বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৬তম সংখ্যা/০৮ই আশ্বিণ, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
অমিত পাল
বে-তাল
[২য় পর্ব]
"সকলের চোখে-মুখে হালকা স্বস্তির কিরণ। মিটিং থেকে লাফিয়ে বেরিয়েই গজেনের চিল চিৎকার, ভজা’রে শিগগির পিণ্ডি খেকো খগেন পুরুতকে খবর দে।"
পূর্বানুবৃত্তি শ্মশানে অগ্রদানী ব্রাহ্মণদের খাতায় নিজের নাম
ঢুকিয়েছেন সরকারি ভাতার জন্য। স্ত্রী কমলাদেবী একজন নামী পেশাদার রুদালী। কলকাতার
বড় অর্ডার পেয়েছেন। শার্পেনটাইন লেনের সম্ভ্রান্ত কঞ্জুষ আড়তদার বিশু মিওিরের মা
গতকাল মধ্যরাতে পরলোকের গাড়িতে চেপেছেন। তারপর…
তা বাবা
গজেন তোমরা সকালে চা-টা খেয়েছ তো?
সে তো
সারাদিন চলতেই থাকে পুরুতমশাই। কিন্তু আপনি হঠাৎ কী মনে করে? যা বলার জলদি বলেন, গোপালের বাবার ছবিটা আজকের
মধ্যেই ডেলিভারি দিতে হবে,
আর্জেন্ট
কেস। খগেনবাবুর মনটা দুম ক’রে গুমরে গেল। মনিটরের দিকে হেলে গোপালের বাবার ছবিটা
এক ঝলক দেখে আনমনা হ’য়ে বলেন,
আমার
দুইখান পাসপোর্ট ছবি লাগবে। চোখ দু’টো উপরের দিকে তুলে গুরুগম্ভীর গজেন বলে, ছোট বড় মিলিয়ে মোট নয়টা ছবি
পাবেন, ষাট টাকা পড়বে, এখন চাইলে এখনই হাতে গরম
পাবেন। গোপালের বাবার ছবিটা দ্যাখার পর থেকেই কেমন যেন মুষড়ে গেছেন পুরুতমশাই।
গজেনের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে কোনরূপ দরাদরি না করে ঈষৎ ঘাড়টা হ্যালান। ছবি
তুলে তালেগোলে তালের ব্যাগটা ওই ঘরের কোনায় ফেলে বেরিয়ে যান। মেজাজটা খিটখিটে হয়েই
বোধহয় এই ভুল। পা দু’টোই কেবল হাঁটছে, শরীর যেন আর এগোচ্ছে না,
তিনি
থমকে আছেন গোপালের বাবার ছবিতে।
বাড়ির
উঠোনে চরণ রাখতেই, একি এত ঘামছ কেন, শরীর খারাপ লাগছে? কমলাদেবী খগেনবাবুকে বগল
পাঁজা ক’রে ঘরে তোলেন। ল্যাকপ্যাকে খাটটায় বসতে বসতে খগেনবাবু বলেন, না তেমন কিছু নয়, পাখাটা একটু চালিয়ে দাও তো
গিন্নি। দু-ঢোক জল গলায় ঢেলে চোখটা বন্ধ রেখেই বলেন, হ্যাঁ,
এই তো
এবার একটু ভাল লাগছে। কমলাদেবী হাত দু’টো কপালে ঠেকিয়ে, যাক বাবা,
কিন্তু
তোমার সেই তালের ব্যাগটা দেখছি না তো? অমনি খগেনবাবুর কপালে হাত। এই যাহ্, ব্যাগটা গজেনের দোকানে। ব্যতিব্যস্ত গিন্নি বলে, শিগগির যাও তবে, হে ঠাকুর কী এক তালকানা মানুষের গলায় ঝুলেছি গো। খগেনবাবু কিছুক্ষণ থমকে থেকে, নাহ্ ও তাল অভিশাপের, আর স্পর্শ করব না। শালা নবটা
কতবড় ধড়িবাজ। বুঝলে গিন্নি,
কথায়
বলে হিংসের গাছ দ্রুত বাড়ে।
দিন
দুয়েক পর গজেনের কর্মচারী ভজার চোখ পড়ে ওই তালে। গজেনদা এ তাল কার? চোখ মুখ বেঁকিয়ে গজেন বলে, তাল? জানি না তো, কেউ তো খোঁজও করেনি। থাক না পড়ে, নয়তো কেটে খেয়ে নে। তবে এ ব্যাগটা তো দু’দিন ধরেই এখানে দেখছি মনে হচ্ছে। আরও
দিন তিনেক তাল দুটি উক্ত স্থানেই থলেতে ঝিমচ্ছে। ভজা বলে, গজেনদা এ তাল তো কেউ নিতে এলো না। আমার মা কাল বলছিল কেউ
ইচ্ছে করে রেখে যায়নি তো? আজকাল তোমার দোকানের
ওপর আবার অনেকের নজর পড়েছে। এ তাল অভিশাপের নয় তো? গজেনের চোখ কপালে, কী সব ফালতু বকছিস? ব্যাগটা ধরে ছুঁড়ে
ফেলে দে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে গজেন বলে, আর কিছু বলেছে তোর মা?
ভজা
এগিয়ে এসে ফিশফিশিয়ে বলে, বলেছে তো, মা বামুনের ঘরের মেয়ে। বলছিল
যদি তাই হয়, তবে এ তাল বেতাল
কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়বে কিন্তু। মা নিদেনও দিয়েছে, কোনো অগ্রদানী পুরুত দিয়ে যজ্ঞ করতে হবে, তালের পিণ্ড খেয়ে ওই যজ্ঞের আগুনেই
তালটাকে পুড়িয়ে ভস্ম করতে হবে। গজেনের মাথায় হাত, সে তো অনেক খরচ রে। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলে, তুই এক কাজ কর, এই সাত সকালে এখনো কেউ দোকান
খোলেনি, একটু সিঁদুর মাখিয়ে
তাল দু’টো জগার শাটারের সামনে রেখে আয়, দেখিস কেউ যেন না দ্যাখে।
ক্ষণিক
পর জগা দোকান খুলতে এসে চক্ষুস্থির। গজেন, এই গজেন এ তাল দু’টো কোত্থেকে এলো রে? গজেনের সটান উত্তর, তাল, আমি কী ক’রে বলব? এই তো সবে দোকান খুললাম। এগিয়ে এসে কী কেস বল তো জগা, এ তো দেখছি আবার সিঁদুর মাখানো। তোর দোকানের ওপর ফের কেউ
নজরটজর দিলো না তো? চোখ কপালে তুলে জগা
বলে, কী যা তা বলছিস? সক্কাল সক্কাল কী যে সব
ঝক্কিঝামেলা। শালা দু’দিন ধরে এমনিতেই বিক্রিবাট্টা কম। শোন গজেন, আমি এখনো শাটার খুলিনি, এক কাজ করি, তাল দু’টোকে তারকের দোকানের
সামনে ফেলে আসি, ও ব্যাটা চা আনতে
গেছে। গোবেচারা তাল দু’টো এভাবেই গোটা দিনভর পুরো মার্কেট চরকি মেরে ক্লান্ত। কে
কার দোকানের গোড়ায় রেখেছে এই নিয়ে দোকানদারদের অন্তর্দ্বন্দ্ব পঁয়তাল্লিশ
ডিগ্রিতে। এবার হাতাহাতির উপক্রম। এবার এ তালের কিছু একটা হিল্লে করতেই হবে, নয়তো মার্কেট শুদ্ধ সবার
ব্যবসা লাটে। ততক্ষণে বাজার চত্বরে রটেও গেছে অশুভ তালের অদৃষ্ট শক্তির নানান
রোমহর্ষক গল্প। খদ্দেরের আনাগোনাও কমছে। কেউ আবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তালের দিকে
দৃষ্টি গেলেই স্নেক বাইটের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে নিচ্ছে। কী সাংঘাতিক অদৃশ্য শক্তি। অনাথ
তাল দু’টোই এখন ব্রেকিং নিউজ। ক্রমশ ভয়াবহ মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে চৌহদ্দি। মার্কেটের
প্রেসিডেন্ট বিকেলেই ইমারজেন্সি মিটিং কল করেন। মিটিং-এর সমাপ্তিতে প্রেসিডেন্টের
শেষ কথা, সকল সভ্য বিচক্ষণ
সদস্যদের সমবেত মতামতকে মান্যতা দিয়ে, সভায় উপস্থিত সকল সদস্যদের সম্মতিক্রমে ব্যবসার দুর্দিন ঘোচাতে এবং অশুভ
শক্তির বিনাশ ঘটাতে দ্রুত কোন পিণ্ড ভক্ষণকারী অগ্রদানী ব্রাহ্মণ ডেকে যজ্ঞের
আগুনে তাল দু’টিকে ভস্ম করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, প্রত্যেক দোকানদারদের সমান হারে কন্ট্রিবিউট করতে অণুরোধ
রাখছি। নিরীহ তাল দু’টোর মৃত্যুর ঘণ্টা চালু। সকলের চোখে-মুখে হালকা স্বস্তির কিরণ।
মিটিং থেকে লাফিয়ে বেরিয়েই গজেনের চিল চিৎকার, ভজা’রে শিগগির পিণ্ডি খেকো খগেন পুরুতকে খবর দে।
~~000~~
No comments:
Post a Comment