বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
দেবদাস কুণ্ডু
পুজো স্পেশাল প্রেম
শারদীয়া
ছোটগল্প
দেবদাস কুণ্ডু
পুজো স্পেশাল প্রেম
প্রতিবার পুজোতে এইরকম এক-একটা নতুন ছেলের সঙ্গে ঘুরি। আমার বাবা তো এখানে থাকে না। আর মা ভিড় ঠেলে ঠাকুর দেখে না। তাই পুজোতে একজনের সঙ্গে প্রেম করি।
মনিদীপা বিরক্তির সুরে বলল। মনিদীপার বিরক্তি হওয়া স্বাভাবিক। এমনকি তার নিজেরও বিরক্তি লাগছে। আজ অষ্টমি পুজো। যেখানেই যাও শুধু ভিড়। ভিড় তো থাকবে। ধৈর্য্য হারালে চলবে না। খাওয়া হবে না। পুজোর খাওয়া মানে স্পেশাল মেনু। সেই খাবার অর্ডার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাপ্লাই হয় না। অপেক্ষা করতে হয়। যাতে স্বাদে হয় অমৃত। বাজে খাবার খেয়ে মুখ বিস্বাদ করলে পুজোর আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে। আর ঠাকুর দেখতে ইচ্ছে করবে না। তাড়াতাড়ি গ্যারেজ হয়ে যাবে বডি। আমি বললাম,
মোবাইলে তাকিয়ে মনিদীপা বলল,
-ভাল খাবারের জন্য আধঘণ্টা অপেক্ষা এমন কিছু ব্যাপার নয়।
মনিদীপা বলল,
-তুমি কী করে ভাবলে আমি সারারাত খাবারের জন্য অপেক্ষা করব? খিদে আমি একদম সহ্য করতে পারি না। খাবার দিতে একটু দেরি হলে মা-বোনদের সঙ্গে ঝগড়া লেগে যায় আমার। তারা বলে একটু সহ্য করা শেখ।
মনিদীপা বলল,
-তুমি
বুঝি অষ্টমি পুজোর খাওয়াকে বাড়ির খাবার মনে করছ?
-না না। তা কেন হবে। আজ আমরা
বিশেষ মেনু খাব। যেটা একবছর মনে রাখতে পারব। আমাদের তো নতুন প্রেম। দুদিন বয়স আমাদের প্রেমের। এই প্রথম
আমরা পুজোয় ঘুরতে বেরিয়েছি। অভিজ্ঞতাটা সুখকর রাখতে হবে না?
একটু
থেমে একটা সিগারেট ধরিয়ে আমি আবার বললাম,
–তাই
তো অন্য রেস্টুরেন্টে যাচ্ছি না। এদের ঐতিহ্য আছে। যারা প্রেম করেছে বা করে তাঁরা
এই রেস্টুরেন্টে খাবেই খাবে। না খেলে তাঁদের প্রেমের পরিপূর্ণতা আসে না।
মনিদীপা বলল,
-তুমি কী করে জানলে এত
সব? এর আগে কারো সঙ্গে প্রেম করে
তুমি কি এখানে এসেছ?
-না
না।
আমি মাথা নাড়ি,
-তুমি
যা ভাবছো তা নয়। এটাই আমার প্রথম প্রেম। তুমি আমার প্রথম প্রেমিকা।
-তাহলে তুমি নিরালার ঐতিহ্যের কথা কী করে জানলে?
-আমাদের
বিআরএস কোয়াটারে দুই দিদি থাকতেন। তারা প্রেম করেছেন। আমার সঙ্গে তাদের খুব ভাব
ছিল। তারাই গল্প করছিল একদিন।
মনিদীপা একবার ঘাড় উঁচু করে তাকাল উপরের দিকে। নিরালা দোতলা রেস্টুরেন্ট। উপরে কেবিন। সেখানে যুগলেরা বসে। কিন্তু কখন তারা সেই কেবিনে বসবে সেটাই এখন তার চিন্তার বিষয়। বিধান সরনি ধরে মানুষের ঢল নেমেছে। চলছে মণ্ডপে মণ্ডপে। রাস্তার দু পাশে আলোর ঝালর। রাতের চারপাশ দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল। এত আলো। আলোয় ভরা ভুবন। প্রতিটি মানুষের মুখে সেই আলো। নতুন পোষাক। সেই পোষাক থেকে ছিটকে আসছে আলো। সবার মুখে অমলিন আলো। হাসির আলো। যেন তাদের কোন দুঃখ নেই। কোনদিন দুঃখ ছিল না। তারা হাসি-খুশির দেশের মানুষ।
-শোন আর দাঁড়ানো সম্ভব নয়।
মনিদীপা বলল,
-আমার
বড্ড খিদে পেয়েছে। ওই উল্টোদিকের ফুটপাতের দোকানটায় চলো। ওখানে বিরিয়ানি খেয়ে
নেব।
-ফুটপাতে খাব তোমাকে নিয়ে? আনহাইজিনিক খাবার। খেলে সোজা আইডি হাসপাতাল। পুজোটাই মাটি করি আর কী!
-তাহলে ভিতরে যাও। একটা খালি কেবিনের ব্যবস্থা কর।
-তা দেখছি।
কিছু সময় পর নিচে নেমে এলাম আমি। মনিদীপা বলল,
-কি
ব্যবস্থা করলে?
-আর
পনেরো মিনিট। তিন নম্বর কেবিন খালি হচ্ছে।
-অন্য কেউ ঢুকে পড়বে না তো? এখানে যা ভিড় দেখছি। মনে হচ্ছে মানুষ যেন খেতেই বেরিয়েছে।
-অত টেনশন নিচ্ছ কেন? আমি বেয়রাকে আগেই বকশিশ দিয়ে এসেছি। চিন্তা নেই।
-আরো পনেরো মিনিট! আচ্ছা হাতিবাগানে তো ভজহরি মান্না আছে। সেখানে চল।
-ওখানে তুমি খালি পাবে ভেবেছ? আমাদের তো অনেকগুলো ঠাকুর দেখা হয়েছে। এবার ধীরেসুস্থে খেয়ে যাবার পথে যেকটা প্যান্ডেল পড়বে দেখতে দেখতে যাব। কি বল?
-এখন
প্যান্ডেল প্রতিমা নয়। আমি খাবার কথা ভাবছি। তুমি চুপ করো।
সিগারেটটা ফেলে দিয়ে চুপ করে দাঁড়ালাম বিবেকানন্দের বাড়ির দিকে তাকিয়ে।
-কেন
তুমি ফোন ধরছ না? কী হয়েছে তোমার? পুজোয় কী আনন্দ করলাম। দুজনে
মিলে বিসর্জন দেখলাম। তারপর কেন ফোন রিসিভ করছ না?
কিন্তু
কিছুই বলা হলো না। মনিদীপা ঘর থেকেই বের হয়নি। সন্ধ্যায় পার্কে বসে আবার
মনিদীপাকে ফোন করলাম। এবারও ধরল না। আবার। বারবার। এবার ধরেছে,
-কী
ব্যাপার তুমি ফোন ধরছ না কেন?
-আর
তোমার ফোন ধরব না।
-কেন! আমি কি অন্যায় করলাম?
-না।
তুমি খুব ভাল ছেলে।
-তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
-কোন
সমস্যা নেই। তোমার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্কও নেই।
-তাহলে এই কদিন যে মেলেমেশা করলে?
-প্রতিবার
পুজোতে এইরকম এক-একটা
নতুন ছেলের সঙ্গে ঘুরি। আমার বাবা তো এখানে থাকে না। আর মা ভিড় ঠেলে ঠাকুর দেখে না।
তাই পুজোতে একজনের সঙ্গে প্রেম করি। পুজো শেষ হলে আমার প্রেমও শেষ।
-আশ্চর্য তো তুমি! এটাকে কী বলে?
-পুজো
স্পেশাল প্রেম বুঝলে হরিদাস?
মনিদীপা বলল,
আমি মাথা নাড়ি,
-তাহলে তুমি নিরালার ঐতিহ্যের কথা কী করে জানলে?
মনিদীপা একবার ঘাড় উঁচু করে তাকাল উপরের দিকে। নিরালা দোতলা রেস্টুরেন্ট। উপরে কেবিন। সেখানে যুগলেরা বসে। কিন্তু কখন তারা সেই কেবিনে বসবে সেটাই এখন তার চিন্তার বিষয়। বিধান সরনি ধরে মানুষের ঢল নেমেছে। চলছে মণ্ডপে মণ্ডপে। রাস্তার দু পাশে আলোর ঝালর। রাতের চারপাশ দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল। এত আলো। আলোয় ভরা ভুবন। প্রতিটি মানুষের মুখে সেই আলো। নতুন পোষাক। সেই পোষাক থেকে ছিটকে আসছে আলো। সবার মুখে অমলিন আলো। হাসির আলো। যেন তাদের কোন দুঃখ নেই। কোনদিন দুঃখ ছিল না। তারা হাসি-খুশির দেশের মানুষ।
-শোন আর দাঁড়ানো সম্ভব নয়।
মনিদীপা বলল,
-ফুটপাতে খাব তোমাকে নিয়ে? আনহাইজিনিক খাবার। খেলে সোজা আইডি হাসপাতাল। পুজোটাই মাটি করি আর কী!
-তাহলে ভিতরে যাও। একটা খালি কেবিনের ব্যবস্থা কর।
-তা দেখছি।
কিছু সময় পর নিচে নেমে এলাম আমি। মনিদীপা বলল,
-অন্য কেউ ঢুকে পড়বে না তো? এখানে যা ভিড় দেখছি। মনে হচ্ছে মানুষ যেন খেতেই বেরিয়েছে।
-অত টেনশন নিচ্ছ কেন? আমি বেয়রাকে আগেই বকশিশ দিয়ে এসেছি। চিন্তা নেই।
-আরো পনেরো মিনিট! আচ্ছা হাতিবাগানে তো ভজহরি মান্না আছে। সেখানে চল।
-ওখানে তুমি খালি পাবে ভেবেছ? আমাদের তো অনেকগুলো ঠাকুর দেখা হয়েছে। এবার ধীরেসুস্থে খেয়ে যাবার পথে যেকটা প্যান্ডেল পড়বে দেখতে দেখতে যাব। কি বল?
সিগারেটটা ফেলে দিয়ে চুপ করে দাঁড়ালাম বিবেকানন্দের বাড়ির দিকে তাকিয়ে।
দুই
বিসর্জন
গেছে দু দিন হলো। মনিদীপার বাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছি আমি। দুদিন অনেক ফোন করেছি।
মনিদীপা রিসিভ করেনি। তাই ওর বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছি কখন মনিদীপা বের হয়।
মুখোমুখি দেখা হবে। জিজ্ঞেস করব,-কেন! আমি কি অন্যায় করলাম?
-তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
-তাহলে এই কদিন যে মেলেমেশা করলে?
-আশ্চর্য তো তুমি! এটাকে কী বলে?
~~000~~

No comments:
Post a Comment