প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

আর্ন্তজাতিক শান্তি বিদ্যালয় [২য় পর্ব] | কৌশিক চট্টোপাধ্যায়

বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/০৮ই আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
কৌশিক চট্টোপাধ্যায়
আর্ন্তজাতিক শান্তি বিদ্যালয়
[২য় পর্ব]

"নদীর নীচে এক জায়গায় একটা পাথরের কাছে জলের স্রোত ঘুরপাক খেয়ে তারপর এগিয়ে যাচ্ছে।‌ ওখানে একটা চোরাস্রোত আছে। তাই নদী ওখানে একটু ঘুরছে কিন্তু থামছে না।"

 
পূর্বানুবৃত্তি যুদ্ধ-পীড়িত দেশগুলোর অনাথ কিশোরী, কিশোরদের এখানে রেখে পড়াশোনার সুযোগসুবিধা করে দেওয়া। এখানে নানা তথাকথিত শত্রু দেশের বাচ্চাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তারপর…
 
২
আজ সকাল থেকেই ০০১-র মুখ খুব গম্ভীর। একটা ই-মেল এসেছে। তাতে লেখা আছে যে আগামী পনেরো দিনের মধ্যে যদি তাদের স্কুল ধর্মের শরণাপন্ন না হয় তবে তাদের স্কুলের উপর জঙ্গি হানা হবে। ০০১-র কাছে বড় প্রিয় এই বিদ্যালয়। একে সবরকমের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে তৎপর তিনি। ধর্ম ও দেশের পরিচয় অধিকাংশ সময়েই মানুষের মধ্যে দ্বেষের উদ্রেক করে। তাই এই পরিচয়ে ছেলেমেয়েদের বড় করতে চান না তিনি। কিন্তু কাজটা যে কী কঠিন তা তিনি নিজেও ভাল করে জানেন। প্রথমদিকে অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকারা রাজি ছিলেন না। তাদের বোঝাতে হয়েছে। বোঝাতে হয়েছে অশিক্ষক কর্মচারীদের। সবাই মিলে একটা টিম না হলে কি আর ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ গড়া যাবে! এখন কয়েকমাস হলো বিদ্যালয় একটা পথে এসেছে। অর্থসাহায্য আসছে বেশ কিছু। কিন্তু এই উটকো ঝামেলায় পড়তে হবে ভাবা যায়নি।
 
০০১ নিজের রুম থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের দিকে হাঁটা দিলেন। যখনই মন খারাপ লাগে তখনই নদীর ধারে একটা অর্জুন গাছের তলায় বসে থাকেন। নদীর সঙ্গে আপনমনে কথা বলেন। নদী মাঝেমধ্যে তাকে পরামর্শ দেয়। তিনি দিশা খুঁজে পান। আজও তেমন ভাবেই বসলেন নদীর পাশে। কুলকুল জলধারা বয়ে চলেছে আপনমনে। কে যে এদের নাম দেয় কে জানে! জলধারা বয়ে চলেছে চলুক না। কোন দেশের থেকে আসছে জানতে হবে কেন? আগে তো দেশ ছিল না, ধর্ম ছিল না কিন্তু মানুষের অসুবিধা ছিল না। এখনো আমাদের মধ্যে দেশ, জাতি আর ধর্মের বীজ এত গভীরে ঢুকে আছে যে বিদ্বেষ যাচ্ছে না মন থেকে। এদের মধ্যে কেউ এই বিদ্যালয়ের ক্ষতি করতে চাইছে। রাবণকে যেমন মেরেছিল বিভীষণ, যীশুকে জুডাস। ০০১ লক্ষ করলেন নদীর তলায় পাথর পড়ে আছে কিন্তু নদী তাদের সঙ্গে লড়াই করছে না। সে তাদের সঙ্গে বয়ে চলেছে। পৃথিবী যুদ্ধে এগোয় না। তাই চণ্ডাশোকের চেয়ে ধর্মাশোক বেশি শক্তিশালী হয়।‌ সম্রাটরা বুদ্ধের পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ে। মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি আছে নিজেকে জাহির করার, অন্যের উপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করার। সে রাষ্ট্রপ্রধান হোক বা ধর্মগুরু। অধিকাংশই অন্যকে ছোট করে, হেয় করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করে। একটা ছোট শিশু যেমন নিজের মনের আনন্দে খেলে, একটা নদী যেমন নিজের আনন্দে বয়ে চলে মানুষ কেন এভাবে আনন্দে থাকতে পারে না? তারা সবসময়ই চেষ্টা করে অন্যকে ঠকিয়ে নিজের সম্পত্তি বাড়ানোর। তাই তারা খাবারে ভেজাল দেয়, সারে ভেজাল দেয়, সিমেন্টে ভেজাল দেয়, ওষুধে ভেজাল দেয়। সবকিছুর মধ্যেই ভেজাল দেয়। এদের সীমাহীন লোভ সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছে। এদের বিরুদ্ধে লড়াই করে পারা যাবে না। কিন্তু যদি নতুন প্রজন্মের অন্তত কয়েকজনের মধ্যেও আদর্শবোধ গেঁথে দেওয়া যায় তবেই জীবনে কিছু করা হবে। কিন্তু এখানে পোকা ঢুকেছে। কেউ তার স্বপ্নের প্রকল্প ধ্বংস করতে চাইছে। কে সে? মনে হচ্ছে তিনি যেন ধরতে পেরেছেন। কারোর কারোর মধ্যে জাতিবিদ্বেষ ও ধর্মবিদ্বেষ এত প্রবল যে তা অন্যের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। এই হিংসা যত প্রবল হয় মূল ধর্ম তত দূরে সরে যায়। ০০১-র মনে পড়ে যায় অনেক পুরনো কথা। তাদের বাড়ির থেকে কিছু দূরে এক ধর্মীয় মঠে এক সাধু আরেকজন সাধুকে খুন করে টাকাপয়সা নিয়ে পালিয়ে যায়। এই ঘটনা তার উপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরে নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তোলেন। ০০১ লক্ষ্য করলেন নদীর নীচে এক জায়গায় একটা পাথরের কাছে জলের স্রোত ঘুরপাক খেয়ে তারপর এগিয়ে যাচ্ছে।‌ ওখানে একটা চোরাস্রোত আছে। তাই নদী ওখানে একটু ঘুরছে কিন্তু থামছে না। ০০১-র মুখে হাসি ফুটে উঠল। সমাধান পাওয়া গেছে মনে হচ্ছে। তিনি এবার উঠে দাঁড়ালেন। একবার আকাশকে প্রণাম করলেন আর একবার নদীকে। ০০১ কোনো দেবদেবী মানেন না কিন্তু আকাশ, বাতাস, নদী, সমুদ্র, বৃক্ষ, মাটি ও আগুনের বন্দনা করেন। বলেন যে এরাই হলো মানুষের রক্ষক, মানুষের প্রকৃত বন্ধু। ০০১ আবার বিদ্যালয়ের দিকে ফিরে চললেন।
 
৩
বহুদিন পর ০০১ একটা মিটিং ডেকেছেন। শান্ত সদাহাস্যময় মানুষটি সচরাচর মিটিং-ফিটিং ডাকেন না। কিন্তু এবার সেই তিনিই মিটিং ডেকেছেন। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো মিটিংয়ে শিক্ষকদের পাশাপাশি অশিক্ষক কর্মচারীদেরও ডেকেছেন। অনেকেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে কী বিষয়ে ডাকা হয়েছে তাই নিয়ে কেউ কিছু জানে কিনা! ০০২, ০০৩ থেকে শুরু করে সবাই উপস্থিত। ০০১ রুমে ঢুকতেই সবাই চুপ করে গেল। ০০১ সবাইকে নমস্কার করলেন। তারপর সবাইকে বসতে বললেন। শেষ জন না বসা পর্যন্ত তিনি হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, "আপনারা লক্ষ্য করেছেন কিনা জানিনা তবে আমাদের বাগানের বেশ কয়েকটি গাছ কেউ কেটে ফেলেছে। ফসলের ক্ষেতে পোকার আক্রমণে বেশ ক্ষতি হয়েছে।" এই পর্যন্ত বলে একটু থামলেন। ০০৮ বয়স্কা মহিলা। ৬০ বছর অতিক্রান্ত। বিদ্যালয় শুরুর প্রথম থেকেই আছেন।‌ তিনি ফোঁস করে উঠলেন, "এইসব ছেঁদো কথা বলার জন্য আমাদের ডেকেছেন? এসব তো ওদের বললেই হতো।" এই বলে তিনি যাদের দিকে ইঙ্গিত করলেন তারা যেন ০০৮-র ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। তাদের কেউ উঠে কিছু বলার আগেই ০০১ তাদের হাত তুলে মৃদু হেসে থামালেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, "আমাদের সিলেবাসে কোনো বিশেষ দেশের ইতিহাস পড়ানোর কথা নয় কিন্তু বিশেষ একটি দেশের ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে গত একমাস ধরে।‌ কেন জানতে পারি কি? আমাদের এখানে কোনো ধর্মের প্রার্থনা বিদ্যালয়ের থেকে নিষেধ। ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের মধ্যে ধর্মাচারণ নিয়ে কোনো বারণ নেই কিন্তু আমাদের স্কুলের পক্ষ থেকে জোর করে সবাইকে একটি ধর্মের প্রার্থনা করানো হচ্ছে। কেন?"
ঘরে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। ০০৫ গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, "প্রার্থনা মনকে শুদ্ধ করে, একাগ্রচিত্ত করে। তাই এটা একদমই আবশ্যক।"
"তাই নাকি! তা এসব আপনার মস্তিষ্ক প্রসূত বুঝতে পারছি। তা এসব শুরু করার আগে একবার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না? জানেন না এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তা বোর্ডে পাশ করানো প্রয়োজন?"
"বোর্ডে পাশ মানে তো আপনার অনুমতি! সে তো আপনি কখনো দেবেন না। শালা একটা কুলাঙ্গার নাস্তিক। শিশুদের ধর্ম পালন করতে না দিয়ে তো ওদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিচ্ছেন সে বোধ আছে মিঃ রবিন?"
রাগে থরথর করে কাঁপছিলেন ০০৫। ০১৩ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "আপনি এমনভাবে ওনাকে অপমান করতে পারেন না। উনি শুধু এই স্কুলের স্থাপয়িতা নন উনি আমাদের সবার মার্গ দর্শক। একবার ভাবুন তো এখানে আসার আগে আমরা সবাই অত্যাচারের শিকার হয়েছিলাম। আমাদের প্রত্যেকের বুকে ছিল হিংসার দগদগে ক্ষত। সবসময় বদলা নেওয়ার কথা ভাবতাম।"
"ঠিক বলেছেন" বলে উঠল ০২২। "তখন শুধু ভাবতাম কী করে বিপক্ষ ধর্মের লোকদের খুন করা যায়। সেই পাশবিক অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়ে আমাকে এই উত্তরণের পথে নিয়ে এসেছেন স্যার! তাঁকে প্রণাম জানাই।"
"তাই নাকি! এসব কি সাজানো নাটক হচ্ছে? সত্যি কথা বলতে লজ্জা কোথায়? যারা আমার ছেলে, স্ত্রী, মা-কে খুন করেছে তাদের কী করে মাফ করতে পারি? ওদের খতম না করতে পারলে শান্তি নেই।" বললেন ০০৩। ০০১ ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন ০০৩-র কাছে। তারপর শান্ত গলায় বললেন, "তারপর?" ০০৩ হতভম্ব গলায় বলল, "মানে?"
"ওরা মারল, তুমি মারলে, তারপর আবার ওরা মারল, তারপর আবার তুমি মারলে। এভাবেই চলতে থাকলে কোথায় গিয়ে থামব আমরা?"
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 8 (Last 7 days)