প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Friday, May 10, 2024

চৈতন্য হোক | তপতী রায়

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/২য় সংখ্যা/২৮শে বৈশাখ, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

তপতী রায়

চৈতন্য হোক

২য় পর্ব

পূর্বানুবৃত্তি সারারাত ঘুম হলো না সাধনাদেবীর। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণের ছবির দিকে। সারা বিশ্বের মানুষকে আশীর্বাদ করছেন অদ্ভুত ভঙ্গিমায় ‘চৈতন্য হোক’। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তার সত্যিই চৈতন্য হলো। আর মাথা নিচু করে থাকবেন না তিনি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। তারপর…
 
জ্যোতিবাবু ও তার স্ত্রী রমা দুজনে বাগান করছিলেনমলিন বস্ত্রে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে জীর্ণ শরীরে সাধনাদেবীকে দেখে চমকে উঠলেন। রমা হাত ধরে ঘরে বসালেন। জ্যোতিবাবু ভেতর থেকে এক গ্লাস জল আনলেন। জলটুকু খেয়ে
সাধনা চোখ মুছে, ধীরে ধীরে তাঁর দুঃখের কাহিনি শোনালেন। গুন্ডা, পাড়ার যত মস্তান আর প্রোমোটারদের ভিড়। মাঝেমধ্যে আমার চিলেকোঠার ঘরের সামনে মদের আড্ডাও বসে। বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট বাড়ি হবে। আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবে। দু-চার দিনের মধ্যেই মনে হয় আমাকে বাড়ি ছাড়তে হবে।
জ্যোতিবাবু সাধনার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “তুমি কোন রকম চিন্তা করবে না। আজ থেকে তোমার সব দায়িত্ব আমার আর রমার। তুমি কেবল বাড়ির চৌকাঠ পেরবে না। এই শহরের নামি প্রোমোটার শেখর গুপ্ত। পুলিশ থেকে মন্ত্রী ওর হাতের মুঠোর মধ্যে। আজ কেবল ওকে নিয়ে দর্শন দিয়ে আসব। তারপর শুরু হবে কাজ। তোমার যেমনটি ইচ্ছে ঠিক সেই রকম হবে।”
সাদনাদেবী বললেন, “আমার গহনার বাক্স আপনার কাছে সেটা ওরা আন্দাজ করে নিয়েছে, তাই একটু সাবধানে চলাফেরা করতে হবে আপনাকে,” “আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। তুমি আর রমা আমাদের সঙ্গে আজ তোমার বাড়ি যেতে হবে। তোমার প্রয়োজনীয় জিনিস সব এখানে নিয়ে আসবে। বেশ কিছুদিন আর ও বাড়ি যেতে পারবে না। শেখরদার সাথে ফোনে কথা হয়েছে। চিলেকোঠার ঘরে আমার দুজন লোক থাকবে। কাল থেকেই মনে হয় কাজ শুরু হবে। তোমার পেছন দিকের জমিতে ফ্ল্যাট হবে। তোমার নিজের বড়িতেই তোমার পছন্দের বাংলো এবং বৃদ্ধাশ্রম হবে। তোমার দুই ছেলে, মেয়ে ছাড়াও আরও চারজন নামি ডাক্তার ফ্ল্যাট বুক করে দিয়েছে। আশি লক্ষ করে এক একটা ফ্ল্যাট। ওই জমিতে কুড়িটা ফ্ল্যাট হবে। তোমার গাড়ি তো আমি শীঘ্র অর্ডার দেব ছেলে, মেয়ে, জামাইকে ভাল করে নাচিয়ে তারপর দেব।” রমা, সাধনা হেসে ফেলল। সাধনা বলল, “বাড়ির নাম কিন্তু ‘চৈতন্য হোক’ হবে সেদিন সারা রাত ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ভোরের আলো ফুটতেই ঠাকুর তোমার বাড়ি পাঠালেন। বৃদ্ধাশ্রমে আমার, রমার আর আপনার আলাদা আলাদা ঘর থাকবে।” এত মস্ত বড় উপহার জ্যোতিবাবু বললেন, “চলুন এবার শুভ কাজে এগোনো যাক।”
“তোমায় কথা দিলাম, বহুবছর আগে তুমি যে পরিকল্পনার কথা আমাকে এবং রমাকে বলেছিলে, সেই ভাবেই সমস্ত কাজ হবে!”
জ্যোতিবাবুরা যখন সাধনাদেবীর বাড়ি পৌঁছালেন, প্রায় সন্ধ্যা হয় হয়। সাধনাদেবীর বড় পুত্র, উকিল জামাই জাঁকিয়ে বসে সদ্য বেড়ে ওঠা দু-চার জন মস্তান প্রোমোটার নিয়ে চায়ের আড্ডা বসেছে জ্যোতিবাবু এবং শেখর গুপ্তকে দেখেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে উঠল। শেখর প্রথমে সাধনাদেবীর ছেলেকে উদ্দেশ্য করেই বলল, কাল থেকে বাড়ির কাজ আমি হাতে নিয়েছি। পেছনের জমিতে ফ্ল্যাট হবে। চিলেকোঠার ঘর আর বড় বসার ঘরে আমার লোকজন থাকবে। তোমার মা আজ থেকে জ্যোতির বাড়ি থাকবে। কোনরকম আশান্তি করলে অন্য জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করব। প্রমোটার দুটোর কাঁধ ধরে এক ঝাঁকানি দিয়ে বলল, এই সীমানায় যদি আর দেখি, ইট গাঁথা তো দূরের কথা এক বালতি মাটি ঢালতে পারবি না জমিতে।
সাধনাদেবী নিজের জিনিসপত্র নিয়ে কারো সাথে কোন কথা না বলে গাড়িতে উঠে রওনা হলেন চৈতন্যের পথে।
পরের দিন থেকেই জোর কদমে কাজ শুরু হয়ে গেল। রাগ দেখিয়ে ছেলে, মেয়ে, বউ অন্য জায়গায় নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করল। জ্যোতিবাবু বললেন, বাড়িটা একবার তৈরি হোক সুড়সুড় করে সব চলে আসবে।
দেখতে দেখতে কুড়িখানা ফ্ল্যাট, নীচে গ্যারেজ, দেখার মতো আধুনিক ঝকঝকে তকতকে নজর লাগার মতো ফ্ল্যাট তৈরি হয়ে গেল। ছেলে, মেয়েরা লুকিয়ে লুকিয়ে প্রায় দেখতে আসে। জ্যোতিবাবু নিজের মনে হাসেন, “আমার চোখকে ফাঁকি দিবি! আর একটু অপেক্ষা কর বাছাধন! ঠাকুরের চৈতন্য রূপ কাকে বলে তোদের দেখিয়ে ছাড়ব”দেখতে দেখতে তৈরি হয়ে গেল সাধনাদেবীর বাড়ি।
অসাধরণ বাংলো। ইচ্ছে করে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখি। সারি সারি ফুলের গাছ। পাশে মহিলাদের জন্য বৃদ্ধাশ্রমএই বাড়ির গড়িমা যেন শতগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। রমাদেবী এসে একদিন দেখে গেছেন। সাধনাদেবী এলেন নাগৃহপ্রবেশের দিনই আসবেন।
রমা আর জ্যোতি দুজনে সুন্দর করে সাধনাদেবীর বাড়ি সাজিয়ে ফেললেন, গৃহপ্রবেশের আগের দিন নিজেরা গিয়ে ছেলেমেয়েদের নিমন্ত্রণ করে এলেন। এ কথাও বলে এলেন, কাল বাড়ির দলিল, গহনা, টাকা হিসেব করে দেওয়া হবে। যদি না যাও অন্য ব্যবস্থা করা হবে।
সারা বাড়ি ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। সকাল থেকেই বিসমিল্লার সানাই-এর সুরপাড়ার প্রচুর গণ্যমান্য লোক। আজ ১লা জানুয়ারি। ঠাকুরের কল্পতরু। এ এক বিশেষ আনন্দের দিন সারা বিশ্ব জুড়ে। সাধনাদেবীর ছেলে, জামাই, মেয়ে ভোর থেকেই এসে হাজির। দেয়ালের গায়ে একদিকে সাধনাদেবীর স্বামী নবীন ভৌমিকের ছবি।
অন্য দিকের দেয়ালে ঠাকুর রামকৃষ্ণের ছবি। সেই পুরানো মূর্তি রূপে দাঁড়িয়ে বিশ্বের মানুষকে আশীর্বাদ করছেন, ‘চৈতন্য হোক’
জ্যোতিবাবু সাধনাদেবীর ছেলেমেয়েদের বললেন, “তোমরা ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করো, মা ধনী, গরিব যেমন হোক তাঁর প্রাপ্য সন্মান দেব।” জামাইবাবু ভক্তি একটু বেশি দেখাবার চেষ্টা করল বটে ঠাকুরের ভঙ্গিমায় দাঁড়াবার উল্টে পড়ল জনসমাজের মাঝে। সাধনার মেয়ে সরমা এবার আর চুপ করে রইল না। “নাটের গুরু, এবার বিছানা নাও।” সকলেই হয়তো হাসল, শব্দ শোনা গেল না। ভৌমিক বাড়ির মানরক্ষায়। সাধনাদেবী সকলকার হিসেব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন। নাতিদের হাত দিয় বাড়ির নামকরণ করলেন, ‘চৈতন্য হৌক’
 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)