প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

শিউলি ফুলের মালা | অঞ্জনা মজুমদার

বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
অঞ্জনা মজুমদার
শিউলি ফুলের মালা

পুবের আকাশে লাল আলোর ছোঁওয়া লেগেছে। এবার সূর্য উঠবে। ঝুড়ি ভর্তি ফুল নিয়ে শিউলির দিকে তাকাল বিতান। আর চমকে উঠল। শিউলির পেছনে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত একটা সাপ।

 
পুজোর সময় প্রতি বছরের মতো গ্রামের বাড়িতে এসেছে বিতান। সঙ্গে আছে বোন মিমি আর রোবু। রোবু কিন্তু মানুষ নয়। বিতানের মামা বৈজ্ঞানিক সায়ন মিত্রর তৈরি করা ছোট্ট রোবট। এখন তো অনেকেই বাড়িতে রোবট ব্যবহার করেন ঘরের কাজকর্মে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু রোবুকে মা ঘরের কাজে লাগান না বিশেষ। বরং রোবু বিনু-মিনুর বন্ধু বা ভাই এর মতোই ছায়াসঙ্গী। রোবু সঙ্গে থাকলে মা বাবাও নিশ্চিন্ত। রোবুর বুদ্ধি, ক্যারাটের দক্ষতার প্রমাণ আগে অনেকবার দেখেছেন মা।
 
গ্রামে পৌঁছেই বিনু মিনু ভাইবোনে রোবুকে নিয়ে বাড়ির পেছনে সেই পুকুর পাড়ে দৌড়ে পৌছে গেল। এটা একটা বিশাল পুকুর। পুকুর পাড়ের দুই পাশে দুটো শিউলি গাছ আছে। আর এই শরৎকালে ভোর থেকেই শিউলি তলা সাদা কমলা রঙের ফুলে ছেয়ে থাকে। তবে ঠাম্মা বলেন ভোরের বেলা যে ফুল গাছের তলায় পড়ে থাকে তাই দিয়ে দুর্গা মায়ের পুজো হয়। বিতান ঠিক করেছে কাল ভোর বেলা কেউ জেগে ওঠার আগেই শিউলি ফুল কুড়িয়ে নেবে।
 
এছাড়া পুকুরের ধারে সাদা কাশফুলের ঢেউ খেলানো মেলা। সেই সাদা ঢেউয়ের মাঝে পুকুরের চকচকে কাচের মতো জল দেখে রোবু অবাক হয়ে গেল।
-কি সুন্দর না বিনুদাদা?
বিতান আনমনে উত্তর দিল,
-হুঁ খুব সুন্দর।
বিতানের চোখ কিন্তু একজনকে খুঁজছিল। গত বছর পুজোয় এই শিউলি তলায় দেখেছিল তাকে। নাম বলেছিল শিউলি। বিতান অনেককে জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু কেউ চেনে না তাকে। সেও অন্য কারোর সামনে আসেনি একবারও। আজও দেখতে পেল না।
 
সন্ধে হয়ে এলো, রোবু বলল,
-চলো বিনুদাদা মিনুদিদি, এবার বাড়ি যাওয়া উচিত।
বিতান বাড়ির দিকে চলল। ঠিক তক্ষুনি কানের কাছে ফিশফিশ,
-কাল ভোরবেলা, শিউলি তলায়।
চমকে পেছন ফিরল বিতান। কেউ কোত্থাও নেই। তবে বিতানের স্থির বিশ্বাস ওটা শিউলির গলা ছিল।
-বারবার পেছন দিকে তাকিয়ে কী দেখছ দাদাভাই?
মিমির ডাকে হুঁশ ফিরল বিতানের।
-কিছু না চল্ বাড়ি ফিরে যাই। কাল ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হবে।
পরদিন ভোরে বিতানের কানে কানে ফিশফিশ,
-ওঠো ওঠো, নাহলে সব ফুল অন্যরা নিয়ে যাবে।
ধড়মড় করে উঠে পড়ল বিতান। চুপিচুপি কাচা জামাকাপড় পরে হালকা হাতে দরজা খুলে পুকুর পাড়ে। ওইতো শিউলি তলায় দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরোনো শিউলি। দৌড়ে কাছে গেল বিতান।
-কাল তুমি এলে না কেন?
-তুমি তো জানো আমি সকলের সামনে আসতে পারি না।
-কেন? কেন পারো না? আমার বোন মিমি আর রোবু তোমাকে দেখলে খুশিই হবে।
-আচ্ছা সে সময় হলেই দেখা হবে। চলো এখন ফুল কুড়িয়ে নিই, মালা গাঁথতে হবে।
এক ঝুড়ি ফুল নিয়ে শিউলি বলল,
-আমি মালা গাঁথি, তুমি আরও ফুল কুড়িয়ে নাও।
বলেই পা ছড়িয়ে মালা গাঁথতে বসল শিউলি। বিতান আরও ফুল কুড়োতে লাগল। কিন্তু যতই ফুল কুড়োয় ঝুড়ি আর ভর্তি হয় না। বিতান হাঁপিয়ে উঠল। তাকিয়ে দেখে শিউলি আপন মনে মালা গেঁথে চলেছে। আবার ফুল কুড়ানোর দিকে মন দিল বিতান। পুবের আকাশে লাল আলোর ছোঁওয়া লেগেছে। এবার সূর্য উঠবে। ঝুড়ি ভর্তি ফুল নিয়ে শিউলির দিকে তাকাল বিতান। আর চমকে উঠল। শিউলির পেছনে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত একটা সাপ। আর কিছু ভাবতে পারল না বিতান। হাত দিয়ে একটা গাছের ডাল কুড়িয়ে নিয়ে তেড়ে যাচ্ছিল বিতান। পেছন থেকে একটা হাত ওকে পেছনে টেনে নিল।
-শিউলি সাপ!
বলে চিৎকার করে উঠল বিতান।
-ঠিক বলেছ বিনুদাদা, সাপই তো। কিন্তু তুমি ওদিকে এগিয়ে যাচ্ছে কেন? বিষাক্ত সাপ তুমি এই ভাঙা লাঠি দিয়ে তাড়াতে পারবে?
রোবু বলল। কিন্তু সাপটা যে শিউলিকে কামড়ে দেবে! ওই যে কামড়ে দিল। বিতানের হাত অবশ হয়ে গেল। আর সে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। রোবু দুই হাত দিয়ে বিতানকে ধরে নিল। চেঁচামেচি শুনে বাড়ির সবাই বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। কাকাই বিতানকে কোলে নিয়ে বারান্দার সোফাতে শুইয়ে দিলেন। চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতেই বিতানের জ্ঞান ফিরে এল। চোখ খুলে প্রথমেই বলল,
-শিউলিকে সাপে কামড়াল। ও কেমন আছে?
-কে শিউলি? কোথায় সে?
-ওই যে শিউলি গাছের তলায়।
-ওখানে কেউ ছিল না। একটা সাপ ছিল, কিন্তু রোবু তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
কাকাই বললেন। কাকাই-এর বন্ধু ডাক্তার কাকা বললেন,
-বিনু বাবা তুমি শান্ত হও। এখন একটু বিশ্রাম নাও। আমরা শিউলির খোঁজ নিচ্ছি।
ডাক্তার কাকার কথায় নিশ্চিন্ত হয়ে বিতান চোখ বুজে ফেলল। মা রইলেন কাছে, অন্যদের একটু দূরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার কাকা বললেন,
-এই শিউলি কে? তোমরা কি কিছু কথা লুকিয়ে যাচ্ছ?
ঠাম্মা বললেন,
-সে তো অনেক দিন আগের কথা। একটা বাচ্চা মেয়ে ওই শিউলি তলায় সাপের কামড়ে মারা গিয়েছিল। কিন্তু বিনু দাদুভাই-এর তো সে কথা জানার কথা নয়। সে প্রায় কুড়ি বছর আগের কথা।
কাকাই বললেন,
-মনে পড়েছে। আমরা তখন ছোট।
ইতিমধ্যে পুরোহিত মশাই এসে পড়েছেন। চোখের জল সামলে বললেন,
-শিউলি সে আমার বাপ-মা মরা ভাইঝি ছিল। সাপে কাটার জন্য তাকে কলাপাতার ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার সঙ্গে সঙ্গে এ বাড়ির সোনার গোপালও হারিয়ে গিয়েছিল।
ঠাম্মা বললেন,
-বিনু দাদুভাই তো শিউলির নামই বলছে। তবে কি শিউলি তলায় কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে?
দাদু বললেন,
-ঠিক আছে। বড়খোকা পুলিশে খবর দাও। আর বনদপ্তরকেও জানাও।
ঠাম্মা বললেন,
-পুজোর দিনে কোনও প্রাণী হত্যা চলবে না কিন্তু।
বাবা বললেন,
-চিন্তা কোরো না মা। বনদপ্তর কোনও প্রাণী হত্যা করে না। আমি খবর দিচ্ছি।
-কাউকে খবর দিতে হবে না।
কাকাই-এর গলা শোনা গেল। রোবু আর কাকাই ঠাকুরদালানের সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছেন। রোবুর হাতে একটা শিউলি ফুলের মালা আর কাকাই-এর হাতে একটা পেতলের ছোট বাক্স। কাকাই বাক্সটা ঠাম্মার হাতে দিয়ে বললেন,
-মা দেখোতো এটাই তোমার সোনার গোপাল কিনা? একটা সাপ এই বাক্সটা জড়িয়ে ছিল। রোবু তাকে জঙ্গলের দিকে সরিয়ে দিয়েছে।
ঠাম্মা বাক্সটা হাতে নিয়ে আগে মাথায় ঠেকালেন। তারপর ধীরে ধীরে বাক্সর ডালাটা খুলে ধরলেন। দাদু, বাবা আর উপস্থিত ঠাকুর মশাই ঝুঁকে পড়লেন। দাদু বললেন,
-এই তো আমাদের সোনার গোপাল।
পুরোহিত মশাই চোখ মুছে বললেন,
-সোনার গোপাল ফিরে এল কিন্তু আমার শিউলি আর ফিরে আসবে না।
-কেন শিউলি ফিরবে না?
বিতানের কান্না ভেজা গলা শোনা গেল। দাদু বিতানকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলেন। ঠাম্মা বললেন,
-দাদুভাই তোমার শিউলির জন্য আমাদের সোনার গোপাল ফিরে এসেছে।
বিতান বলল,
-আর শিউলি ফুলের মালাটা কোথায় গেল? শিউলি দুর্গা মায়ের জন্য গাঁথছিল।
রোবু বলল,
-দেখতো বিনুদাদা এই সেই মালা কিনা? 
বিতান দৌড়ে এসে মালাটা রোবুর হাত থেকে নিয়ে ঠাম্মার হাতে দিয়ে বলল,
-এই তো সেই মালা। ঠাম্মা এটা তুমি দুর্গা ঠাকুরের গলায় পরিয়ে দেবে তো?
একহাতে সোনার গোপাল আর অন্য হাতে মালা নিয়ে ঠাম্মা বললেন,
-এসো দাদুভাই এই মালা তুমি নিজের হাতে মা দুর্গাকে পরিয়ে দেবে।
পুরোহিত মশাই বললেন,
-শিউলিকে যখন সাপে কেটেছিল তখনও শিউলির পাশে এমন একটা মালা পড়ে ছিল। সে মালা শিউলির সাথে ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজকের এই মালা মা দুর্গার গলায় পরানো হবে। শিউলির ইচ্ছে পুরণ হবে।
চোখে জল আর মুখে হাসি নিয়ে ঠাম্মার পেছনে পেছনে বিতান আর বাড়ির সবাই ঠাকুর দালানে চললেন। বাবার কোলে উঠে দুর্গা প্রতিমার গলায় সেই শিউলি ফুলের মালা পরিয়ে দিল বিতান। আর মোবাইলে সেই ছবি তুলে রাখলেন কাকাই। মা আর ঠাম্মার মঙ্গল শঙ্খের আওয়াজে ঠাকুর দালান মুখরিত হল। কাঁসর ঘন্টা বেজে উঠল। ঢাকি কাকাও জোরে জোরে ঢাক বাজাতে লাগলেন।
    ঢাক বাজবে সারাক্ষণ
    ঠাকুর আছে যতক্ষণ।
ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে বিতান দেখল ঠাকুরের মুখ আর শিউলির মুখ যেন একই রকম। বিতান বুঝতে পেরেছে শিউলি আর ফিরে আসবে না। ও ঠাকুরের সঙ্গে এক হয়ে গেছে।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)