প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না [২য় পর্ব] | কামাল কাদের

বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/০৮ই আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
কামাল কাদের
কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না
[২য় পর্ব]

"কলেজের প্রথম দেখা থেকে শাহনাজের প্রতি সিরাজের দুর্বলতা ছিল। সুযোগও মিলে গেল। সে বছরই কলেজের ছাত্র সংসদের সে-ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলো।"

 
পূর্বানুবৃত্তি ডাক্তার সিরাজুল ইসলাম অন্যান্য দিনের মতো ‘সার্জারি’ শেষ করে সিরাজ ঘরে ঢুকতেই ল্যান্ড লাইনের টেলিফোনটা বেজে উঠল। একান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে রিসিভারটা ওঠাল। তারপর…
 
কথাগুলি বলে রোজি আবার কাঁদা শুরু করল। সিরাজ রোজিকে সান্ত্বনা দিয়ে তাকেও সাথে করে তার গাড়িতে তুলে নিল ভাবল এত বড় বাড়িতে মা-বাবার অনুস্থিতিতে এতটুকু মেয়েকে কীভাবে একা রেখে যাওয়া যায়। ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে শাহনাজকে ভরতি করে রোজিকে সাথে করে সিরাজ তার বাসায় নিয়ে আসল। সময় বুঝে সিরাজ রোজিকে জিজ্ঞাসা করল,
-রোজি, আসল ঘটনাটি কী?
ছোট বাচ্চা মেয়েও কীইবা বোঝে! তবুও ওর কথাবার্তায় সিরাজ ধারণা করতে পারল যে তার মা-বাবার সাথে এরকম ঝগড়াঝাঁটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু আজকের মতো ঘটনা কখনো ঘটেনি। ঝগড়া শুরু হলেই মা সব সময় আব্বাকে বলত,
-ইউ আর এ লায়ার।
কেন বলতো সে জানে না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দুজনে ডিনার সেরে ড্রয়িং রুমে এসে বসল। সিরাজ লক্ষ্য করল রোজি মনোযোগের সাথে টেলিভিশনে কার্টুন দেখছে। ওকে আগের চাইতে কিছুটা রিল্যাক্স মনে হচ্ছে। সিরাজ, তার নিজের সোফাটায় গা ছেড়ে বসল। এরই মধ্যে সিনেমা, নাটকের মতো হুহু করে তার অতীত জীবনের ছবি ভেসে উঠা শুরু হলো। শাহনাজ কলেজের নামকরা সুন্দরী তেজস্বিনী বক্তা। এক ডাকে সবাই তাকে চেনে। অতি জটিল তত্ত্ব বা বিষয় সহজে সুন্দর ভাষায় বুঝিয়ে বলতে সে অদ্বিতীয়া। কলেজের শ্রোতারা তার বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে পড়ত। অনেক ছেলেই তার আশেপাশে ঘুর ঘুর করত। কিন্তু সে কাউকে পাত্তা দিত না। উচ্চ আকাঙ্ক্ষা আর উচ্চভিলাসী মেয়ে, প্রথম সুযোগেই কলেজের সেক্রেটারি হতে তাকে বেগ পেতে হয়নি।
 
কলেজের প্রথম দেখা থেকে শাহনাজের প্রতি সিরাজের দুর্বলতা ছিল। সুযোগও মিলে গেল। সে বছরই কলেজের ছাত্র সংসদের সে-ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলো। পাশাপাশি ছাত্র সংসদের কাজকর্মের ফলে দুজনের মেলামেশাটা গাঢ় হয়ে উঠল। হঠাৎ করে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সিরাজ খবর পেল, শাহনাজের বিয়ে। পাত্র বিলেতফেরত অটো মোবাইল ইঞ্জিনিয়ার মিস্টার শফিকুল হক। বিয়ে করে বউকে নিয়ে বিলেতে চলে যাবে। উচ্চভিলাসী আর উচ্চ আকাঙ্ক্ষার শাহনাজ এ বিয়েতে অমত করতে পারেনি। এদিকে সিরাজ নিশ্চল নিশ্চুপ হয়ে নিজেকে বাস্তব পর্দা থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো। তার আর কী বা করার ছিল! প্রতিবাদ করার কোনো ক্ষমতা ছিল না। ছাত্র ছিল, হাত-পা বাঁধা, কোনরকম ঝুঁকি নিতে সাহসে কুলায়নি। কার সাথে সে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে? কোথায় সেই বিলেতফেরত ইঞ্জিনিয়ার জামাই, আর কোথায় সে ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া ছাত্র। শুধু মনের ভিতরে ছিল এক মানসিক জ্বালা, সে জ্বালা আজও বহন করে চলছে।
 
দীর্ঘদিন পরে শাহনাজকে এভাবে দেখতে পাবে সেটা তার কল্পনার বাইরে ছিল। পরে একসময় দেশে থাকতে সে শুনেছিল যে শাহনাজের স্বামী অটো-মোবাইল ইঞ্জিনিয়ার ছিল না, আসলে সে ইংল্যান্ডের কোভেন্ট্রিতে গাড়ি বানাবার এক ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক হিসাবে কাজ করত। শাহনাজের পরিবারের কাছে সে সত্য গোপন করে বিয়েটা করেছিল।
হঠাৎ রোজির ডাকে সিরাজের দিবাস্বপ্ন ভঙ্গ হলো।
-ডক্টর তুমি না বলেছিলে দশটা বাজলে হসপিটালে একটা ফোন করবে, মা কেমন আছে জানার জন্য, সে কখন দশটা বেজে গেছে।
সিরাজ প্রায় লাফ দিয়ে উঠে বলল,
-হ্যাঁ! তাই তো।
ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে সিরাজ ফোন করল। ওপার থেকে,
-ডক্টর গুড নিউজ, তোমার রোগী চোখ খুলেছে, আউট অফ ডেনজার, বিপদ নেই কিন্তু এখনো সে ক্লান্ত। তার বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে কাল ডিসচার্জ করা যাবে। কনসালটেন্ট তাই বললেন।
খবরটা পেয়ে রোজি দারুণ খুশি, ও বলল,
-ডক্টর তুমি না থাকলে আমার মা মারা যেত।
সিরাজ বলল,
-দূর বোকা, তা হয় নাকি! বুদ্ধিমতী মেয়ের মতো তুমি আমায় ফোন না করলে আমি কি কিছু জানতাম?
-ওকে ডক্টর, আমিই জিতেছি।
সুন্দর মিষ্টি হেসে রোজি জানাল।
 
পরদিন সিরাজ রোজিকে সাথে করে হাসপাতালে গেল। ইতিমধ্যে শাহনাজকে এমার্জেন্সি ওয়ার্ড থেকে জেনারেল ওয়ার্ডে নিয়ে এসেছে। ওয়ার্ডের সামনে রোজিকে ছেড়ে দিয়ে সিরাজ বলল,
-রোজি যাও তোমার মার সাথে দেখা করো গিয়ে।
রোজি প্রশ্ন করল,
-ডক্টর তুমি আমার সাথে আসবে না?
-আমি খুবই লজ্জিত রোজি তোমার সাথে আসতে না পেরে, আমাকে এক্ষুনি একটা রোগী দেখতে যেতে হবে খুবই আর্জেন্ট।
সিরাজ উত্তর দিল।
-সত্যিই, তবে তোমাকে আর আটকাব না। কিন্তু আমি বাসায় ফিরেই তোমাকে ফোন করব আর তোমাকে না পেলে আমি আবার কাঁদতে শুরু করব।
রোজি অভিমানের সুরে বলল।
-ঠিক আছে তবে তাই কোরো।
সিরাজ জানাল। রোজি যতই ওয়ার্ডের ভিতরে অগ্রসর হতে লাগল তার সাথে তার জুতোর মচ মচ শব্দ ক্রমশ কমে আসতে লাগল আর সেই সাথে সিরাজের বুকের ভেতরের পুরানো জ্বালাটা আবার জ্বলতে শুরু করল যে জ্বালা শুরু হয়েছিল সেই কবে সেটা আবার নুতন করে সন্ধ্যাপ্রদীপের মতো জ্বলে উঠল।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)