প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

মায়ের আগমনী [২য় পর্ব] | আদিত্য ভৌমিক

বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/০৮ই আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
আদিত্য ভৌমিক
মায়ের আগমনী
[২য় পর্ব]

"মা, আগামী বছর আবার এসো। শুধু মণ্ডপে নয়, আমাদের প্রতিটি মানুষের মনে এসো। আমাদের অহংকার দূর করো। হিংসা দূর করো।"

 
পূর্বানুবৃত্তি শহরের এক ছোট্ট পাড়ার নাম শিউলিতলা। অল্প কয়েকটি গলি, পুরোনো কিছু বাড়ি, মাঝখানে একটি ছোট মাঠ আর মাঠের এক কোণে বহু বছরের পুরোনো একটি দুর্গামণ্ডপ। পরিস্থিতি অনুযায়ী পুজো বন্ধের উপক্রম হলে অয়নের সদিচ্ছায় গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে নির্মাণ শুরু করল। তারপর…
 
সপ্তমী, অষ্টমী আর নবমী তিনটি দিন শিউলিতলা যেন সত্যিই এক পরিবারের মতো হয়ে গেল। কারও বাড়িতে রান্না হয়নি পাশের বাড়ি থেকে খাবার পৌঁছে গেছে। কোনো বৃদ্ধ মণ্ডপে আসতে পারেননি তরুণেরা তাঁকে ধরে নিয়ে এসেছে। কোনো শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে সবাই মিলে তার জন্য প্রার্থনা করেছে। যে মানুষটির সঙ্গে বহুদিন কারও কথা হয়নি, তিনিও এখন সবার সঙ্গে বসে প্রসাদ খাচ্ছেন।
 
অয়ন চারপাশের দৃশ্য দেখে ভাবল এটাই কি তবে মায়ের আসল আগমন? একদিন সন্ধ্যায় সে ঠাকুমাকে বলল,
-ঠাকুমা, মা কি সত্যিই মণ্ডপে থাকেন?
ঠাকুমা বললেন,
-মায়ের রূপ আমরা প্রতিমায় দেখি। কিন্তু মায়ের শক্তি অনুভব করি মানুষের কাজে।
অয়ন চুপ করে রইল। তার মনে হলো, কথাটা সে বুঝতে শুরু করেছে।
 
অবশেষে এল দশমী। সকালের আকাশে যেন বিষণ্ণতার ছায়া। যে মণ্ডপ কয়েকদিন ধরে আলো, ঢাক আর মানুষের হাসিতে ভরে ছিল, সেখানে আজ বিদায়ের প্রস্তুতি। অয়ন বারবার মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। তার মন মানছিল না। বিসর্জনের আগে সে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বলল,
-মা, তুমি চলে যাচ্ছ কেন? আরেকটু থাকো না!
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ঠাকুমা পাশে এসে দাঁড়িয়ে অয়নের মাথায় হাত রাখলেন।
-মা তো চলে যান না রে। মাটির প্রতিমা যায়, কিন্তু মায়ের আশীর্বাদ থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে।
অয়ন কোনো উত্তর দিল না। ঢাকের শব্দ আরও জোরালো হলো। শঙ্খ বাজল। উলুধ্বনি উঠল। মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, “জয় মা দুর্গা!”
 
মায়ের প্রতিমা যখন বিসর্জনের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো, অয়ন দূর থেকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের জল যেন নদীর জলের সঙ্গে মিশে গেল। মা চলে গেলেন। কিন্তু সত্যিই কি মা চলে গেলেন?
 
পরদিন সকালে শিউলিতলা আবার নীরব হয়ে গেল। মণ্ডপ খালি। আলো নেই। ঢাক নেই। উৎসবের কোলাহল নেই। কিন্তু পাড়ার মানুষগুলোর মধ্যে যেন কিছু একটা বদলে গেছে। যে মানুষগুলো আগে একে অপরকে এড়িয়ে চলত, তারা এখন একসঙ্গে বসে চা খায়। যে বৃদ্ধ মানুষটি একা থাকতেন, তাঁর বাড়িতে প্রতিদিন কেউ না কেউ খোঁজ নিতে যায়। যে প্রতিবেশীর সঙ্গে পুরোনো অভিমান ছিল, তার বাড়িতে গিয়ে কেউ একজন বলেছে,
-সব ভুলে যাই। মা তো আমাদের মিলিয়ে দিয়ে গেছেন।
অয়ন সবকিছু দেখে বুঝতে পারল, মা দুর্গা সত্যিই এসেছিলেন। তিনি এসেছিলেন মাটির প্রতিমার মধ্য দিয়ে। তিনি এসেছিলেন ঢাকের শব্দে। তিনি এসেছিলেন শিউলি ফুলের গন্ধে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় আগমন ঘটেছিল মানুষের হৃদয়ে। মা মানুষকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন অহংকারের চেয়ে ভালবাসা বড়, হিংসার চেয়ে সহমর্মিতা বড়, অর্থের চেয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো বড়। সেদিন সন্ধ্যায় অয়ন একা মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। শরতের আকাশে আবার সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। একটি শিউলি ফুল নিঃশব্দে মাটিতে ঝরে পড়ল। অয়ন ফুলটি হাতে তুলে নিল। তারপর চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল,
-মা, আগামী বছর আবার এসো। শুধু মণ্ডপে নয়, আমাদের প্রতিটি মানুষের মনে এসো। আমাদের অহংকার দূর করো। হিংসা দূর করো। মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা আরও বাড়িয়ে দাও। যে মানুষ কষ্টে আছে, তার পাশে দাঁড়ানোর শক্তি দাও। যে মানুষ একা, তাকে আপন করে নেওয়ার মন দাও।
কিছুক্ষণ পর অয়ন চোখ খুলল। তার মনে হলো, শরতের বাতাসে যেন মায়ের আশীর্বাদ ভেসে বেড়াচ্ছে। সে বুঝতে পারল দুর্গাপূজা শুধু চার দিনের উৎসব নয়। দুর্গাপূজা শুধু প্রতিমা, মণ্ডপ, আলো, ঢাক আর বিসর্জনের নাম নয়। দুর্গাপূজা হলো মানুষের হৃদয়ে অশুভকে পরাজিত করে শুভকে প্রতিষ্ঠা করার উৎসব। যেদিন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের দুঃখ বুঝবে, সেদিনই মা আসবেন। যেদিন একজন ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাবার তুলে দেওয়া হবে, সেদিনই মা আসবেন। যেদিন কোনো বৃদ্ধ একাকিত্বে ভুগবেন না, সেদিনই মা আসবেন। যেদিন মানুষ হিংসা ভুলে ভালবাসতে শিখবে, সেদিনই মা আসবেন। আর যেদিন মানুষের হৃদয়ে মানবতার প্রদীপ জ্বলবে, সেদিনই হবে মায়ের সবচেয়ে বড় পূজা। শিউলিতলার মণ্ডপে হয়তো আর আলো জ্বলছে না। ঢাকও থেমে গেছে। প্রতিমাও বিসর্জনের জলে বিলীন হয়ে গেছে। তবুও অয়ন জানে মা কোথাও যাননি। মা রয়ে গেছেন সেই বৃদ্ধের চোখের জলে, যে এবার একা নয়। মা রয়ে গেছেন সেই মানুষের হাসিতে, যে বহু বছরের অভিমান ভুলে প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলেছে। মা রয়ে গেছেন সেই শিশুর প্রার্থনায়, যে অসুস্থ বন্ধুর জন্য কেঁদেছিল। মা রয়ে গেছেন অয়নের ছোট্ট হৃদয়ে। আর হয়তো শিউলিতলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে জ্বলে থাকা ভালবাসার প্রদীপেই মায়ের সবচেয়ে সুন্দর আগমনি গান বাজছে। আকাশে তখন সন্ধ্যার আলো। দূরে কোথাও আবার মৃদু ঢাকের শব্দ শোনা গেল। অয়ন আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তার মনে হলো মায়ের আগমনি শেষ হয়নি। কারণ মা দুর্গার আসল আগমন হয় মানুষের হৃদয়ে, আর সেই হৃদয়ে ভালবাসা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন মা আমাদের মাঝেই থাকবেন।
 
জয় মা দুর্গা।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)