বাতায়ন/শারদীয়া/রম্যরচনা/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
রম্যরচনা
তাপসকিরণ রায়
বউয়ের সাবস্টিটিউট
একটি অমলিন চুমুর প্রত্যাশায় সে তার ঠোঁট বাড়িয়ে দিল। না, কোন আপত্তি নেই ঝুমার। অমল এবার সাহস সঞ্চয় করে সত্যি একটা মিষ্টি চুমু কেটে বসল ঝুমার নরম ঠোঁটে।
রাত
তখন পৌনে দশটা। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ যেন অমলের বুকের ভেতর কামারের হাতুড়ি
পেটার মতো বাজছে। বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে সে প্রায় আধঘণ্টা ধরে চোরের মতো ছটফল
করছে, কিন্তু কোনো
যানবাহনের নামগন্ধ নেই। শেষ বাসটা ঠিক তার নাকের ডগা দিয়ে কালো ধোঁয়া ছেড়ে ভেগে
গেছে। অটোরিকশার লাইনে একটাও গাড়ি নেই—সব চালকই রাতের মতো পাট গুটিয়ে যার যার
বাসায় হাঁড়ি চড়িয়ে দিয়েছে। এখান থেকে অমলের বাড়ি প্রায় পুরো পাঁচ কিলোমিটার।
ঘরের
লোক অর্থাৎ অমলের বিবাহিতা স্ত্রী বিমলা এতক্ষণে নিশ্চয়ই সোফায় বসে রণচণ্ডী মূর্তি
ধারণ করেছেন। রাত দশটা বাজলেই শুরু হবে মোবাইল ফোনে ঘন ঘন মিসড কল, আর তারপর মিসাইল হামলা! অমল
কপালে জমে ওঠা ঘামটুকু পকেটের নোংরা রুমালটা দিয়ে মুছে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বিয়ে করার পর থেকে তার জীবনের একটা পরম সত্য উপলব্ধি হয়েছে—সংসারে পতির স্থান আর
বাসস্ট্যান্ডে একা দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীর স্থান একই, দুজনেই চূড়ান্ত অসহায়!
ঠিক
সেই মুহূর্তে, অন্ধকার আবছা আলো
চিরে টুংটাং শব্দে একটা হাত-রিক্সা এগিয়ে এলো। রিক্সাওয়ালা অমলকে দেখে দাঁত
কপাটি বের করে ডেকে উঠল,
-যাবেন নাকি বাবু?
-যাওয়া দরকার কিন্তু—
অমল
ইতস্তত করল। গিয়ে দেখে রিক্সার ডানদিকটা দখল করে পরম শান্তিতে বসে আছে এক তরুণী।
পরনে সাধারণ শাড়ি, কিন্তু চোখেমুখে এক
অদ্ভুত চপলতা। রিক্সার মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,
-আমার কোনো আপত্তি নেই দাদা।
আর্জেন্ট হলে উঠেই পড়তে পারেন—
আর
কোনো দ্বিতীয় চিন্তা না করে অমল রিক্সায় উঠে বসল। রাত দশটা বেজে গেছে। বাস পাওয়া
গেল না, অটোরিকশার হদিস নেই, অগত্যা—তাকে যেতেই হবে।
রিক্সা দুলতে দুলতে চলতে শুরু করল।
–আমার নাম ঝুমা, মেয়েটি নিজেই প্রথম পরিচয়
দিল।
সভ্যতার
খাতিরে ও কিছুটা ভাল মানুষের ভাব ধরে রাখতে অমল নিজের নাম বলল,
-আমার নাম অমল।
রাস্তার
বাঁক আর খানাখন্দের ধাক্কায় ঝুমা মেয়েটির শরীর বারবার অমলকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। অমল
মনে মনে হিসেব মেলাতে লাগল—না,
বিষয়টা
খারাপ লাগছে না তো! আসলে নর ও নারীর ঘর্ষণে সামান্য উত্তাপের সৃষ্টি হতেই পারে, ওটা তো স্রেফ ফিজিক্সের
নিয়ম! অমল মেয়েটিকে আড়চোখে দেখে। মেয়েটিও কি তাই—নাহ্, এমনি চার চোখের মিলন ভাল না, বেশি তাকালে আবার যদি নজর লেগে যায়!
ঘরে
অমলের নিজের বউ বিমলা আছে। অমল সুযোগ বুঝে দেখে নিল, এই মেয়েটি অর্থাৎ ঝুমার সিঁথিতেও সেই সিঁদুরের ছোঁয়া আছে।
লাল টকটকে সিঁদুর। মানে এই মেয়েটিও বিবাহিতা এবং কারো না কারো গৃহিণী। অমলের
মনটায় কেমন একটা উসখুস ফিলিং হচ্ছিল!
পাশাপাশি
বসে থাকতে থাকতে অমলের মাথায় নানাবিধ রোমান্টিক আর দার্শনিক চিন্তা চড়চড় করে
উঠতে লাগল। তার মনে হলো—আহা,
এই
নির্জন রাতে পাশাপাশি বসে থাকতে থাকতে পাশে যদি নিজের বউ বিমলা থাকত! কিন্তু বিমলা
তো পাশে বসলেই সংসারের ডাল-চালের দর আর শাশুড়ির খোটার ফিরিস্তি নিয়ে বকবক শুরু করে
দেবে। সেখানে এই মেয়েটির নীরবতা কত মধুর!
হঠাৎ
রিক্সার একটা ঝাঁকুনিতে মেয়েটির একটি হাত অমলের হাত ছুঁয়ে গেল। অমলের শরীর দিয়ে
যেন মৃদু বিদ্যুৎ খেলে গেল! ওর মনে হলো যেন ঠিক তার নিজ বউয়েরই ছোঁয়া। অমল অমনি
সাহসে ভর দিয়ে ইচ্ছা করে ঝুমার হাঁটু ছুঁয়ে দিল। মনে মনে বলল, "বাহ্! কেমন চমৎকার বউ বউ
ফিলিং হচ্ছে!" এমনি ভাবে অমল স্পর্শানুভূতির স্বর্গীয় আমেজে মজে গেল। মনে
মনে ভাবল, বিয়ের বারো বছর পর
বউয়ের টাচ পেতে গেলে যে কাঠখড় পোড়াতে হয়, এখানে ফ্রিতে সেই সবই পাওয়া যাচ্ছে!
একটা
সময় মনে হলো, ঝুমার মাথাটা ধীরে
ধীরে ঢলে পড়ে তার কাঁধে ঝুঁকে পড়েছে। মেয়েটা হয় ঘুমাচ্ছে, না হয় ঝিমাচ্ছে। অমল আর
নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কাব্যিক আবেগে ভেসে গিয়ে সে তার একটা হাত নিয়ে ঝুমার
পিঠ বেড় দিল। আহা! ও যেন একদম অরিজিনাল বউয়ের স্বাদ ভালভাবে পাচ্ছিল। একটি অমলিন
চুমুর প্রত্যাশায় সে তার ঠোঁট বাড়িয়ে দিল। না, কোন আপত্তি নেই ঝুমার। অমল এবার সাহস সঞ্চয় করে সত্যি একটা
মিষ্টি চুমু কেটে বসল ঝুমার নরম ঠোঁটে।
আর ঠিক
তখনই ঘটে গেল মহা অঘটন! এক সেকেন্ডের মধ্যে ঝুমা ত্রস্তে সোজা হয়ে বসল। তার মুখের সেই ঘুমের ভাব উবে
গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক মারাত্মক বাণিজ্যিক হাসি। ঝুমা খুব ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,
-আমার ৫০০ টাকা চাই—
হতবাক
হয়ে গেল অমল। তার মাথার ভেতরে যেন একশোটা পটকা একসাথে ফেটে গেল! সমস্ত ফিলিং, রোমান্স আর কাব্যিক আবেগ যেন
তৎক্ষণাৎ আইসক্রিমের মতো গলে জল হয়ে গেল। অমল তোতলাতে তোতলাতে বলল,
-ম-মানে? কীসের ৫০০ টাকা?
মেয়েটা
এবার একটু কঠিন ও পেশাদারী গলা নিয়ে বলল,
-লোক ডাকার আগে তাড়াতাড়ি ৫০০
টাকা দিন বলছি! রিক্সা চড়ার ভাড়ার সাথে, বউ-বউ ফিলিং, দেওয়ার জন্য আলাদা
চার্জ আছে না? আপনার মতো রোমান্টিক
বাবুদের সার্ভিস দিতেই তো আমরা নাইট ডিউটিতে বেরোই!
অমল
চোখ ছানাবড়া করে রিক্সাওয়ালার দিকে সে একবার তাকাল। রিক্সাওয়ালা মোড়ের
লাইটপোস্টের আলোয় পানের পিক ফেলে অমলের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল,
-বাবু, দিয়ে দেন! কাস্টমার সার্ভিস একদম অরিজিনাল পাইছেন তো? অমুক বাবু তো সেদিন হাজার
টাকা দিয়া গেছিল!
অমল
স্পষ্ট বুঝতে পারল ওদের মধ্যে আগে থেকেই নিখুঁত বাণিজ্যিক যোগসাজশ ছিল। এরা স্রেফ
রাস্তার অসহায় রোমান্টিক পুরুষদের ধরে, বউয়ের সার্ভিস, দিয়ে কড়া ক্যাশ আদায়
করে!
অগত্যা
অমল আর কোনো তর্ক না করে, পকেটে রাখা একমাত্র
৫০০ টাকার নোটটা তুলে দিল মেয়েটির হাতে। মনে মনে ভাবল, নিজের বউকে শাড়ি কিনে দিতে গেলে পাঁচ হাজার টাকা খসে যায়, সেখানে পাঁচশো টাকায় এক
ঘণ্টার নিখুঁত, বউ বউ ফিলিং, আর একটা চুমু—হিসেব করলে
কিন্তু লোকসান হয়নি একেবারেই!
বিনা
বাক্য ব্যয়ে অমল রিক্সা থেকে ঝপ করে নেমে গেল। পকেটে আর এক আনা পয়সাও নেই, বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে। কিন্তু অমলের মুখে তখন এক বিজয়ের
হাসি। সে গটগট করে সামনের অন্ধকার রাস্তায় হেঁটে মিলিয়ে গেল, যেন কত বড় একটা লাভজনক ডিল
শেষ করে ঘরে ফিরছে!
~~000~~
No comments:
Post a Comment