বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
আশাদ আলী
শরন্ময়ী
[১ম পর্ব]
কাশবনের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু পলিমাটির গলিপথ ধরে হাঁটছিল একটি মেয়ে। তার পরনে হালকা বাসন্তী রঙের সুতির শাড়ি, যার আঁচল বাতাস পেয়ে কাশবনের সাদা ফুলের মতোই দুলছিল। মেয়েটির হাতে একটি ছোট্ট বেতের ডালা, আর সেই ডালায় স্থান পেয়েছিল সদ্য ঝরে পড়া অগণিত শিশিরভেজা শিউলি।
ভোরের
নরম আলোয় তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি রূপসি বাংলার পলিছোঁয়া প্রান্তর। নিভে আসা
নক্ষত্রগুলোর শেষ দীপ্তিটুকু পান করে নীল আকাশে ধীরে ধীরে ভেসে উঠছিল পাঁজা তুলোর
মতো একখণ্ড মেঘ। ভাদ্রে জমা হওয়া গুমোট উত্তাপটা কাটিয়ে বাতাসে তখন শীতল, আর্দ্র স্পর্শ। বর্ষার ধুয়ে
যাওয়া পলিমাটির ওপর যে স্তব্ধতা জমেছিল, তাকে মৃদু দোলা দিয়ে ভেসে আসছিল শিউলি ফুলের ভেজা ভেজা আঘ্রাণ। এটি কেবল একটি
ঋতুর পদধ্বনি নয়; এটি পৃথিবীর গোপন
হৃদস্পন্দন বদলে যাওয়ার এক অলৌকিক অবসান ও নবীন সূচনা।
শহরের
যান্ত্রিক সীমানা পেরিয়ে যে কাঁচা রাস্তাটি বাঁক নিয়ে সোজা নদীপাড়ের কাশবনে গিয়ে
মিশেছে, সেই ধূসর পথ ধরে
ধীরপায়ে হাঁটছিল রূপম। পেশায় সে রূপকার বা চিত্রশিল্পী নয়, আবার পেন্সিল দিয়ে কবিতা লেখার অভ্যাসও তার চুকে গেছে বহু
বছর আগে। তবে তার ভেতরে এক অলক্ষ্য ক্যানভাস লুকানো আছে, যেখানে ঋতুদের রূপান্তর এসে প্রতিদিন নতুন রং ঢেলে দেয়। এই
আশ্বিনের প্রারম্ভে তার সমস্ত সত্তা যেন এক অপরিচিত ব্যাকুলতায় পূর্ণ হয়ে উঠছিল।
ইট-কাঠ-পাথরের খাঁচায় যে জীবন কেবল হিসাব-নিকাশের খাতার মতো শুষ্ক, এখানে এই উন্মুক্ত দিগন্তের
নিচে এসে তা যেন নতুন প্রাণস্পন্দনে জেগে উঠছিল।
নদীর
নাম ইছামতী। বর্ষার উথালপাতাল যৌবন শেষে নদীটি তখন শান্ত, টলটলে এবং প্রগাঢ় নীল। জলের ওপর আকাশের সাদা মেঘের ছায়াগুলো
ভেসে বেড়াচ্ছিল যেন কোনো নিঃশব্দ অলৌকিক নৌকা। নদীর ধার ঘেঁষে দিগন্তবিস্তৃত কাশের
বন। শুভ্র, নরম, চঞ্চল চামরের মতো বাতাস
স্পর্শ করলেই তারা একযোগে ঝুঁকে পড়ছিল জলের দিকে। মনে হচ্ছিল যেন এক মহাসমুদ্রের
শ্বেতশুভ্র তরঙ্গ নিঃশব্দে আছড়ে পড়ছে মাটির বুকে। এই রূপ দেখে যে-কোনো মানুষের ভেতরের
জাগতিক সমস্ত কলুষতা নিমেষে বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যেতে বাধ্য।
রূপম
নদীপাড়ের একটি পুরনো অশ্বত্থ গাছের শিকড়ে এসে বসল। গাছের শিকড়গুলো আঁকাবাঁকা হয়ে
নেমে গেছে নদীর একদম গা ছুঁয়ে। সেখান থেকে কাশবনের দিকে তাকালে মনে হয়, এই পৃথিবী কোনো এক অসীম
পবিত্রতায় ঢেকে গেছে। বাতাসের শনশন শব্দে যেন কোনো প্রাচীন গান বাজছিল, যা কেবল মনের কান দিয়েই শোনা
সম্ভব। ঠিক তখনই তার নজরে এল একটি অপূর্ব দৃশ্য।
কাশবনের
মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু পলিমাটির গলিপথ ধরে হাঁটছিল একটি মেয়ে। তার পরনে হালকা
বাসন্তী রঙের সুতির শাড়ি, যার আঁচল বাতাস পেয়ে
কাশবনের সাদা ফুলের মতোই দুলছিল। মেয়েটির হাতে একটি ছোট্ট বেতের ডালা, আর সেই ডালায় স্থান পেয়েছিল
সদ্য ঝরে পড়া অগণিত শিশিরভেজা শিউলি। মেয়েটির হাঁটার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না।
যেন সে এই ভোরের শিশিরভেজা মাটির সঙ্গে, বাতাসের প্রতিটি তরঙ্গের সঙ্গে এক গভীর ছন্দে বাঁধা পড়েছে। তার পদক্ষেপে কোনো
শব্দ নেই, আছে কেবল এক স্নিগ্ধ
মাধুর্য।
মেয়েটির
নাম অনসূয়া। এই নদীপাড়ের নিভৃত গ্রামেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কিন্তু গ্রামের আর
দশটা সাধারণ মানুষের মতো অনসূয়া এই প্রকৃতিকে কেবল জীবনধারণের মাধ্যম হিসেবে দেখে
না; প্রকৃতির প্রতিটি রূপান্তরের
সঙ্গে তার নিজস্ব এক নিভৃত কথোপকথন রয়েছে। শরৎ যখন আসে, অনসূয়ার ভেতরের সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ এক অন্য মাত্রায় জাগ্রত
হয়। সে যখন ঝরে পড়া শিউলি কুড়ায়,
তার
প্রতিটি আঙুলের ডগায় থাকে ফুলগুলোর প্রতি এক গভীর করুণা ও ভালবাসা। সে জানে, এই ফুলগুলোর আয়ু মাত্র এক
রাতের, কিন্তু সেই এক রাতেই
তারা পৃথিবীকে দিয়ে যায় তাদের শ্রেষ্ঠ সুবাস।
রূপম
নিঃশব্দে লক্ষ্য করছিল অনসূয়াকে। কোনো ক্যামেরার লেন্স বা ক্যানভাস-তুলি এই
মুহূর্তের সৌন্দর্যকে পুরোপুরি বন্দি করতে পারবে না। অনসূয়া কাশবনের প্রান্তে এসে
দাঁড়াল। নদীর দিকে চোখ মেলতেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল অশ্বত্থ গাছের শিকড়ে বসে থাকা
রূপমের ওপর। দুটি চোখের দৃষ্টি মুখোমুখি হতেই বাতাসে যেন একটি মৃদু স্পন্দন খেলে
গেল। সেখানে কোনো অচেনা মানুষের ভয় ছিল না, ছিল এক চিরকালের জানাশোনার নির্মল আলো।
কোনো
আগাম পরিচয় ছিল না, ছিল না কোনো কৃত্রিম
সামাজিক সম্ভাষণ। কিন্তু শরতের এই নিঃশব্দ সকালে তাদের দুজনের মাঝখানের অনাবশ্যক
দূরত্বটুকু নিমেষেই মিলিয়ে গেল। অনসূয়া ধীরপায়ে এগিয়ে এল রূপমের দিকে। তার হাতের
ডালার শিউলি ফুল থেকে ভেসে আসছিল এক তীব্র, সুমিষ্ট ঘ্রাণ।
-আপনি অন্য শহরের মানুষ, তাই না?
অনসূয়া
প্রশ্ন করল। তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা বা আড়ষ্টতা ছিল না। বরং তা ছিল ভোরের বাতাসে
নদীর কলতানের মতোই স্বাভাবিক ও পরিষ্কার। রূপম একটু হেসে বলল,
-হ্যাঁ। তবে সেই শহরটা এখন
অনেক দূরে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই আকাশ, এই শান্ত নদী আর এই কাশবনের শুভ্রতাই একমাত্র সত্য। বাকি সব রূপকথা।
অনসূয়া
রূপমের পাশের একটি উঁচু শিকড়ে গিয়ে বসল। তার চোখ দুটো দূর দিগন্তে বিস্তৃত নীল
আকাশের দিকে প্রসারিত হলো। সে বলল,
-শরৎকাল মানুষকে বড্ড বেশি
ভাবুক করে তোলে। বর্ষায় থাকে এক অলৌকিক উন্মাদনা, এক বাঁধভাঙা আকুলতা। কিন্তু শরৎ মানেই এক প্রশান্ত
আত্মসমর্পণ। আকাশ কতটা গভীর নীল হতে পারে, তা শরৎ না এলে কোনোদিন জানা যেত না। এই নীল যেন আমাদের
ভেতরের সমস্ত অহংকার ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়।
রূপম
অনসূয়ার কথাগুলো শুনছিল এবং একই সঙ্গে দেখছিল কীভাবে সকালের সোনাঝরা রোদ অনসূয়ার
চোখের কোণে এসে পড়ছিল। এই মেয়েটির অবয়বে প্রকৃতি যেন তার নিজস্ব এক রূপ ফুটিয়ে
তুলেছে। রূপম এতদিন ভাবত ভালবাসা মানে দুটো মানুষের একসঙ্গে হওয়া, এক ছাদের নিচে আবদ্ধ থাকা, কিছু কথা আর প্রতিশ্রুতির
আদানপ্রদান। কিন্তু এই মুহূর্তে কাশবনের মাঝে দাঁড়িয়ে অনসূয়ার পাশে বসে তার মনে
হলো, ভালবাসা এর চেয়েও
অনেক বিশাল, অনেক বেশি ব্যাপ্ত।
ভালবাসা কোনো শিকল নয়, ভালবাসা হলো এই
উন্মুক্ত আকাশের মতো এক সীমাহীন অনুভব।
-আপনি কি প্রতিদিন এই কাশবনে
আসেন?
রূপম
জিজ্ঞেস করল। অনসূয়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
-না, প্রতিদিন আসি না। আসার
প্রয়োজন হয় না। শরৎ আমার ভেতরেই থাকে। তবে ভোরের এই শিউলির গন্ধ আর কাশের দোলনা
আমাকে ঘরে থাকতে দেয় না। জানেন রূপমবাবু—
সে
একটু থেমে রূপমের দিকে তাকাল,
-আমি আপনার নাম জানি না, তাই মনে মনে রূপম বলেই
ডাকলাম।
-আমার নাম সত্যিই রূপম।
রূপম
কিছুটা অবাক হয়ে বলল। অনসূয়া মিষ্টি হেসে বলল,
-আমি অনুমান করেছিলাম। আপনার
চেহারায় আর চোখের দৃষ্টিতে একটি রূপের খোঁজ আছে। তবে যা বলছিলাম—এই যে কাশফুল
দেখছেন, এদের কোনো নিজস্ব
গন্ধ নেই। শিউলি ফুলের গভীর সুবাস আছে, কিন্তু তার আয়ু বড্ড কম। আর কাশের কোনো সুবাস নেই, অথচ এরা পুরো প্রান্তরজুড়ে এক অনন্ত উৎসবের সৃষ্টি করে।
প্রকৃতি আমাদের প্রতিদিন শেখায় কীভাবে পূর্ণতা আর অভাব পাশাপাশি বাস করতে পারে।
আমরা শুধু রূপটুকু দেখি, পেছনের ত্যাগটুকু
দেখি না।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment