বাতায়ন/ছোটগল্প/১ম বর্ষ/৩১তম সংখ্যা/২রা চৈত্র, ১৪৩০
ছোটগল্প
দেবশ্রী রায় দে সরকার
চিরায়ত
মিক্সিতে পেঁয়াজবাটা করছিল অনুশ্রী। মিক্সির পাশে রাখা রয়েছে
মোবাইল। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা এল। তার মেয়ে অভিনন্দার মেসেজ। মিক্সিটা বন্ধ করে
মেসেজটা পড়তে লাগল। মাত্র বাইশ বছর বয়সে অভিনন্দা ব্যাঙ্গালোরের একটা এমএনসিতে
কর্মরত। অভিনন্দার মেসেজে শুধু নতুন পরিবেশে অ্যাডজাস্ট না করতে পারার কথা। যেমন
পিজিতে রান্না ভাল নয়। অফিসে বস ভাল নয়। সহকর্মীরা স্বার্থপর ইত্যাদি ইত্যাদি। অনুশ্রী
অনেকক্ষণ
হাতে নিয়ে বসে থাকে মেসেজটা। বুঝে পায় না মেয়েকে কী উত্তর
দেবে। কিন্তু মেয়ের ধনুক ভাঙা পণ চাকরি সে করবেই। এত বড় কোম্পানির চাকরি সে
ছাড়বে না। তাই অনুশ্রী তাকে কলকাতায় ফিরে আসতে বলবে সেটা হয়তো সম্ভব নয়। তবুও
মেয়েকে কিছু উত্তর দিতে হবে… মনে পড়তে থাকে তার নিজের কথা। মাত্র ২২ বছর বয়সে তারও
বিয়ে হয়েছিল। শ্বশুরবাড়ি এসে অ্যাডজাস্টমেন্ট হচ্ছিল না একদমই। নতুন পরিবেশ
নতুন লোকজনকে নিজের সাথে কেমন বেমানান লাগছিল। মা-বাবার আদরের অনুশ্রী কোন কাজ
করতে পারত না তেমন। শিলে তাকে পেঁয়াজ বাটতে বলা হয়েছিল... বেটে দিয়েছিল হয়তো
পেঁয়াজ। কিন্তু ঝাঁঝে কষ্টে চোখ দিয়ে জল পড়েছিল তার খুব। একদিন নিরুপায় হয়ে
বলেছিল শিলে আর বাটনা বাটতে পারবে না মিক্সি চাই তার। একান্নবর্তী শ্বশুরবাড়িতে এই
নিয়ে পরিহাস শুরু হয়ে যায়। এক দেওর তো তাকে ‘মিক্সি বউদি’ বলে বিদ্রূপ করে ডাকতে
থাকে। মুখ বুজে সবকিছুর সঙ্গে অ্যাডজাস্টমেন্ট করে বিবাহিত জীবনের ২৫ বছর কাটিয়ে
দেয় অনুশ্রী। আর একমাত্র লক্ষ্য ছিল অভিনন্দাকে মানুষ করা। নিজের প্রতিষ্ঠিত
ইঞ্জিনিয়ার মেয়েকে আজ হোয়াটসঅ্যাপে কী উত্তর দেবে মনে মনে এখনো খুঁজে চলেছে
অনুশ্রী। রান্নাবান্না শেষ করে ফোনটা আবার হাতে নিয়ে বসে সে। মেয়েকে লেখে সে, ‘নতুন
পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলো। এক সময় দেখবে পরিবেশে তোমাকে মানিয়ে নিয়েছে।
সহকর্মীদের নিজের করতে শিখে নাও। আমিও মাত্র ২২ বছর বয়সে তোমার মতো একটি নতুন
পরিবেশে এসেছিলাম। কিন্তু আজ সেই পরিবেশটা আমার সৃষ্ট সংসার হয়েছে। আর নিজের কষ্টগুলো
এই সংসারের কোথাও প্রশমিত হয়ে রয়েছে। এই মানিয়ে নেবার গুনটি যদি একবার অর্জন করতে
শিখে যাও দেখবে জীবনের সব ঝড়-ঝঞ্ঝা একে একে সরে যাচ্ছে।‘ মেয়েকে মেসেজটি পোস্ট
করেই ফোন হাতে করে চুপ করে বসে থাকে সে। মেয়ের উত্তর আসে 'চেষ্টা করব মা। তবে
তোমার মতো পারব কিনা জানি না...'
সমাপ্ত

কত সাধারণ বিষয় লেখনীতে অনন্য হয়ে উঠেছে। প্রশমিত --এর প্রয়োগ অসাধারণ!
ReplyDeleteKhub bastab... asadharon...
ReplyDelete