বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/০৮ই আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
আশাদ আলী
শরন্ময়ী
[২য় পর্ব]
"কিন্তু আজ অনসূয়া এল না। তার সেই বেতের ডালা হাতে শিশিরভেজা পথে হেঁটে আসার পরিচিত দৃশ্যটি নদীপাড়ের পথটিতে দেখা গেল না।"
তাদের
কথোপকথন রূপ নিল এক অনন্য নিস্তব্ধতায়। শব্দ যখন শেষ হয়ে যায়, তখনই তো প্রকৃতির নিজস্ব ভাষা
শুরু হয়। ইছামতীর শান্ত জলধারায় তখন রোদ লেগে রুপালি ঝিলিক সৃষ্টি হয়েছিল। মাথার
ওপর দিয়ে একঝাঁক বুনো হাঁস উড়ে গেল উত্তরের দিকে। বাতাসে কাশবনের সাদা চামরগুলোর
দুলুনি আরও তীব্র হলো। রূপম অনুভব করল, সে যেন বহু বছর পর নিজের ভেতরের নিঃশব্দ মানুষটিকে আবার খুঁজে পেয়েছে।
পরবর্তী
দিনগুলোতে রূপমের শহরের সমস্ত ব্যস্ততা ম্লান হয়ে গেল। অফিসের তাগাদা, ব্যস্ত রাজপথের যানজট আর
কোলাহলময় জীবনকে বিদায় জানিয়ে সে থেকে গেল নদীপাড়ের এক পুরনো ডাকবাংলোয়। প্রতিদিন
ভোরে সে চলে আসত এই নদীপাড়ে। আর অনসূয়া আসত তার বেতের শিউলির ডালা হাতে। তাদের
মধ্যে সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট নাম ছিল না, কোনো সামাজিক তকমা ছিল না। তারা কেউ কাউকে পাওয়ার জন্য
আকুলতা প্রকাশ করেনি, আবার কেউ কাউকে
হারিয়ে ফেলার ভয়ও পায়নি। এটি ছিল ঋতুর মতোই এক স্বাভাবিক, অমলিন পথচলা।
একদিন
অপরাহ্নে, যখন সূর্যটি পশ্চিম
আকাশে হেলে পড়েছিল এবং গোটা নদীপাড় এক সোনারঙা আলোয় স্নান করছিল, তখন তারা দুজন কাশবনের গভীরে
হেঁটে যাচ্ছিল। কাশের উঁচু ডালগুলো তাদের মাথার ওপর এক শুভ্র ছাদ তৈরি করে
রেখেছিল। মাটিতে ঝরে পড়েছিল কাশের সূক্ষ্ম পরাগ। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় মনে হচ্ছিল
তারা কোনো এক স্বর্গীয় উদ্যানে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
-অনসূয়া,
রূপম
হাঁটতে হাঁটতে বলল,
-শরৎ এত সুন্দর, অথচ এত অল্প সময়ের জন্য কেন
আসে? কিছুদিনের মধ্যেই তো
এই কাশফুলগুলো ঝরে যাবে, আকাশ আবার মেঘলা বা
ধূসর হয়ে যাবে, শীতের শুষ্কতা এসে সব
গ্রাস করবে। এত সুন্দর জিনিস এত দ্রুত শেষ হয়ে যায় কেন?
অনসূয়া
থামল। একটি কাশঝাড় আলতো করে নিজের হাতের তালুতে নিয়ে সে রূপমের দিকে তাকাল। তার
চোখে তখন এক প্রগাঢ় বোধের দীপ্তি।
-যা চিরকাল থাকে, তা কি সত্যিই সুন্দর হতে পারে
রূপম?
অনসূয়া
নরম অথচ দৃঢ় স্বরে বলল।
-শরতের সৌন্দর্য তার
ক্ষণস্থায়িত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। যে জানে সে অল্প সময়ের জন্য এসেছে, সে তার সমস্ত উজাড় করে দিয়ে
যায়। শিউলি যদি সারা বছর ফুটত,
তবে কি
তার ঝরে পড়ার ব্যাকুলতা আমাদের হৃদয় স্পর্শ করত? কাশের এই রাজত্ব যদি চিরদিনের হতো, তবে কি আমরা এই আশ্বিণ মাসে এভাবে ব্যাকুল হয়ে ছুটে আসতাম? স্থায়িত্ব অনেক সময় সৌন্দর্যের
ধার কমিয়ে দেয়।
অনসূয়ার
এই কথাগুলো রূপমের হৃদয়ে এক গভীর আন্দোলন সৃষ্টি করল। সে বুঝল, অনসূয়া কেবল প্রকৃতির রূপ
বর্ণনা করছে না, সে জীবনের এক পরম
সত্যকে উন্মোচিত করছে। প্রেমও তো তেমনই। প্রাপ্তির স্থায়িত্বে বা অভ্যাসের খাঁচায়
যা প্রায়ই মলিন হয়ে যায়, অপ্রাপ্তির বা
ক্ষণস্থায়িত্বের আলোয় তা চিরন্তন হয়ে ওঠে। যে ভালবাসায় কোনো দাবি নেই, কেবল অনুভব আছে, তা কখনো মরে না।
তারা
নদীর চরে এসে বসল। বালুচরে তখন জোয়ারের জল এসে ছোট ছোট আলপনা আঁকছিল। দূরে একটি
ডিঙি নৌকা ভাসিয়ে এক প্রবীণ মাঝি ভাটিয়ালি গান গাইছিল। গানের সুর বাতাসের সঙ্গে
ভেসে এসে মিলিয়ে যাচ্ছিল দূর দিগন্তে। সেই সুরের মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত বিরহ, যা মানুষকে একই সঙ্গে উদাস ও
পূর্ণ করে তোলে।
-আপনি কি কোনোদিন এই প্রান্তর
ছেড়ে অন্য কোথাও যাননি?
রূপম
জিজ্ঞেস করল। অনসূয়া নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
-কোথায় যাব? মানুষের মন যেখানে শান্তি পায়, সেটাই তো তার আসল বাড়ি। আমি
এই নদীর প্রতিটি মোড় চিনি,
আমি
জানি কোন সময়ে কাশবনে কেমন বাতাস বইবে, কোন দিন আকাশে মেঘের ঘনঘটা কেমন রূপ নেবে। এই পৃথিবীটাই এত বড়, এত গভীর, যে একে ভালবাসতেই এক জীবন শেষ
হয়ে যায়। মানুষ কেন যে নিজের চারপাশে দেয়াল তোলে আর সীমানা খুঁজে বেড়ায়, আমি বুঝি না।
অনসূয়ার
প্রকৃতির প্রতি এই নিবিড় ও নিঃস্বার্থ ভালবাসা রূপমকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখছিল।
অনসূয়া সাধারণ কোনো গ্রাম্য তরুণী নয়, সে যেন শরতের নিজস্ব এক জীবন্ত রূপক। তার ভেতরে কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো জাগতিক আকাঙ্ক্ষার
জটিলতা। সে সহজ, সে মুক্ত, সে নদীর মতোই বহমান।
সন্ধ্যা
নেমে এল অতি দ্রুত। আশ্বিণের সন্ধ্যা মানেই এক মায়াবী অন্ধকার। নীল আকাশটি ধীরে
ধীরে গাঢ় বেগুনি ও সিঁদুরে রং ধারণ করল, আর তারপর একে একে জ্বলে উঠল অমলিন নক্ষত্রেরা। নদীপাড়ের বাতাস আরও শীতল হয়ে
উঠল, আর চারপাশ ছেয়ে গেল
এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায়।
অনসূয়া
উঠে দাঁড়াল।
-আজ তবে আসি রূপম। কাল
ভোরে আবার দেখা হবে, যদি শিউলি গাছটা তার
ফুলগুলো আমাদের জন্য বাঁচিয়ে রাখে।
রূপমও
উঠে দাঁড়াল। সে অনুভূতির আবেশে অনসূয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। কিন্তু অনসূয়া তার
হাত স্পর্শ করল না। সে কেবল একবার রূপমের চোখের দিকে তাকাল, আর সেই নীরব দৃষ্টির গভীরতা
রূপমকে বুঝিয়ে দিল যে চামড়ার স্পর্শের চেয়েও বড় কোনো হৃদয়ের যোগাযোগ তাদের মধ্যে
ঘটে গেছে।
পরদিন
ভোরে রূপম যখন আবার নদীপাড়ে পৌঁছল, তখন চারপাশ এক ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। আশ্বিণের শেষদিকের এই কুয়াশা আভাস দেয়
যে হেমন্ত আর বেশি দূরে নয়। সূর্যের আলো এখনও কুয়াশার পর্দা ভেদ করে উঠতে পারেনি।
রূপম অশ্বত্থ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অনসূয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। সময় গড়িয়ে যেতে লাগল, কিন্তু বাতাসের গতি যেন থমকে
ছিল।
অবশেষে
সকালের সোনাঝরা রোদ কুয়াশা সরিয়ে পুরো কাশবনে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু আজ অনসূয়া এল না।
তার সেই বেতের ডালা হাতে শিশিরভেজা পথে হেঁটে আসার পরিচিত দৃশ্যটি নদীপাড়ের পথটিতে
দেখা গেল না। রূপমের মনে এক নামহীন শূন্যতা তৈরি হলো। এক অজানা আশঙ্কা তাকে তাড়া
করে ফিরতে লাগল।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment