার শুটিং হতে দেখেছি এবং স্টুডিয়োটা অনেকটা এরিয়া জুড়ে অবস্থিত, এখান থেকেও বঙ্গোপসাগরের প্রাকৃতিক দৃশ্য বেশ সুন্দর দেখা যায়। বালাজি টেম্পল এবং ইস্কন মন্দির দুটিই সাদা রঙের এবং খুব সুন্দর দেখতে। কৈলাশগিরি অনেকটা উঁচু জায়গায়, কিছুটা গাড়িতে এবং কিছুটা পায়ে হেঁটে যেতে হয়। এখানে শিব ও পার্বতীর যুগ্ম মূর্তি আছে এবং সেটা অনেক বড় মাপের মূর্তি। এখানে বেশ কিছু অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস-এর ব্যবস্থা আছে এবং দিনের বেলায় এখান থেকে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অপরূপ লাগে। এরপর সন্ধ্যাবেলায় আমরা ফিরে আসলাম 'আরকে বিচের' কাছে এবং টিকিট কেটে ৪টি মিউজিয়াম ভিসিট করলাম, যার মধ্যে কুরসুরা সাবমেরিন মিউজিয়াম ছিল অন্যতম। এরপর রাতের বেলায় হোটেলে ফিরে ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম, কারণ সেদিন আমরা খুব টায়ার্ড ছিলাম।
ফিশিং হারবার
দ্বিতীয় দিন আমাদের ভ্রমণ শুরু হল বিশাখাপত্তনম থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত 'সিমাচলম টেম্পল' থেকে। এটি এখানকার খুব বিখ্যাত মন্দির এবং এখানে বরাহ, লক্ষ্মী, নরসিংহ-এর পুজো হয়, মন্দিরে প্রবেশ করার আগে জুতো, ব্যাগ, ক্যামেরা, ফোন সব কিছু বাইরে কাউন্টারে রেখে প্রবেশ করতে হয়। প্রবেশমূল্য  যথাক্রমে ৩০০/-, ২০০/- এবং ১০০/- টাকা, টিকিটের দামের ভিত্তিতে তিন রকম লাইনে দাঁড়ানো হয়, আমরা ৩০০/- টাকার লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, তাই তাড়াতাড়ি মন্দিরে প্রবেশের সুযোগ পাই। এখানে প্রবেশ করে পুজো দিয়ে বেরিয়ে রওনা হলাম সাগর-দুর্গা টেম্পল-এর উদ্দেশ্যে, সাগর-দুর্গা টেম্পলে বেশ কিছু সিঁড়ি পেরিয়ে উঠতে হয়। এই মন্দির দর্শনের পর আমরা গেছিলাম ইয়ারাদা বিচে, এই সমুদ্রসৈকতটা অপূর্ব দেখতে। এখানে ডাবের জল বিক্রি হচ্ছিল, আশেপাশে অনেক নারকেল গাছ, ডাবের জল খেতে বেশ ভাল লাগল। ইয়ারদারা বিচ থেকে বেরিয়ে রওনা হলাম ভাইজ্যাগ-এর বিখ্যাত 'ডলফিন'স নোসের' উদ্দেশ্যে।
ডলফিন নোস
এখানে প্রবেশের সময় দুপুর ৩টে থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। সময়ের আগে পৌঁছে যাওয়াতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ৩টের সময় টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম এবং পায়ে হেঁটে লাইট হাউস
-এর কাছে গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে এর একদম উপরে উঠে গেলাম। এই বাতিঘর বা লাইট হাউসের মাথা থেকে ইয়ারাদা বিচ এবং গঙ্গাভরম বন্দরের মধ্যবর্তী ভূমিরূপটি ডলফিনের নাকের মতন দেখতে লাগে, তাই এর নাম হয়েছে - 'ডলফিন'স নোস'। স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এটিকে সামরিক শিবির হিসাবে ব্যবহার করত। লাইট হাউসের মাথায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম, এখানে খুব হাওয়া বইছিল। তারপর এখান থেকে বেরিয়ে এসে আমরা রওনা হই 'রস হিল সিরিন' নামে একটি খ্রিষ্টান চার্চের উদ্দেশ্যে। এটা পাহাড়ের উপরে অবস্থিত এবং এখানে যাওয়ার রাস্তাটা খুব বিপদজ্জনক ও আঁকাবাঁকা, অবশেষে এখানে পৌঁছে এরিয়াটা ঘুরে দেখি এবং বেশ কিছু ছবিও তুলি। চার্চে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করে বেরিয়ে আসি। এরপর এইদিন আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল – ভাইজ্যাগ ফিশিং হারবার। বিকালের দিকে সেখানে পৌঁছে যাই এবং হারবারে প্রচুর জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। সমুদ্রের জলের রং এখানে পুরো নীল এবং অপূর্ব লাগছিল দেখতে। পাশেই অনেক মহিলা মাছ বিক্রি করছিলেন, এটা একটা মাছের বাজারও বটে। তারপর সন্ধ্যাবেলায় ফিরে এলাম আমাদের হোটেলে এবং দ্বিতীয় দিনের আমাদের ভাইজ্যাগ ভ্রমণ সম্পূর্ণ হল। ২টি বা ১টি স্পট যদিও বাকি ছিল, কিন্তু সেদিন আর হাতে সময় ছিল না।
 
তৃতীয় দিন আমাদের গন্তব্য ছিল - আরাকু ভ্যালি, যেটা ভাইজ্যাগ থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
আরাকু ভ্যালি
বিশাখাপত্তনম রেলস্টেশন থেকে ভোর ৬:৪৫
-এর কিরান্ডুল এক্সপ্রেস ধরে চারপাশের অপরূপ পাহাড় ও উপত্যকা দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম বোরাগুয়ালু স্টেশনে। এখান থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে প্রথমেই পৌঁছালাম 'বোরা কেভে'।
বোরা কেভ, আরাকু
ভারতের বিখ্যাত কয়েকটি গুহার মধ্যে অন্যতম এই গুহাটি চুনাপাথর দ্বারা নির্মিত। এর ভিতরটা খুব ভাল ভাবে 'ডেকোরেট' করা, বেশ কয়েকটি সিঁড়ি পেরিয়ে একটি শিবমন্দিরে পৌঁছাতে হয়।
কৈলাশগিরি
আরেক পাশে সিঁড়ি পেরিয়ে শেষ প্রান্তে গিয়ে খুব সুন্দর ছবি তোলার জায়গা আছে
, সবাই এখানে গিয়ে অনেক ছবি তোলেন। এরপর এই গুহা থেকে বেরিয়ে আমরা এখানকার বিখ্যাত ব্যাম্বো বিরিয়ানি খেতে একটা হোটেলে ঢুকি, খেয়ে যদিও আমার খুব একটা ভাল লাগেনি, কিন্তু স্থানীয় অনেকের কাছেই এটা স্পেশাল বিরিয়ানি বলে শুনেছি। কাটিকাওয়াটার ফলস দেখতে যাওয়ার সময় খুব বৃষ্টি  হচ্ছিল, তবুও সেটা উপেক্ষা করেই আমরা ওয়াটারফলসটা দেখতে চলে যাই, সেদিনই গালিকোন্দা ভিউ পয়েন্টেও গেছিলাম। এরপর আবহাওয়া আরো খারাপ হয়ে ওঠায় এবং সন্ধ্যা হয়ে যাওয়াতে আমাদের ফিরে আসতে হয় ভাইজ্যাগে। আরাকু ভ্যালির আরো কয়েকটি দর্শনীয় স্থান হল – অনন্তগিরি কফি প্ল্যানটেশন, ট্রাইবাল মিউজিয়াম এবং পদ্মপুরাণ গার্ডেনস। সেদিন আমাদের ভ্রমণ এখানেই শেষ হল, আরাকু ভ্যালি থেকে গাড়ি করে ভাইজ্যাগে ফিরতে রাত ৮টা বেজে গেছিল। হোটেলে ফিরে ডিনার করে সেদিন রাতে ঘুমিয়ে পড়ি, সেদিনও খুব টায়ার্ড ছিলাম আমরা।
 
পরের দিন সকালে উঠে আমাদের হোটেলের পাশেই অ্যাকুয়ারিয়াম থেকে ঘুরে এলাম, তারপর কিছুক্ষণ রামাকৃষ্ণা বিচে নারকেল গাছের তলায় বসে রইলাম। এইদিন রাত ৮টায় আমাদের ট্রেন ছিল, বিশাখাপত্তনম থেকে করোমন্ডল এক্সপ্রেস ধরে পরের দিন সকালে পৌঁছে গেলাম হাওড়া স্টেশনে। ভাইজ্যাগ ও আরাকু ভ্রমণের সুন্দর স্মৃতি হৃদয়ে নিয়ে ফিরে এলাম বাড়িতে।
 

~~000~~

1 comment:

  1. শেষাদ্রি শেখর ভট্টাচার্যSeptember 18, 2026 at 8:05 AM

    বিশাখাপত্তনম ভ্রমণের লেখা পড়ে বেশ ভালো লাগলো ।

    ReplyDelete

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)