প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

  বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন ।...

Friday, September 18, 2026

অভিশপ্ত হাইওয়ে ও টাইম লুপ: দিঘার রাতের বিভীষিকা [১ম পর্ব] | গৌরীশ হালদার

বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
গৌরীশ হালদার
অভিশপ্ত হাইওয়ে ও টাইম লুপ: দিঘার রাতের বিভীষিকা
[১ম পর্ব]

সে রুমের সঙ্গে লাগোয়া ছোট বাথরুমে গেল। বাথরুমের সিঙ্কের পাশেই একটা ছোট জানলা ছিল, যেখান দিয়ে পেছনের ঘন জঙ্গলটা পরিষ্কার দেখা যায়। জানলার দিকে তাকাতেই সায়নের রক্ত হিম হয়ে গেল!

 
প্রথম অধ্যায়: রোড ট্রিপের সূচনা
বাইকের থ্রটল ঘুরিয়েই একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। সামনে তখন অস্তগামী সূর্যের সোনালি আলো, আর আমাদের গন্তব্য দিঘা। দু বছর আগের সেই বিকেলে আমি-সহ আমার চার বন্ধু মিলে একটা দুর্দান্ত প্ল্যান করেছিলাম—বাইকে করে দিঘা যাব। আমাদের এই ছোট্ট দলে ছিল চারজন: শিভাম, সায়ন, রিতু, আর আমি (অভী)।
 
বাইক ছিল দুটো। একটাতে শিভাম আর আমি, অন্যটাতে সায়ন আর রিতু। বিকেল ৫টার দিকে আমরা কলকাতার কোলাহল ছেড়ে হাইওয়েতে উঠলাম। দিঘা পৌঁছাতে সাধারণত সাড়ে-৫ থেকে ৬ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। রাতের ফাঁকা রাস্তায় বাইক ছোটানোর মজাই আলাদা। দুপাশের বাতাস আর বন্ধুদের হাসিমুখ—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আনন্দ কাজ করছিল।
 
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু বিপদ এল রাত ৮টার দিকে। হঠাৎ করেই আমার আর শিভামের বাইকটা একটা বিকট শব্দ করে ঝাঁকুনি দিয়ে বন্ধ হয়ে গেল। আমরা বাইক সাইড করে নামলাম। ফুয়েল গেজের দিকে তাকিয়ে তো আমাদের চোখ কপালে উঠল! মাত্র কিছুক্ষণ আগেই তো ফুল ট্যাংক করিয়েছিলাম, তবে এত জলদি তেল শেষ হলো কী করে? কোনো লিকেজ আছে কিনা দেখতে লাগলাম, কিন্তু সব ঠিকঠাক মনে হলো। পেছনের বাইকটা থেকে সায়ন আর রিতুও নেমে এল।
 
রাতের এই নির্জন হাইওয়েতে মেকানিক পাওয়া প্রায় অসম্ভব। মোবাইল নেটওয়ার্কও দুর্বল হতে শুরু করেছে। তখনই শিভাম বলল, "এক কাজ করা যাক, সামনেই তো একটা জায়গা আসার কথা, দেখি কোনো হোটেল বা থাকার জায়গা পাওয়া যায় কিনা। নইলে এই গভীর রাতে রাস্তায় আটকে থাকা বিপদজনক।"
 
চারপাশটা তখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢেকে আসছে। দূরের ঘন জঙ্গল আর নিশুতি পরিবেশ একটা অস্বস্তিকর শিহরণ জাগাচ্ছিল। বাধ্য হয়েই আমরা বাইক ঠেলতে ঠেলতে এগোতে লাগলাম। প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটার পর রাস্তার ধারেই একটা পুরোনো ধাঁচের হোটেল চোখে পড়ল। নামটা পরিষ্কার ঠাহর হলো না, তবে একটা ম্লান সাইনবোর্ডে কী যেন লেখা ছিল।
 
হোটেলটার সামনে এসে আমরা থমকে দাঁড়ালাম। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল যেন বহুকাল ধরে এখানে কেউ আসে না। একটা ভিনটেজ, অদ্ভুত ধরনের থমথমে ভাব পুরো চত্বরজুড়ে। কিন্তু তখন রাত বাড়ছে, ক্লান্তি আর আতঙ্কে আমাদের আর বেশি কিছু ভাবার শক্তি ছিল না। রিসেপশনে গিয়ে দেখলাম চারপাশ একেবারে নিস্তব্ধ। কোনো রিসেপশনিস্ট বা স্টাফ সামনে নেই। আমরা বেশ কয়েকবার জোরে ডাকলাম, "কেউ আছেন?"
 
বেশ কিছুক্ষণ পর একটা রোগা, ফ্যাকাশে চেহারার লোক ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। তার চোখ দুটো কোটরাগত। আমরা রুমের কথা বলতেই সে বলল, "রুম খালি আছে। ভাড়া খুবই কম, প্রতি জন প্রতি রাত ১০০০ টাকা।" তখন ক্লান্তি আর হতাশার মুখে ওই কম দামটাই আমাদের কাছে যেন স্বস্তির নিশ্বাস হয়ে এল। আমরা আর দরদাম করলাম না। টাকা মিটিয়ে দেওয়ার পর সেই লোকটাই আমাদের রুম অবধি পৌঁছে দিতে এল। সে হাঁটার সময় কোনো শব্দ করছিল না। তার চারপাশটা কেমন যেন একটা ভারী ঠান্ডায় আচ্ছন্ন ছিল।
 
দ্বিতীয় অধ্যায়: নিঃশব্দ করিডোর এবং প্রথম আতঙ্ক
লোকটা আমাদের দুটো পাশাপাশি রুম দিল। রুমগুলো খুব একটা খারাপ ছিল না—বেশ বড় সোফা, একটা ডাবল বিছানা আর ধুলোমাখা পুরোনো কাঠের আসবাব। আমরা ব্যাগপত্র রেখে বিছানায় বসলাম। অনেকক্ষণ বাইক চালানোর ধকলের পর শরীরটা ভেঙে আসছিল
 
রিতু আর শিভামের ঘরের পরিবেশটা প্রথম থেকেই একটুও পছন্দ হচ্ছিল না। তারা বারবার বলছিল, "জায়গাটা কেমন যেন অদ্ভুত! একটা চাপা থমথমে ভাব আছে চারপাশে" কিন্তু আমি আর সায়ন ক্লান্তির চোটে সেসব গায়ে মাখলাম না। আমরা সবাই নিজেদের রুমে ফ্রেশ হয়ে ব্যাগপত্র রেখে একে অপরের রুমে যাতায়াত শুরু করলাম। সময় কাটানোর জন্য আমরা তাসের একটা বোর্ড গেম আর লুডো খেলতে বসলাম হাসিমুখেই কাটছিল সময়টা, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ১২টার দিকে এগোচ্ছে—ঠিক তার ১০ মিনিট বাকি—তখন হঠাৎ করেই একটা গা ছমছমে ভাব চারপাশ গ্রাস করল।
 
সবাই যার যার রুমে শুতে চলে গেল। আমি আর সায়ন আমাদের রুমে শুলাম, আর শিভাম-রিতু পাশের রুমে।
রাত তখন গভীর। ঠিক মাঝরাতে শিভামের ঘুম ভেঙে গেল ওপরের তলা থেকে আসা একটা অদ্ভুত শব্দে। মনে হচ্ছিল কেউ যেন ভারী জুতো পরে ওপরের খালি ঘরে নাচছে বা ড্রিল করছে—"কটকট... খটখট..."। শিভাম ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় গায়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ওই ভৌতিক শব্দ যেন তার মাথার ভেতরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
 
অন্যদিকে সায়ন ছিল একটু বেশিই ঘুমকাতুরে। বিছানায় শুলেই যার নাক ডাকা শুরু হয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সায়ন ঘুমালেও তার অবচেতন মনে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। হঠাৎ তার মনে হলো, বিছানার ঠিক নিচ থেকে কেউ যেন তাকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখছে! একটা ঠান্ডা হাতের ছোঁয়া যেন তার পায়ের পাতা ছুঁয়ে গেল। ভয়ে আঁতকে উঠে সায়ন এক লাফে বিছানা থেকে নেমে সোজা দৌড়ে আমার রুমে এসে ঢুকল সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "অভী! অভী ভাই ওঠো! আমার রুমের খাটের নিচে... কে যেন আছে!"
 
আমি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘড়িতে তখন রাত ৩টা বাজে। প্রচণ্ড ঘুম চোখে আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, "আরে সায়ন, তুই কীসের ভয়ে এত প্যানিক করছিস? যা তো, কিচ্ছু নেই। সারাদিন জার্নির ধকল গেছে তো, তাই ভুল দেখছিস।"
 
কিন্তু সায়ন কিছুতেই ছাড়ল না। সে হাত ধরে টানতে লাগল। বাধ্য হয়ে আমি তার রুমে গেলাম। টর্চ জ্বেলে খাটের নিচটা ভাল করে দেখলাম—না, সেখানে কেউ নেই। ধুলোবালি ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। আমি সায়নকে বললাম দেখলি তো, কিচ্ছু নেই। এবার শুয়ে পড়। আমি নিজের রুমে ফিরে এসে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। সায়নকে বললাম, "ভয় পাস না, সব ঠিক আছে।"
 
সায়নও ভয়ে ভয়ে তার রুমে ফিরে গেল। কিন্তু বিছানায় শুতে যাওয়ার আগে তার প্রচণ্ড পায়খানা বা টয়লেটের বেগ পেল। সে রুমের সঙ্গে লাগোয়া ছোট বাথরুমে গেল। বাথরুমের সিঙ্কের পাশেই একটা ছোট জানলা ছিল, যেখান দিয়ে পেছনের ঘন জঙ্গলটা পরিষ্কার দেখা যায়। জানলার দিকে তাকাতেই সায়নের রক্ত হিম হয়ে গেল!
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)