বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৭তম সংখ্যা/১৫ই আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
আশাদ আলী
শরন্ময়ী
[৩য় পর্ব]
"সূর্য এখন মাথার ওপর। ইছামতীর শান্ত জল চকচক করছে। কাশবনে বাতাস বইছে আগের মতোই, শুভ্র চামরগুলো ছন্দে ছন্দে হেলে পড়ছে নদীর দিকে।"
সে আর
অপেক্ষা করতে পারল না। কাশবনের সরু পথ ধরে সে অনসূয়ার বাড়ির দিকে এগোতে লাগল।
গ্রামের একপ্রান্তে, একটি মস্ত বড় পুরনো
শিউলি গাছের নিচে অনসূয়াদের ছোট্ট একতলা বাড়িটি। বাড়ির উঠোনে পৌঁছে রূপম দেখল, শিউলি গাছের নিচে সাদা আর
কমলা রঙের ফুলের এক বিশাল আস্তরণ তৈরি হয়ে আছে। কিন্তু সেখানে আজ কেউ ফুল কুড়াচ্ছে
না। পুরো গৃহপ্রাঙ্গণ অদ্ভুতরকম নিস্তব্ধ ও গম্ভীর। অনসূয়ার বৃদ্ধ বাবা বারান্দায়
বিষণ্ণ মুখে বসে ছিলেন। রূপমকে এগোতে দেখে তিনি ধীরপায়ে উঠে এলেন।
-আপনিই কি শহরের সেই
ছবি-আঁকিয়ে বাবু?
বৃদ্ধ
ধীরস্বরে জিজ্ঞেস করলেন। রূপম মাথা নেড়ে বলল,
-হ্যাঁ। অনসূয়া কোথায়? আজ ও নদীপাড়ে যায়নি কেন?
বৃদ্ধ
এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখের কোণে জমে থাকা জল রোদে চিকচিক করে উঠল। তিনি
দূরের কাশবনের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,
-অনসূয়া কাল রাতেই শহর থেকে
আসা এক বিশেষ চিকিৎসকের গাড়িতে রওনা হয়ে গেছে। ওর শরীরের ভেতর বহু বছর ধরে এক
মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে বাবু। ডাক্তাররা বলেছে ওর সময় বড্ড কম, হয়তো আর মাত্র কয়েকটি দিন।
কিন্তু মেয়েটা আমাকে কোনোদিন কাঁদতে দেয়নি। সে বলত, 'বাবা,
শরতের
মেঘের মতো যার জীবন, সে কি চিরকাল এক
জায়গায় আটকে থাকতে পারে?' সে আপনাকে কিছু বলে
যেতে বারণ করেছিল, পাছে আপনার মনে কষ্ট
হয়। রূপম
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চারপাশের পৃথিবীটা যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
শরতের এই রোদেলা সকাল, এই শিউলির সুবাস, এই কাশবনের শুভ্রতা—সব যেন এক
নিমেষে অন্য এক গভীর অর্থ ধারণ করল। অনসূয়া জানত! সে জানত তার আয়ু এই শরতের মতোই
ক্ষণস্থায়ী! আর তাই সে প্রকৃতির এই সংক্ষিপ্ত রূপকে এত গভীরভাবে ভালবেসেছিল, তাই সে কোনো অভিযোগ না রেখে
এত নিখাদভাবে বাঁচতে চেয়েছিল।
বৃদ্ধ
একটি ভাঁজ করা ছোট চিঠি রূপমের হাতে তুলে দিয়ে বললেন,
-মেয়েটা যাওয়ার আগে আপনার জন্য
এটি রেখে গেছে।
রূপম
কাঁপানো হাতে চিঠিটি খুলল। তাতে অনসূয়ার স্পষ্ট, সুছাঁদ হাতের লেখা:
রূপম,
শরৎ
যখন আসে, সে কি বিদায়ের কথা
ভেবে তার আলো কমানো শুরু করে?
না। সে
তার সর্বোচ্চ দীপ্তি দিয়ে পুরো পৃথিবীকে ভরিয়ে দেয়, আর তারপর একদিন নিঃশব্দে হেমন্তের কুয়াশায় মিলিয়ে যায়। আমার
জীবনটাও এই শরতের মতোই। আমি কোনো করুণা চাইনি, কোনো ধরে রাখার আকুলতা চাইনি। আমি চেয়েছিলাম কেবল এক অপরূপ
পূর্ণতা।
আপনার
সঙ্গে কাটানো এই কটা দিন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর শরৎ হয়ে থাকবে। ভালবাসাকে কখনো
শিকল দিয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করবেন না রূপম। ভালবাসা হলো ওই কাশবনের বাতাসের
মতো—তাকে ছোঁয়া যায় না, কিন্তু সমস্ত সত্তা
দিয়ে অনুভব করা যায়। আপনি আবার আপনার শহরে ফিরে যান, মনে নতুন রঙের সঞ্চার করুন। আর যখনই আকাশে পাঁজা তুলোর মতো
মেঘ ভাসবে, জানবেন—আমি ওই নীলের
মাঝেই কোথাও পরম শান্তিতে আছি।
ভাল
থাকবেন।
—অনসূয়া।
চিঠিটি
বুকের কাছে চেপে ধরে রূপম ধীরপায়ে আবার নদীপাড়ের দিকে ফিরে এল। সূর্য এখন মাথার
ওপর। ইছামতীর শান্ত জল চকচক করছে। কাশবনে বাতাস বইছে আগের মতোই, শুভ্র চামরগুলো ছন্দে ছন্দে
হেলে পড়ছে নদীর দিকে।
রূপম
অশ্বত্থ গাছের শিকড়ে গিয়ে বসল। আজ তার চোখে কোনো জল ছিল না, কোনো হাহাকার ছিল না। তার
হৃদয় পূর্ণ হয়ে ছিল এক অদ্ভুত,
অনাবিল
প্রশান্তিতে। অনসূয়া তাকে ছেড়ে যায়নি; সে মিশে গেছে এই ইছামতীর শান্ত টলটলে জলে, সে মিশে গেছে ভোরের শিউলির সুবাসে, সে মিশে গেছে আশ্বিণের এই অনন্ত নীল আকাশে।
ভালবাসা
কোনো অধিকার বা দখলের নাম নয়,
কোনো
বাঁধন নয়। ভালবাসা হলো প্রকৃতির মতোই এক স্বতঃস্ফূর্ত আত্মনিবেদন—যা কোনো কিছু না
চেয়েও সবকিছু উজাড় করে দিয়ে যায়। রূপম চোখ বন্ধ করল। বাতাসের প্রতিটি স্পর্শে সে
এখন অনসূয়াকে অনুভব করতে পারছিল। শরৎ শেষ হয়ে যাবে, কাশফুল ঝরে যাবে, কিন্তু এই নদীপাড়ে তাদের যে ব্যাকুল অথচ প্রশান্ত ভালবাসার জন্ম হলো, তা এই প্রকৃতির অনন্ত
ঋতুচক্রের মতোই চিরন্তন হয়ে থেকে যাবে।
বাতাসে
আবার ভেসে এল শিউলির শেষ সুবাস। রূপম আকাশের দিকে তাকাল। একখণ্ড অতি শুভ্র মেঘ
ভেসে যাচ্ছে অনন্ত নীলিমার বুকে—সম্পূর্ণ মুক্ত, বাঁধনহারা,
এবং
গভীর প্রেমে নিমগ্ন।
~~000~~
No comments:
Post a Comment