প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

কৃষ্ণসার হরিণের খোঁজে | অঞ্জনা মজুমদার

বাতায়ন/শারদীয়া/ভ্রমণ/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ভ্রমণ
অঞ্জনা মজুমদার
কৃষ্ণসার হরিণের খোঁজে
 
পুরীতে আমরা বাঙালি ফিরে ফিরে আসি। পুরীতে আসব আর সমুদ্র স্নান করব না, তা কি হয়? প্রতিবারই স্নান করি। এবারের স্নানের সময় একটা ছোট্ট ঘটনা ভুলতে পারবো না। সমুদ্রের ঢেউ আসে আবার ফিরে যায়। ঢেউয়ের ধাক্কায় সব এলোমেলো হয়ে যায়। সেই ধাক্কায় পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তাই সাবধানে ছিলাম যাতে পড়ে না যাই। কিন্তু বাচ্চাদের ওই ধাক্কায় পড়ে ভেসে পাড়ের দিকে আসতে খুবই মজা লাগে। কয়েকটি বাচ্চা ঢেউয়ের  সাথে এই খেলায় মেতে ছিল। একটা ছোট্ট ছেলে এমনই ঢেউয়ে ভেসে আমাকে ধাক্বা দিল। স্বাভাবিকভাবেই পড়ে গেলাম। আমি নীচু স্বরে বললাম, সেই আমাকে ফেলেই দিলি।
 
আশ্চর্য ঘটনাটি এর পরে। ঢেউয়ের ধাক্কা সামলে বাচ্চাটি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল যাতে আমি উঠে দাঁড়াতে পারি। আমি অবাক! হয়তো তিনফুট উচ্চতা, রোগা টিংটিঙে ছেলেটির সহমর্মিতা আর স্পোর্টসম্যান স্পিরিটের কাছে আমি হতবাক। আমার দেহের ওজন বাচ্চাটি তুলতে পারার কথা নয়। তাও সাহসের সঙ্গে সাহায্যের হাত বাড়ানোর যে মানসিকতা সে দেখাল, কত বড় বড় মানুষের তা থাকে না। এর এই প্রবণতা ওকে ভাল মানুষ হতে উদ্বুদ্ধ করবে।আশেপাশে আরও অনেক লোকজন জড়ো হয়েছে আমাকে সাহায্য করার জন্য। তার আর প্রয়োজন নেই দেখে সে আবার জলে ঢেউয়ের তালে মাতামাতি করতে শুরু করল। আমার ইচ্ছে ছিল ভারতের নতুন প্রজন্মের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় মানুষের সঙ্গে ভাব-পরিচয় করব কিন্তু খেলার নেশায় সে আর আমার কাছে ফিরে এলো না। ভিড়ে হারিয়ে গেল। তার নামটাও জানতে পারিনি।
জগন্নাথ মন্দিরের ধ্বজা উত্তোলন
এবার পুরীতে গান্ধী মেমোরিয়াল, গোল্ডেন বিচ আর ব্লু ফ্ল্যাগ বিচে গেলাম। আগে কোনওবার যাইনি। গান্ধী মেমোরিয়াল-এর তৈরি অদ্ভুত নিয়ম এখানে সকাল দশটা পর্যন্ত খোলা থাকে। পরে বিকালে আবার তিনটের সময় খোলে। এখানে গান্ধী মূর্তি, একটা সুন্দর ভাস্কর্য আর প্রচুর গাছ আছে। কাজুবাদাম-এর গাছও লাগানো অনেক। কাজুবাদাম ফলে আছে। মাটিতেও পড়ে আছে।
গান্ধী মূর্তি
এবার গোল্ডেন বিচ। এখানে প্রবেশমূল্য জনপ্রতি কুড়ি টাকা। আর যদি কেউ এখানে সমুদ্রে স্নান করতে চায় তবে পঞ্চাশ টাকা টিকিট কাটতে হবে। এই সমুদ্রতট পুরীর অন্যান্য সমুদ্রতটের মতো নয়। এটি পরিচ্ছন্ন আর ভিড়ও কম। এখানে সমুদ্র স্নান নিরাপদও। কারণ প্রচুর নিরাপত্তা রক্ষীর পাহারা। পাশাপাশি ব্লু ফ্ল্যাগ বিচ। দুই বিচের পাশ দিয়ে সুন্দর বাঁধানো পথ দুপাশে গাছের সারি। ওই পথ গিয়ে পৌঁছে গেছে আমাদের হোটেল আর তার সামনের জনসমুদ্র সমৃদ্ধ সমুদ্র তটের কাছে। গোটা পথ পার হয়ে আসতে মোট ঘন্টা আড়াই হাঁটতে হয়েছে আর প্রায় আট কিমি হাঁটতেও হয়েছে।
 
পরদিন সকালে পুরী স্টেশন থেকে খুরদারোড যাবার ট্রেন। সেখানে ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করে রম্ভা যাবার ট্রেন। পুরী থেকে রম্ভা সড়কপথেও আসা যেত, কিন্তু আমরা ট্রেনেই ভ্রমণ করতে চেয়েছিলাম। সেই মতো রম্ভা পৌঁছে গেলাম। সেখান থেকে অটোরিকশা করে রম্ভা পান্থনিবাস।
 
এখানে বেশ বড় এরিয়া জুড়ে গোটা দশেক কটেজ আর রিশেপশনের বিল্ডিংয়ের তিনতলায় অতিথি নিবাস। প্রচুর গাছপালায় ঘেরা সুন্দর বাগানের মধ্যে কটেজ। একটা কটেজে বিশাল ড্রইংরুম দুটো সিলিং ফ্যান, এয়ার কন্ডিশন বেডরুম,  বিরাট ওয়াশরুম আর একটা ড্রেসিংরুমও আছে। সরকারি ব্যবস্থায় অঢেল জায়গা।
 
পান্থনিবাসের পেছনের দ্বার দিয়ে সুন্দর বাঁধানো পথ দিয়ে চিলকা লেকের ধারে। এখানে বাঁধানো ঘাটে নৌকা অপেক্ষা করছে। চিলকা লেকে ব্রেকফাস্ট আইল্যান্ড,
ব্রেকফাস্ট আইল্যান্ড
ডাইনোসর-এর মূর্তি-সহ
বার্ড আইল্যান্ডে ডাইনোসর
বার্ড আইল্যান্ড
,
বার্ড আইল্যান্ডে মযূর
হানিমুন আইল্যান্ড সহজেই যন্ত্রচালিত নৌকা করে ঘুরে এলাম। বার্ড আইল্যান্ডে নামা যায়। অন্য দুটো দ্বীপে নামার অনুমতি দিতে রাজি হলেন না নৌকার মাঝি।
 
ব্রেকফাস্ট আইল্যান্ডে ব্রিটিশ আমলে রাজা মহারাজা, ব্রিটিশ অফিসাররা সকালের ব্রেকফাস্ট করতে অথবা অবসর যাপনের জন্য আসতেন। বার্ড আইল্যান্ডে শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে। বর্তমানে আমরা চারটি ময়ূর দেখেছি, কিছু পানকৌড়ি আর অল্প কিছু পরিযায়ী পাখি দেখলাম। মাঝি বললেন, শীতকালের শেষ দিকে অল্প কিছু পরিযায়ী পাখি যারা বাচ্চা ছিল, ওড়ার ক্ষমতা ছিল না তারাই রয়ে গেছে। আগামী শীতের শেষে এরাও উড়ে যাবে। আকাশে মেঘ ছিল, আমরা যখন ফিরে আসছি তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে চিলকাকে অপরূপ দেখাচ্ছিল।
 
দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর আমরা পান্থনিবাস-এর জানাশোনা সুরিন্দরের অটোরিকশা করে চললাম ব্ল্যাক বাগ, কালো হরিণ বা কৃষ্ণসার হরিণের দর্শন করতে। রম্ভা পান্থনিবাস থেকে প্রায় ত্রিশ কিমি দূরে বারসারা গ্রাম। এখানে পথের ধারে গ্রামের নাম লেখা, ব্ল্যাক বাগ অঞ্চল, ধীরে গাড়ি চালানোর সতর্কতার বোর্ড নজরে এলো।
কৃষ্ণসার হরিণ
সুরিন্দরের অভ্যস্ত চোখ পথের ধারে ধানক্ষেতের মধ্যে কখনো তিনটি, কখনও চারটি কালো হরিণ দেখতে পেয়েছে। তবে আমরা ভাল করে দূরে দেখতে পাইনি তাই সে পথ ছেড়ে মেঠো পথে তার অটো নামিয়ে চালিয়ে নিয়ে গেল সেখানেই যেখানে একপাল হলুদ হরিণের মাঝে ছাড়া ছাড়া তিন-চারটি কালো হরিণ দেখতে পেলাম। কাছাকাছি তাই ছবি তুলতে কোনও সমস্যা হচ্ছে না।
 
হরিণরা নিজের খুশিতে ঘুরে ফিরে মাঠের ঘাস খাচ্ছে। মজার ব্যাপার একটা দলে একের বেশি কালো হরিণ এলেই অন্যটি তাকে তাড়া করছে। একবার তো তিনটি কালো হরিণ পরপর ছুটে যাচ্ছে। অবশ্যই তার ভিডিও করতে হলো।
দুজনে মুখোমুখি
কৃষ্ণসার হরিণের পিঠের অংশ কালো আর পেটের দিক সাদা। আর মাথার শিং পাকানো পাকানো স্পাইরাল, বেশ বড়।সত্যি বলতে কী ভারি সুন্দর দেখতে। প্রকৃতির কী অপরূপ সৃষ্টি। হলুদ হরিণের মাঝে কালো হরিণ ভারি সুন্দর।
 
সুরিন্দর বলল, কি কাকিমা, মন ভরেছে তো দেখে? আমরা মাথা নাড়লাম। সত্যি সত্যিই মন ভরে গেছে। মাঠে একপাশে মানুষ চাষের কাজ করছে আর একটু দূরেই হরিণের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন দৃশ্য দেখব আশা করিনি। এমন সুন্দর প্রাণীদের কেউ কেউ খেলাচ্ছলে শিকার করতে চায়! তাই পাহারা দিতে হয়। তাদের জন্য করুণা হয়। প্রকৃতিকে একটুও ভালবেসে আপন করে নিতে পারেনি দেখে।
সমুদ্রতটে স্যান্ড আর্ট কলেজের ছাত্রদের বালি দিয়ে তৈরি
সন্ধ্যা নেমে আসছে। এবার ফেরার পালা। আর একবার দুচোখ ভরে দেখে নিয়ে ফেরার পথে অটোরিকশায় উঠলাম। 
 
রম্ভার আরো কিছু যেমন নির্ঝরঝোরা, যেখানে একটা প্রস্রবন আছে, জগন্নাথ মন্দির এসবও দেখেছি ফেরার পথে কিন্তু কৃষ্ণসার মৃগ দর্শনের পাশে সেগুলো ততটা আকর্ষনীয় নয়।
 
~~000~~

 
 

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)